Thursday, 14 May 2020

আত্মনির্ভর

                       রাস্তার মোড়ে একটা জটলা। বেশ কিছু লোকজন কোন নিয়ম নিষেধের তোয়াক্কা না করে জড়িয়ে পড়েছে বাগবিতণ্ডায়। কি কারণে যে গোলমাল বেঁধেছে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, তবে কেউ কেউ বলছেন নিতান্ত সাধারণ কারণেই দুজনের মধ্যে হাতাহাতির যোগাড়। পাশের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন সৌম্য দর্শণ এক প্রৌঢ়। কিছুক্ষন কথাবার্তা বলে শান্ত করতে চাইলেন সবাইকে। উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় চলছে। কে কি বলতে চাইছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। এর মধ্যে ওই ভদ্রলোক জলদগম্ভীর স্বরে আর একজনের কাঁধে হাত রেখে বললেন - পরাশর ছেড়ে দাও, যা হবার তো হয়ে গেছে। পরাশর বাবু শান্ত হলেন। কি হবার ছিল, কি হয়েছে কিছুই বুঝতে পারলাম না। ভিড় পাতলা হয়ে গেল, সবাই চলেও গেল। পরাশর বাবুও ঐ প্রৌঢ় ভদ্রলোককে প্রণাম করে চলে গেলেন। পরাশর বাবু কে দেখে মনে হল যার সাথে তাঁর গোল বেঁধেছিল তাকে তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন। 
                          কিরকম যেন অদ্ভুত লাগল। এখনকার দিনে মধ্যবয়সী কোন লোকের নাম পরাশর - কেমন যেন একটা ব্যাপার। আবোল তাবোল কিসব ভাবতে ভাবতে মনে হল পরাশর নামটার সাথে ক্ষমা র সংযোগের ইতিহাস সুপ্রাচীন। সনাতন ভারতবর্ষের সামাজিক পরিকাঠামোর অনেকটাই রামায়ণ মহাভারত এর বিভিম্ন কাহিনী দ্বারা প্রভাবিত। মহাভারত রচনার পটভুমি স্বয়ং ত্রিলোকেশ্বরের নির্দেশে তৈরী হয় আর সেই পটভুমিতে মহামুনী পরাশর বিশেষ স্থান অধিকার করেন । মহামুনী পরাশর খুব অল্প বয়সে তাঁর পিতা শক্তি মুনী কে হারান। এবং তিনি জানতেন বিশ্বামিত্র মুনীর নিযুক্ত কোন এক রাক্ষসের আক্রমণে তাঁর পিতা নিহত হন। এই রাক্ষসকুলকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য তিনি বদ্ধ পরিকর হন। মহামুনীর মহাক্রোধে সমস্ত সৃষ্টি যখন তার ভারসাম্য হারাতে চলেছে, তখন তাঁর  পিতামহ তথা গুরু মহর্ষি বশিষ্ঠ তাঁকে শান্ত করেন। তাঁকে বোঝান তাঁর পিতার মৃত্যু পূর্বনির্ধারিত। পরাশর মুনী কে বুঝিয়ে বলেন স্বয়ং ত্রিলোকেশ্বর তাঁর জন্য যে কর্ম নির্ধারণ করেছেন, অনাবশ্যক ক্রোধ তাঁর সেই কর্মকে বিনাশ করবে। এই রাক্ষসকুলকে ক্ষমা করার মধ্য দিয়েই তাঁর প্রজ্ঞার বিকাশসাধন সম্ভব। পিতামহের এই নির্দেশ পরাশর মুনীর জীবনদর্শনকে সম্পুর্ণ বদলে দেয় , পরবর্তী তে তিনি ঋষির জীবন যাপন করেন । জীবনের বেশ কিছু সময় তিনি হিমালয়ের বিভিন্ন প্রান্তে সাধনা করেন এবং অবশেষে ত্রিলোকেশ্বরের কৃপায় মোক্ষলাভ করেন। মহামুনী পরাশরের সমস্ত সাধনক্ষেত্রই অত্যন্ত পুণ্যভূমি হিসাবে চিহ্নিত এবং আজও সেই সমস্ত জায়গায় মহামুনী পূর্ণ মর্যাদায় পূজিত হন।
                            এমনই এক সাধনক্ষেত্র দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। বর্তমানে এই সাধনক্ষেত্র পরাশর ঝিল নামে পরিচিত। হিমাচল প্রদেশের মান্ডি শহর থেকে ৪৯ কিমি  উত্তরে আজও এই সাধনক্ষেত্র দৃশ্যমান। চারিদিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা উপবৃত্তাকার এক সরোবর, যার ৭ শতাংশ জুড়ে রয়েছে ঘাস আর পানাজাতীয় উদ্ভিদ দিয়ে তৈরী একটি দ্বীপ। এই দ্বীপটি এক জায়গায় স্থির নয়। সরোবরের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময় একে অবস্থান করতে দেখা যায়। 


