Friday, 11 June 2021

পাল্টিস্তানি

                          যে কোন  দুই দেশের সীমান্ত আর সেই সীমান্তবর্তী মানুষের ইতিহাস  সবসময়েই বৈচিত্রে ভরা। আর সেই দুই দেশ যদি ভারত আর পাকিস্তান হয় তাহলে তো আর কথাই নেই। লাদাখ প্রদেশের সিয়াচেন হিমবাহ ভারত পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক সীমানা। এই সিয়াচেন ক্ষেত্রে প্রবেশ করার আগে কয়েকটি সীমান্তবর্তী গ্রাম আছে। যার মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে শেষের গ্রাম তুরতুক। নুব্রা উপত্যকার শিওক নদীর ধারে পাহাড় ঘেরা শান্ত গ্রাম। কেমন যেন রহস্য দিয়ে ঘেরা। ভৌগলিক অবস্থান অনুযায়ী তুরতুক  বাল্টিস্তানের অন্তর্গত যা পুরোপুরি পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণাধীন। এই অদ্ভুত টানাপোড়েনের সূচনা হয়, ১৯৪৭-৪৮ এ ইন্দো-পাক যুদ্ধের সময় থেকে। এই সময়ে পাকিস্তানের গিলগিট অঞ্চলের Gilgit Scouts বাল্টিস্তানের দগরা প্রশাসন কে উচ্ছেদ করে সমস্ত বাল্টিস্তান দখল করে। সেই সময় থেকে তুরতুক, পাকিস্তান সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। বাল্টিস্তা্‌ন, উত্তর কাশ্মীরের রাজাদের শাসন কালে ভারতের অন্তর্গত ছিল এবং এখানকার অধিবাসীরা বাল্টি বলেই পরিচিত ছিলেন। পাকিস্তানের দখলে যাওয়ার পর এই স্থান গিলগিট বাল্টিস্তান হিসাবে পরিচিত হয়। বাল্টিস্তানের মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মবিশ্বাস সবকিছুই পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশের মানুষদের থেকে একটু অন্যরকম। ১৯৭১ সালে আবার ইন্দো পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়। এই অঞ্চল টি site for Battle of Turtuk  হিসাবে চিহ্নিত হয়। ব্রিগেডিয়ার উদয় সিং এর নেতৃত্বে Ladakh scouts এবং Nubra guards  এর সেনাবাহিনী পাকিস্তানের সেনাবাহিনী কে বিতাড়িত করে তুরতুক গ্রাম  কে আবার ভারতীয় সেনার দখলে নিয়ে আসে। এই যুদ্ধের পর  বাল্টিক পাকিস্তান অঞ্চলের  চারটি গ্রাম - তুরতুক, তাকসি, চালুংখা আর ধোথাং  কে ভারতীয় সেনা পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে এবং গ্রাম গুলি ভারতভুমির অন্তর্ভুক্ত হয়। এই অসাধারণ সাফল্যের জন্য ব্রিগেডিয়ার উদয় সিং  এবং তাঁর  second in command মেজর চেওয়াং রিঞ্চেন কে মহাবীর চক্র সম্মানে ভূষিত করা হয়। ১৯৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধের সময় আবার পাকিস্তানের আতঙ্কবাদী সংগঠন এই গ্রাম গুলি দখল করার চেষ্টা করে, কিন্তু ভারতীয় সেনা বাহিনীর দক্ষতায় সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ২০১০ সাল পর্য্যন্ত তুরতুক সহ সমস্ত ভারতীয় গ্রাম গুলিতেই সেনাবাহিনী ছাড়া কারো প্রবেশাধিকার ছিল না। তবে ২০১০ সালে তুরতুক গ্রামটিকে পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়। 

                                                                                           তুরতুক থেকে শিওক নদীর উপত্যকা

                      তুরতুকের প্রতি পর্যটকরা যে কারণে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট হন তা আসলে খুব বিরল এক দৃশ্য। পর্যটকদের মধ্যে এই ধারণা আছে তুরতুক থেকে পৃথিবীর দ্বিতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ K2 বা গডউইন অস্টিন দেখতে পাওয়া যায়। কথাটা মিথ্যে না হলেও অর্ধসত্য বলা যেতে পারে। তুরতুক গ্রামের উপরের পাহাড় থেকে আকাশের সীমানায় এই শৃঙ্গ দেখা যায় বটে কিন্তু সাধারণ পর্যটক রা সেই জায়গা পর্য্যন্ত পৌঁছতে পারেন না।

