যে কোন দুই দেশের সীমান্ত আর সেই সীমান্তবর্তী মানুষের ইতিহাস সবসময়েই বৈচিত্রে ভরা। আর সেই দুই দেশ যদি ভারত আর পাকিস্তান হয় তাহলে তো আর কথাই নেই। লাদাখ প্রদেশের সিয়াচেন হিমবাহ ভারত পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক সীমানা। এই সিয়াচেন ক্ষেত্রে প্রবেশ করার আগে কয়েকটি সীমান্তবর্তী গ্রাম আছে। যার মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে শেষের গ্রাম তুরতুক। নুব্রা উপত্যকার শিওক নদীর ধারে পাহাড় ঘেরা শান্ত গ্রাম। কেমন যেন রহস্য দিয়ে ঘেরা। ভৌগলিক অবস্থান অনুযায়ী তুরতুক বাল্টিস্তানের অন্তর্গত যা পুরোপুরি পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণাধীন। এই অদ্ভুত টানাপোড়েনের সূচনা হয়, ১৯৪৭-৪৮ এ ইন্দো-পাক যুদ্ধের সময় থেকে। এই সময়ে পাকিস্তানের গিলগিট অঞ্চলের Gilgit Scouts বাল্টিস্তানের দগরা প্রশাসন কে উচ্ছেদ করে সমস্ত বাল্টিস্তান দখল করে। সেই সময় থেকে তুরতুক, পাকিস্তান সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। বাল্টিস্তা্ন, উত্তর কাশ্মীরের রাজাদের শাসন কালে ভারতের অন্তর্গত ছিল এবং এখানকার অধিবাসীরা বাল্টি বলেই পরিচিত ছিলেন। পাকিস্তানের দখলে যাওয়ার পর এই স্থান গিলগিট বাল্টিস্তান হিসাবে পরিচিত হয়। বাল্টিস্তানের মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মবিশ্বাস সবকিছুই পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশের মানুষদের থেকে একটু অন্যরকম। ১৯৭১ সালে আবার ইন্দো পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়। এই অঞ্চল টি site for Battle of Turtuk হিসাবে চিহ্নিত হয়। ব্রিগেডিয়ার উদয় সিং এর নেতৃত্বে Ladakh scouts এবং Nubra guards এর সেনাবাহিনী পাকিস্তানের সেনাবাহিনী কে বিতাড়িত করে তুরতুক গ্রাম কে আবার ভারতীয় সেনার দখলে নিয়ে আসে। এই যুদ্ধের পর বাল্টিক পাকিস্তান অঞ্চলের চারটি গ্রাম - তুরতুক, তাকসি, চালুংখা আর ধোথাং কে ভারতীয় সেনা পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে এবং গ্রাম গুলি ভারতভুমির অন্তর্ভুক্ত হয়। এই অসাধারণ সাফল্যের জন্য ব্রিগেডিয়ার উদয় সিং এবং তাঁর second in command মেজর চেওয়াং রিঞ্চেন কে মহাবীর চক্র সম্মানে ভূষিত করা হয়। ১৯৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধের সময় আবার পাকিস্তানের আতঙ্কবাদী সংগঠন এই গ্রাম গুলি দখল করার চেষ্টা করে, কিন্তু ভারতীয় সেনা বাহিনীর দক্ষতায় সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ২০১০ সাল পর্য্যন্ত তুরতুক সহ সমস্ত ভারতীয় গ্রাম গুলিতেই সেনাবাহিনী ছাড়া কারো প্রবেশাধিকার ছিল না। তবে ২০১০ সালে তুরতুক গ্রামটিকে পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
তুরতুক থেকে শিওক নদীর উপত্যকাতুরতুকের প্রতি পর্যটকরা যে কারণে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট হন তা আসলে খুব বিরল এক দৃশ্য। পর্যটকদের মধ্যে এই ধারণা আছে তুরতুক থেকে পৃথিবীর দ্বিতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ K2 বা গডউইন অস্টিন দেখতে পাওয়া যায়। কথাটা মিথ্যে না হলেও অর্ধসত্য বলা যেতে পারে। তুরতুক গ্রামের উপরের পাহাড় থেকে আকাশের সীমানায় এই শৃঙ্গ দেখা যায় বটে কিন্তু সাধারণ পর্যটক রা সেই জায়গা পর্য্যন্ত পৌঁছতে পারেন না।