কথিত আছে মহামুনী পরাশর এই সরোবরের প্রান্তে দীর্ঘদিন তপস্যা করেছেন। আজও এই সরোবরের পাশে প্যাগোডা আকৃতির মন্দিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের দ্বারা নিত্য পূজিত হন মহামুনী পরাশর। এ সরোবরের সৃষ্টি নিয়ে অনেক প্রচলিত কাহিনী আছে। তার সত্যতা যাই হোক না কেন এই সাধনক্ষেত্র স্বমহিমায় উজ্জ্বল। সরোবর টির সমস্ত প্রান্ত উঁচু পাহাড় দিয়ে ঘেরা। প্রকৃতি যেন মহামুনীর সমস্ত সাধন মহিমা কে দুহাতে আগলে রেখেছেন। ত্রিলোকেশ্বরের মানসপুত্র এই মহামুনী। তাই তাঁর সাধনক্ষেত্রের তিনিই রক্ষাকর্তা। এই সরোবর রহস্যে ঘেরা। আজও কেউ জানে না এই সরোবরের গভীরতা কত। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন,  কোন এক সময়ে সুদীর্ঘ মহীরুহ কে এই সরোবরের মধ্যে ডুবে যেতে দেখা গিয়েছে। মহামুনী পরাশর স্বয়ং মহাসমুদ্র। তাঁর প্রজ্ঞা, তাঁর সাধন মহিমার গভীরতার পরিমাপ করা সাধারণ মানুষের কল্পনার অতীত। তবে এই সরোবরের প্রাকৃতিক মাধুর্যে ভারতবর্ষের সনাতন সংস্কৃতির গভীরতার আভাস মেলে।  ক্ষমা পরম ধর্ম - এই মূল্যবোধের উপর দাঁড়িয়ে থাকা আর্যাবর্তের সনাতন ঐতিহ্য আবহমান কাল ধরে লালন করে চলেছে এক আত্মনির্ভর মানবসভ্যতাকে যার নাম - ভারতবর্ষ।

Friday, 8 May 2020

তথাগতের বিচার


                                  সারা পৃথিবী এখন এক সীমাহীন অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। হাজার হাজার মানুষ হারিয়েছে তার কাজ। অনেকেই আশায় আছে এই পরিস্থিতি কয়েক দিনের মধ্যে কেটে যাবে আবার সবাই যে যার কাজ ফিরে পাবেন। গুছিয়ে নেবেন এলোমেলো হয়ে যাওয়া জীবনটা। কিন্তু সবাই কি পারবেন? না। এমন অনেক মানুষ আছেন যারা সারা বছরের প্রয়োজনীয় অর্থ উপার্জন করেন মাত্র তিন থেকে চার মাস সময়ের মধ্যে। কারণ বছরের বাকি সময় তাদের পেশার ছুটি। তারা কি পারবেন গুছিয়ে নিতে?  ইতিহাসের পাতায় নাম খোদাই হলে মানুষের বড় রোমাঞ্চ জাগে। আর  রোমাঞ্চের এই নেশা কেই পেশা করে বেঁচে থাকে বেশ কিছু মানুষ।  এমনই একদল মানুষকে আমরা চিনি শেরপা হিসেবে। 

                             শেরপা - ভারত এবং নেপালের পর্বতারোহণের প্রধান কান্ডারী। যারা দুঃসাহসিক অভিযানের মধ্য দিয়ে একের পর এক শৃঙ্গ জয় করেন তারা জানেন এই জয়ের আসল কারিগর কারা। ১৯০৯ সাল থেকে পর্বতারোহীদের মালবহনের মধ্য দিয়ে এই জগতে এদের প্রবেশ। প্রধানতঃ high-altitude porter হিসেবেই এদের পরিচিতি। পর্বতারোহীদের অভিজ্ঞতার দস্তাবেজ থেকে জানা যায় এই high-altitude porter রা নিজেদের শরীরের ওজনের দ্বিগুণ ওজন বহন করার ক্ষমতা রাখেন। আর তাই পর্বতারোহীদের মালপত্র বহনের কাজে এদের নিযুক্ত করা হয়। আরো কয়েক টি দলের মানুষ এই কাজে নিযুক্ত হলেও ১৯৩৩ সালের পর থেকে এই পেশায় একছত্র অধিকার কায়েম করেন শেরপারা। ১৯৫৩ সালের পর থেকে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেয় এই মালবাহকের দল। তেনজিং নোরগে বিশ্ব বিখ্যাত শেরপা, পর্বতারোহণ কে আগামী প্রজন্মের কাছে খুলে দিয়ে যান পেশা হিসেবে। আর আজ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভারত এবং নেপালের বিভিন্ন শৃঙ্গ জয়ের উদ্দেশ্যে যে সমস্ত অভিযাত্রী দল আসেন তাদের অভিযানের প্রধান স্তম্ভ হল এই শেরপারা। অভিযাত্রীরা যে পথে যাবেন, পর্বতের পাদদেশ থেকে শৃঙ্গ পর্য্যন্ত সেই পথ কে প্রশস্ত করেন এই শেরপারা। পর্বতারোহী দের ভাষায় যাকে route opening বলা হয়। প্রতিটি অভিযান শুরু হয় এই route opening দিয়ে যা অভিযাত্রীরা করেন না করে শেরপারা। শেরপাদের তৈরী করে দেওয়া রাস্তার একচুল বাইরে গেলে অভিযাত্রীদের সফলতার সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। পর্বতারোহণের জন্য যে সমস্ত উপকরণ লাগে সেগুলির প্রচুর ওজন। সে সমস্ত উপকরণ, তাঁবু, অক্সিজেন, খাবার দাবার এই সমস্ত কিছু বয়ে নিয়ে যান শেরপারা। দূর্গম পর্বতে ২৫০০০ ফিট বা তারও বেশী উচ্চতায়, এই বিপুল ওজন বহন করা এবং অকল্পনীয় প্রতিকুল আবহাওয়ার মধ্য দিয়ে, প্রতি পদে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, কঠিন চড়াই অতিক্রম করে অভিযাত্রী দের সহযোগিতা করে্ন এই শেরপারা। বছরে যে ক'মাস অভিযান চলে ততদিন ফুরসত নেই এই শেরপাদের। সব থেকে বেশী অভিযাত্রী আসেন মাঊন্ট এভারেস্ট জয়ের উদ্দেশ্যে।  এক এক জন শেরপা এক একটা season এ তিন থেকে চারবার এভারেষ্ট শৃঙ্গে পৌঁছে যান অভিযাত্রী দের নিয়ে। এটাই এদের পেশা। আর নিজেদের জীবন বাজি রেখে এই ক'মাসে এরা যা রোজগার করেন সেই দিয়েই পরিবরের সকলকে নিয়ে বেঁচে থাকতে হয় গোটা বছর। আবার পরের season এর অপেক্ষায়, আবার চরম অনিশ্চয়তার পথের অপেক্ষায়। এ বছর এদের কি হবে? সারা বিশ্বজুড়ে সমস্ত দেশের সরকার এবছর পর্বত অভিযান নিষিদ্ধ করেছে। এবার আর open হয়নি route। নিঠুর নিয়তি এদের গ্রাসাচ্ছাদনের একমাত্র route  এ টেনে দিয়েছে পূর্ণচ্ছেদ। এরা কি পারবে অগোছালো জীবনটাকে আবার গুছিয়ে নিতে? হয়তো পারবে। পারতে তো হবেই। তারা যে বেড়াতে যাওয়ার মত করে পাহাড়ে চড়তে জানে।


                কারা এই শেরপা। পৃথিবী জুড়ে শেরপারা যেভাবেই পরিচিত হোক না কেন আসলে শেরপা হল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, অত্যন্ত শান্তিপ্রিয়, তিব্বত থেকে ভারতে এবং নেপালে ছড়িয়ে পড়া একটি জনজাতি, যারা Tibeto-Burman language group এর সদস্য হলেও আজও দেবনাগরী হরফে লেখেন। এ হরফ তাদের নিজের দেওয়া পরিচয় সাম্বোটা নামে পরিচিত। এই শেরপা জনজাতীর মানুষ ধর্মনিষ্ঠ, অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং সবল। ১০০০০ ফিট উচ্চতার উপরে এরা থাকতে অভ্যস্ত এবং এদের প্রধান পেশা হল high altitude farming। আদতে শেরপা জনজাতির মানুষ পর্বতারোহণের ঘোর বিরোধী এবং এরা বিশ্বাস করেন পর্বত হল ভগবানের শান্তিনিবাস যেখানে পা রাখলে তাঁর শান্তিভঙ্গ করা হয়। পর্বতারোহী শেরপাদের সঙ্গে সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের উপর নির্ভরশীল শেরপা জনজাতির মানুষদের যথেষ্ট বিরোধ আছে। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় এভারেষ্ট জয় করার জন্য সারা বিশ্ব যখন তেনজিং নোরগে কে সম্মানিত করেন, তখন তাঁকে তাঁর নিজের জনগোষ্ঠী থেকে কার্যত বিতাড়িত করা হয়। ভগবানের শান্তিনিবাসের শান্তি অন্তত এক বছর বহাল থাকবে এই ভেবে খুশী এই উচ্চপর্বতের কৃষকবৃন্দ। ভগবানের ধ্যানমন্দির কলুষিত করার অভিযান বন্ধ হওয়াকে তাঁরা ভগবানের নির্দেশ হিসেবেই গ্রহণ করেন। 
                    দুটি পরস্পরবিরোধী মূল্যবোধ আর দুটি ভিন্ন পেশায় নি্যুক্ত একই জনজাতির মানুষদের মধ্যে আবহমান কাল ধরে এ বিরোধ চলে আসছে, আগামী দিনেও চলতে থাকবে। পর্বতারোহী শেরপা দের হয়তো খুঁজে নিতে হবে নতুন পথ কারণ পর্বত অভিযানের প্রশস্ত পথ হয়ত আর খুব বেশিদিন ভগবান বুদ্ধের শান্তিভঙ্গ করতে পারবে না।