তুরতুক গ্রামে পৌঁছনোর জন্য যে জায়গা অবধি গাড়ি যায়, তা একটা খরস্রোতা ঝর্ণার একদম ধারে। পায়ে চলা রাস্তায় খানিকটা এগিয়ে গেলেই ঝর্ণাটির উপর একটা লোহার ব্রিজ । আশপাশে কোন গ্রাম আছে বলে ধারণাই করা যায় না। ব্রিজ পার হয়ে অপর পারে গিয়ে উঠলাম একদম ঘন এক জঙ্গলের মধ্যে। জঙ্গলের বুক চিরে পাহাড়ী রাস্তা খানিকটা গিয়েই বেঁকে গিয়েছে। কেমন যেন নিষিদ্ধ অঞ্চলে চলে আসার মত অনুভুতি হচ্ছিল। একেই বোধহয় বলে সীমান্তবর্তী অঞ্চল। ঝর্ণার জলের বয়ে চলা আর পাখির ডাক ছাড়া কোন আওয়াজ নেই । পাহাড়ি পথে খানিকটা এগিয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ যেন দিগন্ত খুলে গেল। গ্রামে ঢোকার রাস্তাটা কেমন যেন জঙ্গল দিয়ে আড়াল করা। গ্রামটিকে যেন সযত্নে প্রকৃতির কোলে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। চারিদিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা সবুজ একটা গ্রাম। সামনে প্রশস্ত বার্লি ক্ষেত। দূরে দূরে কয়েকটি বাড়ি যেন ঝুলনের মত সাজানো।
সীমান্তের গ্রাম তুরতুকের বার্লি ক্ষেত
দু'ধারে ক্ষেত আর মাঝখান দিয়ে চলেছে মেঠো রাস্তা। এঁকে বেঁকে গ্রামবাসীদের বাড়ির পাশ দিয়ে। তুরতুক গ্রামের অধিবাসী রা বাল্টি ভাষায় কথা বলে। এখনো মহিলারা বাইরের লোক দেখলে লজ্জায় মুখ ঢাকেন এবং বাড়ির ভিতর ঢুকে যান। যে কয়েকজন মহিলা সামনাসামনি আসেন তাদের দেখেই মনে হয় তারা অত্যন্ত প্রাচীন এবং অভিজাত সম্প্রদায়ের মানুষ। গায়ের রঙ, শরীরের গড়ন সব কিছুর মধ্যেই যেন সেই প্রাচীনত্ব, আভিজাত্য প্রকাশ পায়। পাহাড়ের এই রুক্ষ আবহাওয়া, তীক্ষ্ণ সূর্য্যের আলো কোন কিছুতেই যেন তাদের সোনার মত বর্ণে এতটুকু খাদ মেশাতে পারেনি।
Silk route এর অন্তর্গত হওয়ায় তুরতুক গ্রামে বিভিন্ন সময়ে মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন জায়গা থেকে ব্যবসায়ীরা এসেছেন। কালের ধারায় তুরতুকে বসবাসকারী তিব্বতীয় বন ধর্মাবলম্বী বিভিন্ন জনজাতির মানুষের ধর্ম, সংস্কৃতি এবং জীবনধারায় আমুল পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। ইতিহাস বলে শিওক নদীর ধারে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক অংশে বসবাসকারী বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি বিশ্বাস রাখা একদল মানুষের মধ্যে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এসে পড়েন বিখ্যাত ইসলাম কবি মীর সঈদ আলী হামাদানি। এরপর থেকেই তুরতুক গ্রামের বাসিন্দারা ইসলাম ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন। কিন্তু আজও তুরতুক গ্রামের অধিবাসীরা বন ধর্মের বেশ কিছু আচার আচরণ মেনে চলেন । নমাজধারী ইসলাম ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও তুরতুক গ্রামের অধিবাসীরা সম্পূর্ণ নিরামিশাষী।