                                      এভারেষ্টের চূড়ায় হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই ঘোষিত হবে স্থায়ী লকডাউন। পৃথিবীর উচ্চতম শৃঙ্গের অস্তিত্ব রক্ষায় তথাগত হয়তো সেই ফরমান জারি করবেন যাতে লেখা থাকবে শেরপা জনজাতির মনের কথা। আজ বুদ্ধপূর্ণিমার গোলাকার চাঁদের দিকে তাকিয়ে প্রার্থণা করছেন পর্বতারোহী আর তার ঘোর বিরোধী শেরপারা । ভক্তের ডাকে সাড়া দিয়ে নিজের শান্তিনিবাস খুলে রাখবেন নাকি তাঁর সৃষ্টির বিপন্ন অস্তিত্বকে রক্ষার তাগিদে বেছে নেবেন চিরশান্তির পথ - তা একান্তই তথাগতের বিচারাধীন
















Tuesday, 5 May 2020

অমাবস্যার আলো

                           অমাবস্যা বললেই মনে ভেসে ওঠে চাঁদহীন রাত আর নিকশ কালো অন্ধকারের ছবি। অমাবস্যা মানেই ক্ষয়ে যেতে যেতে চাঁদের হারিয়ে যাওয়া। কিন্তু এর ব্যতিক্রম ও ঘটে। অমাবস্যার রাতও আলোয় ঝলমল করতে পারে। না কৃত্রিম বৈদ্যুতিক বাতি বা আতস বাজি নয়। প্রকৃতি তার আলোকভান্ডারের অন্য রত্ন দিয়ে মিটিয়ে দেয় চাঁদের অভাব। নাই বা থাকল চাঁদের হাসি, আলোকের ঝর্ণাধারা যে প্রবহমান। অবিশাস্য হলেও সত্যি। 
           
                       আমি রয়েছি তপোবনে। ১৪৬৪০ ফুট উচ্চতায়, বেশ কয়েকটি হিমবাহে ঘেরা অমর গঙ্গা নদীর ধারায় স্নাত এই তপোবন। অমরগঙ্গা বয়ে চলেছে দূর্নিবার গতিতে আর জলের সেই চলার আওয়াজ ই এই উপত্যকার একমাত্র শব্দ।সমস্ত উপত্যকা যেন নির্জনতার চারণক্ষেত্র। পায়ে পায়ে চলতে চলতে এসে দাঁড়িয়েছি সেই মহামহিমের শ্রীচরণতলে। শিবলিঙ তুষারশৃঙ্গ। এই শৃঙ্গ যেন মহাযোগীর প্রতিমূর্তি। ধ্যানমগ্ন, অধোবদন, নির্মোহ। পাহাড়ের ঢালটা এমন ভাবে এই শৃঙ্গের সঙ্গে আছে যেন ইষ্টদেবের কোলে পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে দেবতার ভক্ত। এই উপত্যকা মহাযোগী মহাদেবের তপস্যাক্ষেত্র। এ্ত অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য দেখতে পাওয়া পরমগুরুর আশীর্বাদ। 
                              রাত্রিবাসের ব্যবস্থা এক সাধুবাবার কুটিরে।এই সাধুবাবা রামের ভক্ত। পর্যটকদের সেবা করা পরম পূণ্যের কাজ বলে মনে করেন। নিজের ইষ্টদেবকে নিজের কন্ঠ উৎসর্গ করেছেন। দীর্ঘ আঠারো বছর কথা বলেন না। দুপুরের খাওয়ার আয়োজন এনার কুটিরে। বেশ কয়েকজন সীমান্তরক্ষীও প্রতিদিন এই সাধুবাবার আতিথ্য গ্রহণ করেন।খেতে খেতে কথা হচ্ছিল তাদের সাথে।পাহাড়ে যাওয়ার নির্ঘন্ট তৈরীর আগে পূর্ণিমার ব্যাপারটা সর্বদা মাথায় রাখা হয়। কিন্তু সময়ের ফেরে এমন রজতগিরি পরিবেষ্টিত পূণ্যভূমিতে কাটাতে হবে অমাবস্যার রাত। এই আফশোষের কথা বলছিলাম। ওদের মধ্যে একজন আমাকে বললেন পূর্ণিমার হিমালয় তো সবাই দেখে। অমাবস্যার হিমালয়  - কিসমত মে হোনা চাহিয়ে।বড় অদ্ভুত লাগল ওনার কথা।কুটির থেকে চলে যাওয়ার আগে আমাকে বলে গেলেন - কাল মিলেঙ্গে, কিসমত কা খেল জরুর দেখনা। মানে বুঝলাম না তার কথার । শুধু এটুকু বুঝলাম হিমালয়ের প্রতিমুহূর্তে অনিশয়তা। কিসমত সত্যিই কি খেলা দেখাবে কেউ জানে না। 
                            পাহাড়ে সূর্যাস্ত বেশ দেরীতে হয়, আর তার পরেই এক মুহুর্তে নেমে আসে ঘন আঁধার। আজ অমাবস্যা। মনখারাপ করা অন্ধকারে ডুবে গেল চারিদিক। অতঃপর স্লিপিং ব্যাগে প্রবেশ। সূর্য্য ডোবার সাথে সাথেই মালুম হতে লাগল হিমবাহ ক্ষেত্রে রাত্রিবাসের মহিমা। ক্রমশঃ যেন রক্ত হিম হয়ে আসছে। চোখ বোজার তো প্রশ্নই ওঠে না। আমার পাশে যে দূরদ্বীপবাসিনী আছেন উনি বেশ কিছুদিন এখানে থাকার সুবাদে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। আমি নিদ্রাহীন। কফিনবন্দী মৃতদেহে প্রাণ ঢেলে দিলে যা হয়, ঠিক সেই অনুভুতি হয় স্লিপিং ব্যাগে। রাত গড়িয়ে কত হল কে জানে। পাথরের ওই ঘরটা থেকে একটু বাইরে এলাম। বালতি তে রাখা জল ও জমে বরফ হয়ে গেছে। কি মনে হল আর একটু এগোলাম। নিজের অগোচরে চোখ গিয়েছে আকাশে। বেমালুম ভুলে গিয়েছি ঠান্ডা, অক্সিজেন কম, কোল্যাপ্স করে যাওয়ার সম্ভাবনা সমস্ত কিছু। কি দেখছি আমি! সমস্ত আকাশটাতে এক বিন্দু খালি জায়গা নেই।ছোটবড় হাজার হাজার তারা একটার সঙ্গে আর একটা যেন আঠা দিয়ে আঁটকানো। সমস্ত আকাশটা যেন অত্যন্ত ঘন বুনটের মিহি একটা জাল। যতদূর দৃষ্টি চলে কোথাও এতটুকু ফাঁক নেই। পৃথিবীর আকাশে এত তারা আছে? আর একটু এগিয়ে গেলাম শিবলিঙ এর দিকে। বিস্ময়ের আরো কিছু বাকি ছিল। এবার দেখলাম অসম্ভব  ঊজ্জ্বল কিছু তারা, যাদের রশ্মি আক্ষরিক অর্থে মাটিতে নেমে আসছে যেন জোরালো টর্চ এর আলো। এমন ঘন কালো আকাশ তো শুধু অমাবস্যাতেই দেখা যায়। তার উপর এই হাজার তারার আলোর খেলা! আর সেই খেলা দেখতে পাওয়া! এতো সত্যিই কিসমত কা খেল। এবার চোখ রাখলাম মহাযোগীর দিকে। এই গহন রাতে আপন আলোকভান্ডারের শত শত রত্নের ছটায় উদ্ভাসিত। অন্ধকারের উৎস থেকে উৎসারিত আলোয় সুসজ্জিত, স্বমহিমায় যোগনিদ্রায় মগ্ন, সমাহিত। প্রণাম জানালাম-

                                                      ধ্যায় নিত্যম রজতগিরিনিভম মহেশম




                    আচমকা কে যেন আমার পিঠে হাত রেখেছে। তাকিয়ে দেখলাম দূরদ্বীপবাসিনী । খুব নীচু স্বরে বলল - you will shrink. সম্বিত ফিরে পেলাম। মনে মনে ভাবলাম কিসমতের যে খেল আমি দেখলাম এরপর shrink করে গেলে কিছু যায় আসে না। বাকি রাতটা কেমন ঘোরের মধ্যে কেটে গেল। ঘোর অমাবস্যার রাতে এমন আলোর রোশনাই দেখার বিরল অভিজ্ঞতা কজনের ভাগ্যে হয়। পরমেশ্বরের কি নিপুণ পরিচালনা! গভীর শ্রদ্ধায় মনটা গেয়ে উঠল -
                                                           সব আলো তার কেমন করে
                                                           পড়ে আমার মুখের পরে
                                                          তুমি আপনি থাকো  আলোর পিছনে
                                                         এত আলো জ্বালিয়েছ এই গগনে
                                                         কি উৎসবের লগনে
                                                           