সীমান্তবর্তী গ্রাম হওয়ায় বৈদেশিক বাণিজ্যে তুরতুক গ্রামের যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা আছে। এই গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরেই খোবানি বা apricot এর চাষ হয়। এই খোবানি ফল থেকে তার বীজ বের করে তাকে শুকিয়ে বিদেশে রপ্তানি করার সমস্ত কাজ টা তুরতুক গ্রামের মহিলারা করে থাকেন। এই খোবানির জন্যই তুরতুক গ্রামকে বার বার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছে পাকিস্তান এবং এই গ্রাম আক্রান্ত হয়েছে।
গ্রামে ঘুরতে ঘুরতে আলাপ হল মধ্যবয়সী হুসেন বেইগ এর সাথে। শিক্ষিত মানুষ, গ্রামের প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক। ওনার সাথে যখন ওনার বাড়ির পথে চলেছি, পথে দেখা মিলল একঝাঁক ম্যাগপাই পাখির। নিজেদের মধ্যে হইচই করে ঘুরে বেড়াচ্ছে গ্রামের বিভিন্ন বাড়ির কোণায়।
ম্যাগপাই
গ্রামের গল্প বলতে বলতে বেইগ সাহেব আমাদের নিয়ে গেলেন ওনার নির্মীয়মান বাড়ির পিছনে। সেখান থেকে শিওক নদীর চর দেখে মনে হচ্ছে যেন ছোটবড় বিভিন্ন মাপের মাদুর পাতা আছে প্রকৃতির কোলে। মাঝে মাঝে দু একটা লম্বা লম্বা গাছ। বাঁদিকে তাকালেই দেখা যায় রুক্ষ কারাকোরাম পর্বতের সীমানা। এই সীমানায় ভারত এবং চীন উভয় দেশেরই সেনাছাউনী আছে। সেই ছাউনী প্রায় ১০ কিমি দূরে। বেইগ সাহেব আমাদের দেখানোর জন্য বাইনোকুলার নিয়ে এলেন। বেশ কয়েকটা পাথরের উপর বাইনোকুলারটা ঠিক মত রাখতে রাখতে বেইগ সাহেব বলতে লাগলেন তার আক্ষপের কথা। উনি বললেন আমাদের পূর্বজরা নিজেসের অজান্তেই, ঘর থেকে এক পা না বেরিয়েই কখনো হয়েছেন হিন্দুস্তানী, কখনো বাল্টিস্তানী, কখনো আবার পাকিস্তানী। কিন্তু তাদের কথা কেউ শোনেনি। তাদের সমস্যার কথা কেউ ভাবেনি। সময়ের সাথে সাথে নিজেদের অনিচ্ছায় তারা বদলে ফেলতে বাধ্য হয়েছে তাদের সংস্কার, ধর্মবিশ্বাস, জীবনধারা এবং সর্বোপরি নাগরিকত্ব। তবে আজ তারা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে এবং ভারতের নাগরিক হিসাবে তারা অনেক সুরক্ষিত বোধ করে। ইতিমধ্যে বাইনোকুলার ঠিক জায়গায় লাগানো হয়েছে। বেইগ সাহেব একে একে আমাদের দেখাচ্ছেন পাহাড়ের একদম মাথায় মুখোমুখি দুটি সেনাছাউনী যার একটা একটু উঁচুতে। এই উঁচু ছাউনীর মাথায় উড়ছে ভারতীয় তেরঙ্গা। এক ঝলক দেখলেই কেমন গা শিউরে ওঠে। ঐ দুর্গম পর্বতশিখরে টহল দিয়ে চলেছে দু দেশের সেনা। রক্ষা করে চলেছে রাষ্ট্রীয় সীমান্ত। তুরতুক গ্রামের অধিবাসীরা ভারতীয় সেনাদের প্রতি তাদের কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য পালা করে এই রুক্ষ দুর্গম পর্বত শিখরে পায়ে হেঁটে সেনাদের খাবার পৌঁঁছে দিয়ে আসে। আমি বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করি যখন সব টা বরফে ঢেকে যায়! বেইগ সাহেব জবাব দেন - 'দেখা কিতনী উঁচাই পর লহরা রহে হ্যায় হামারা তিরঙ্গা!। কুছ ভি হো যায় উসে ঝুকনা নেহি'।
শ্রদ্ধায় মাথা নীচু হয়ে যায়। হয়তো বা সীমান্তের এত কাছে আছে বলেই দেশের প্রতি এত ভালোবাসা। বারবার দেশবদল হয়েছে, বদলেছে জীবন কিন্তু বদলায়নি দেশমাতৃকার প্রতি তাদের ভালোবাসা, জাতীয় পতাকার প্রতি তাদের শ্রদ্ধা, ভারতীয় সেনাদের প্রতি তাদের কর্তব্যনিষ্ঠা। তাই বার বার পাল্টে যাওয়া এই পাল্টিস্তানিরাই আমাদের দেশের সম্পদ, সত্যিকারের হিন্দুস্তানী।