Monday, 4 May 2020

ন্যায়াধীশ

                ঈশ্বরে বিশ্বাস আছে কি নেই , ঈশ্বর বলে আদৌ কিছু আছে কি না এই নিয়ে মানুষের মনে নিরন্তর যুদ্ধ চলে। বিভিন্ন বয়সে, জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতে মানুষ  তার সিদ্ধান্ত বদলায়। আবহমান কাল ধরে এই ভাবেই চলে আসে মানুষের সাথে ঈশ্বরের সহাবস্থান। কখনো বিশ্বকবি বলেন - 'আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর তোমার প্রেম হত যে মিছে' আবার কখনো বিদ্রোহী কবি বলেন - " খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে"। তবে দুরন্ত শিশুকে ভয় দেখাতে মা কে যে বলতেই হয়  - ঠাকুর পাপ দেবে কিন্তু। তা সে মায়ের ঈশ্বর উপলব্ধি যাই হোক না কেন। পরিচিত কোন পরিবারে একজন অশীতিপর শয্যাশায়ী সদস্যের চোখের সামনে যদি তার সন্তানের অকাল মৃত্যু হয় অজ্ঞাতসারেই আমরা বলি - ভগবানের কি বিচার! মানুষের আদালতে বেকসুর খালাস হয়ে যাওয়া কোন অপরাধী যখন বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়,  আমাদের প্রত্যয়ী মন বলে - ওপরওয়ালা  এর বিচার নিশ্চয়ই করবেন। ন্যায় পাওয়ার জন্য এই আদালতের উপর আমরা সবাই নির্ভরশীল। সুবিচারের এই আকাঙ্খা কোথায় যেন একসূত্রে বেঁধে দেয় ভক্তের সঙ্গে ভগবান কে, ন্যায়প্রার্থীর সঙ্গে ন্যায়াধীশ কে।
                   উত্তরাখন্ডের কুমায়ুন মণ্ডলের বিনসার অভয়ারণ্যে অস্তগামী সূর্য্যের দিকে তাকিয়েছিলাম। পাহাড়ে সূর্য্যাস্ত দেখার অন্যতম আকর্ষণ হল ঘরের দিকে উড়ে চলা পাখির ঝাঁক। শত শত পাখি যেন ঝাঁপিয়ে পড়তে চায় গোল থালার মত নরম সূর্য্যটার বুকে। সারাদিন ধরে তাদের সঙ্গে হওয়া সমস্ত অবিচারের নালিশ জানাতে চায় ঘরমুখী সূর্য্যটাকে, যাতে সে পরের দিন সুবিচারের ডালি নিয়ে আসে এই ছোট্ট যোদ্ধাদের জন্য। অপরূপ সে আবেদনের ভঙ্গী। আলমোড়া জেলার এই অঞ্চল ভক্তদের কাছে ভগবানের ন্যায়ক্ষেত্র। বিনসার থেকে ২ কিলোমিটার দূরে চিটাই গোলু দেবতার মন্দির। এই মন্দিরে গৌর ভৈরব রূপী দেবাদিদেব মহাদেব, গোলু দেবতা হিসেবে পূজিত হন ।  গোলু দেবতা ন্যায়ের দেবতা। শ্বেতশুভ্র ঘোড়া তাঁর বাহন। অবিচারের অত্যাচারে পীড়িত কোন ভক্ত যখন গোলু দেবতাকে স্মরণ করেন, তিনি ঘোড়া ছুটিয়ে যান ভক্তের কাছে, ভক্তের প্রতি ন্যায় প্রদর্শণের জন্য। এরকমই মানুষের বিশ্বাস।
                 তবে এই বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি স্তর বড় অভিনব। দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা আসেন ন্যায়াধীশের দরবারে। ন্যায়াধীশকে উদ্দেশ্য করে লিখতে হয় আবেদন পত্র। যার যা মনের বাসনা অকপটে নিবেদন করতে হয় গোলু দেবতার চরণে। মন্দিরের পুরোহিত এই আবেদন পত্র রাখেন দেবতার পায়ে, তারপর তা মন্দিরের কোন অংশে সুতো দিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। বহুদিন ধরে চলে আসছে এই রীতি।  চিরপাইন আর ঝাউ গাছে ঘেরা মধ্যপরিসরের মন্দির যার চারদিকে গোল বারান্দা। সমস্ত বারান্দা এবং মন্দিরের প্রবেশদ্বার জুড়ে ঝুলে রয়েছে লক্ষাধিক চিঠি। ভগবানের কাছে ভক্তের আবেদন। কোন চিঠি সন্তানের মঙ্গলকামনায় লিখেছেন মা, কোনটিতে কোনো অন্যায়ের স্বীকারোক্তি, কোন চিঠি ভালোবাসা র মানুষকে পাওয়ার কামনায় লেখা। সবচেয়ে আকর্ষণীয় আবেদন হল স্টাম্প পেপারে লেখা প্রতিশ্রুতি।  হাজার হাজার আবেদন পত্র সরিয়ে সরিয়ে প্রবেশ করতে হয় মন্দিরের ছোট্ট গর্ভগৃহে।
                               এ তো গেল আবেদন। সুবিচার কি সত্যি ই মেলে! এ প্রশ্নের উত্তর ও এই মন্দিরেই আছে। যতক্ষণ মন্দিরে ভক্তের আনাগোনা থাকে ততক্ষণ মন্দিরে নিরন্তর চলে ঘন্টাধ্বনি। সুবিচার প্রাপ্তির ঘোষণার ধ্বনি। যে সমস্ত ভক্ত এই মন্দিরে আবেদন পত্র দিয়ে যান তা যখন মঞ্জুর হয়, ভক্তের মনের বাসনা যখন পূর্ণ হয়, তখন তিনি তার সামর্থ্য অনুযায়ী একটি ঘন্টা বেঁধে দিয়ে যান এই মন্দিরে। মন্দিরে বেঁধে রাখা রাশি রাশি ঘন্টা যুগ যুগ ধরে বেঁধে আসছেন ভক্তের দল। ভগবানের আদালতে বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে না বরং হাজার হাজার ঘন্টার সম্মিলিত ধ্বনী আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে ঘোষণা করে - বাবা কী দরবার মে দের হ্যায় পর অন্ধের নেহী।




                                    গোলু দেবতার মন্দিরে ভগবানের উদ্দেশ্যে লেখা এই খোলা চিঠি আর ভগবানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শণের জন্য নিরন্তর বাজতে থাকা ঘন্টাধ্বনী শুনতে শুনতে মনে হয় সমস্ত সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু ই তো তিনি। তিনিই তো পথপ্রদর্শক। ভক্তের প্রতি ঘটা অবিচারের তিনিই তো বিচারপতি।
 ত্বমেব মাতা পিতা ত্বমেব
ত্বমেব বন্ধুশ্চ সখা ত্বমেব


Sunday, 3 May 2020

পরম্পরা

                আজ কতদিন হয়ে গেল স্কুল কলেজ সব বন্ধ। চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দী থাকতে থাকতে বাচ্ছা গুলো তিতিবিরক্ত হয়ে যাচ্ছে যেন। আমাদের বাড়ীর নিচে প্রতিদিন তিন চারটে বাচ্ছা খেলতে আসে। সবার মুখে মাস্ক। কি অদ্ভুত দেখতে লাগে। ছোট্ট শিশুগুলোর সরল হাসি লাল নীল কালো মাস্কের আড়ালে ঢাকা । কি নিদারুণ অত্যাচার। রোজ ওদের বিভিন্ন খেলা বসে, স্কুল স্কুল, বাজার বাজার, বাস বাস আরো কত কি। আজ দেখলাম ওদের মধ্যে একজন কিছুতেই এক জায়গায় থাকছে না। শুধু ছুটে চলে যেতে চায়। আমি ওদের বললাম আয় তোদের একটা খেলা শেখাই। বললাম দেখি তো কে কতক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে পারিস। যার চোখের পাতা পড়ে যাবে তার দান শেষ। বেশ মজা করে খেলতে লাগল বাচ্ছা গুলো। আমার মনে হল আসলে যুগ যুগ ধরে আমাদের বড় হওয়াটা এক ই রকম। এই বোধহয় পরম্পরা। এই সূত্রেই আবার পৌঁছে গেলাম হিমালয়ে।
                  আজই এক সহকর্মীর সাথে আলোচনা হচ্ছিল। হিমালয় আসলে বেড়ানোর জায়গা নয়, বেরোনোর জায়গা। সমস্ত অজ্ঞানের অন্ধকার থেকে, অনেক জেনে ফেলার অহংকার থেকে, অনেক কিছু পেয়ে যাওয়ার দর্প থেকে বেরিয়ে আসার জায়গা এই হিমালয়। সেবার উখীমঠে ছিলাম দু'এক দিন। একদিন বেরিয়ে পড়লাম কালীমঠ এর উদ্দেশ্যে। কালীমঠ ১০৮ শক্তিপিঠের অন্যতম পীঠ। ৬০০০ ফিট উচ্চতায় সরস্বতী নদীর উপর প্রতিষ্ঠিত একটি মন্দিরে হয়  শক্তির আরাধনা।নদীটি মজে যেতে যেতে এখন নালায় পরিণত। তার উপর একটি কালো বড় পাথরের উপর গড়িয়ে পড়া রক্তের মত লাল দাগ। কথিত আছে মা এই পাথরের উপর রক্তবীজের নিধন করে সরস্বতী নদীতে বিলীন হয়ে যান। মন্দিরে কোন বিগ্রহ নেই। যাই হোক মন্দির দর্শণ করে গেলাম সরস্বতী নদীর দিকে। চারিদিকে মাল্টা র গাছ ফলে ভর্তি হয়ে হলুদ হয়ে আছে।
                   পাহাড়ি পথে খানিকটা উঠে একটা জায়গায় এলাম যেখানে একটা বড় পাথরের মাথাটা গোল থালার মত। সেখানে একজন সাধক হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে আছেন সূর্য্যের দিকে তাকিয়ে।পরণে তার সাধুর বেশ নেই। সাধারণ পোশাক। তিনি  নাকি প্রতিদিন এভাবেই সাধনা করেন। খানিকটা এগিয়ে গেলাম। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন সূর্য্যের দিকে। জগতের কোন কিছুর সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক নেই। সময় বয়ে যায়, সূর্য্যের তেজ বাড়ে। এক মুহুর্ত তাকালে যেখানে আমাদের চোখ অন্ধকার হয়ে যায় সেই সূর্য্যের দিকে অপলক দৃষ্টিতে জোড়হাতে দাঁড়িয়ে আছেন এই প্রবল শক্তিমান যোগী। সূর্য্য যেমন ঘোরে ওনার অভিমুখ ও তেমন ভাবেই বদলায়।  চোখের সামনে যেন ঘটে চলেছে এক মহাজাগতিক ঘটনা। অবিশ্বাস্য। কালীমঠের স্বামীজী বললেন এই যোগাভ্যাস নাকি আমাদের সনাতন পরম্পরা। এই ভাবে সূর্য্যের সাথে ঘুরতে ঘুরতে তিনটে নাগাদ যখন সূর্য্যের তেজ অনেক কমে এসেছে তখন তিনি হাত নামালেন।সোজা হেঁটে চলে গেলেন নিজের কুটিরের দিকে।
                                  এই পরম্পরা আমাদের দেশের সম্পদ। ছোট বেলা থেকে এই একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার অভ্যাস আর তার নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে মানুষ তার অন্তর্নিহিত সুপ্ত শক্তির ব্যাপক বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হতে পারে। তবে এ এক কঠিন যোগাভ্যাস। যোগসাধনার এই পথ এর নাম ত্রাটক। ত্রাটক শব্দের অর্থ অপলক দৃষ্টি। কোন একটি বস্তুর দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে যোগ সাধনা করেন যে সমস্ত যোগী, তাদের ত্রাটক যোগী বলা হয়। যার যোগ বল যত বেশী তিনি তত উজ্জ্বল বস্তুর দিকে তাকিয়ে থাকতে পারেন। এবং এই সাধনায় সবচেয়ে শক্তিশালী সাধক হলেন তাঁরা, যারা সারা দিনমান সূর্য্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারেন চোখের পাতা না ফেলে। এই উচ্চকোটির সাধক সূর্য্যত্রাটক হিসাবে পরিচিত। বাস্তবে অসম্ভব মনে হলেও এই অসম্ভব কে সম্ভব করার পরম্পরার নিদর্শণ আজও পাওয়া যায় হিমালয়ের আনাচে কানাচে।
                                         

                উত্তরাখন্ডে ইনি ছাড়া বর্তমানে আর কোন সূর্য্যত্রাটকের সন্ধান পাওয়া যায় না। এনার পার্থিব শরীরের বয়স কত কেউ জানে না কেউ মাথাও ঘামায় না। গ্রামের মানূষের অগাধ বিশ্বাস তাঁর দৃষ্টিতে বহু রোগের মুক্তি হয়। এই বিশ্বাস ই গ্রামের মানুষগুলোকে সাহস যোগায় কারণ এ গ্রামের থেকে অন্তত ৩০ কিলোমিটারের মধ্যে কোন হাসপাতাল নেই।
                      আমার সৌভাগ্য আমি ওনার দেখা পেয়েছি। চোখের দিকে তাকানোর সুযোগ পেয়েছি। সাধারণ মানুষের থেকে অনেক জ্যোতির্ময় সেই চোখ, দীর্ঘদিন সূর্য্যের দিকে তাকাতে তাকাতে চোখের কালো মণিটা একটু ধূসর হয়ে গেছে। সে চোখের শক্তি সম্পর্কে আমার কোন ধারণা নেই। তবে স্বল্পভাষী এই সাধকের সাথে কথা বলে জানলাম এই সাধনার পরম্পরা  ভক্ত হনুমানের সময় থেকে চলে আসছে। কয়েকজনের মুখে শুনলাম guiness book of world records এর কর্তৃপক্ষ এনার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন যাতে ওনার সাধনার কথা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু প্রত্যন্ত হিমালয়ের আত্মনিমগ্ন এই শক্তিসাধক হেলায় ফিরিয়ে দিয়েছেন সেই প্রস্তাব। এই তো আমাদের পরম্পরা