                            তুরতুক গ্রামে পৌঁছনোর জন্য যে জায়গা অবধি গাড়ি যায়, তা একটা খরস্রোতা ঝর্ণার একদম ধারে। পায়ে চলা রাস্তায় খানিকটা এগিয়ে গেলেই ঝর্ণাটির উপর একটা লোহার ব্রিজ । আশপাশে কোন গ্রাম আছে বলে ধারণাই করা যায় না। ব্রিজ পার হয়ে অপর পারে গিয়ে উঠলাম একদম ঘন এক জঙ্গলের মধ্যে। জঙ্গলের বুক চিরে পাহাড়ী রাস্তা খানিকটা গিয়েই বেঁকে গিয়েছে। কেমন যেন নিষিদ্ধ অঞ্চলে চলে আসার মত অনুভুতি হচ্ছিল। একেই বোধহয় বলে সীমান্তবর্তী অঞ্চল। ঝর্ণার জলের বয়ে চলা আর পাখির ডাক ছাড়া কোন আওয়াজ নেই । পাহাড়ি পথে খানিকটা এগিয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ যেন দিগন্ত খুলে গেল।  গ্রামে ঢোকার রাস্তাটা কেমন যেন জঙ্গল দিয়ে আড়াল করা। গ্রামটিকে যেন সযত্নে প্রকৃতির কোলে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। চারিদিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা সবুজ একটা গ্রাম। সামনে প্রশস্ত বার্লি ক্ষেত। দূরে দূরে কয়েকটি বাড়ি যেন ঝুলনের মত সাজানো।

            
                সীমান্তের গ্রাম তুরতুকের বার্লি ক্ষেত

 দু'ধারে ক্ষেত আর মাঝখান দিয়ে চলেছে মেঠো রাস্তা। এঁকে বেঁকে গ্রামবাসীদের বাড়ির পাশ দিয়ে। তুরতুক গ্রামের অধিবাসী রা বাল্টি ভাষায় কথা বলে। এখনো মহিলারা বাইরের লোক দেখলে লজ্জায় মুখ ঢাকেন এবং বাড়ির ভিতর ঢুকে যান। যে কয়েকজন মহিলা সামনাসামনি আসেন তাদের দেখেই মনে হয় তারা  অত্যন্ত প্রাচীন এবং অভিজাত সম্প্রদায়ের মানুষ। গায়ের রঙ, শরীরের গড়ন সব কিছুর মধ্যেই যেন সেই প্রাচীনত্ব, আভিজাত্য প্রকাশ পায়।  পাহাড়ের এই রুক্ষ আবহাওয়া, তীক্ষ্ণ সূর্য্যের আলো কোন কিছুতেই যেন তাদের সোনার মত বর্ণে এতটুকু খাদ মেশাতে পারেনি।

                                                                                                 তুরতুক গ্রামের অধিবাসী

Silk route এর অন্তর্গত হওয়ায় তুরতুক গ্রামে বিভিন্ন সময়ে মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন জায়গা থেকে ব্যবসায়ীরা এসেছেন।  কালের ধারায় তুরতুকে বসবাসকারী তিব্বতীয় বন ধর্মাবলম্বী বিভিন্ন জনজাতির মানুষের  ধর্ম, সংস্কৃতি এবং জীবনধারায় আমুল পরিবর্তন  ঘটে গিয়েছে। ইতিহাস বলে শিওক নদীর ধারে  সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক অংশে বসবাসকারী বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি বিশ্বাস রাখা একদল মানুষের মধ্যে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এসে পড়েন বিখ্যাত ইসলাম কবি মীর সঈদ আলী হামাদানি। এরপর থেকেই তুরতুক গ্রামের বাসিন্দারা ইসলাম ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন। কিন্তু আজও তুরতুক গ্রামের অধিবাসীরা বন ধর্মের বেশ কিছু আচার আচরণ মেনে চলেন । নমাজধারী ইসলাম ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও তুরতুক গ্রামের অধিবাসীরা সম্পূর্ণ নিরামিশাষী। 

                   সীমান্তবর্তী গ্রাম হওয়ায় বৈদেশিক বাণিজ্যে তুরতুক গ্রামের যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা আছে। এই গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরেই খোবানি বা apricot এর চাষ হয়। এই খোবানি ফল থেকে তার বীজ বের করে তাকে শুকিয়ে বিদেশে রপ্তানি করার সমস্ত কাজ টা তুরতুক গ্রামের মহিলারা করে থাকেন। এই খোবানির জন্যই তুরতুক গ্রামকে বার বার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছে পাকিস্তান এবং এই গ্রাম আক্রান্ত হয়েছে।

 
 তুরতুক গ্রামে খোবানি (apricot) এর চাষ

                  গ্রামে ঘুরতে ঘুরতে আলাপ হল মধ্যবয়সী হুসেন বেইগ এর সাথে। শিক্ষিত মানুষ, গ্রামের প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক। ওনার সাথে যখন ওনার বাড়ির পথে চলেছি, পথে দেখা মিলল একঝাঁক ম্যাগপাই পাখির। নিজেদের মধ্যে হইচই করে ঘুরে বেড়াচ্ছে গ্রামের বিভিন্ন বাড়ির কোণায়। 


                                                                             ম্যাগপাই                                                     

                            গ্রামের গল্প বলতে বলতে বেইগ সাহেব আমাদের নিয়ে গেলেন ওনার নির্মীয়মান বাড়ির পিছনে। সেখান থেকে শিওক নদীর চর দেখে মনে হচ্ছে যেন ছোটবড় বিভিন্ন মাপের মাদুর পাতা আছে প্রকৃতির কোলে। মাঝে মাঝে দু একটা লম্বা লম্বা গাছ। বাঁদিকে তাকালেই দেখা যায় রুক্ষ কারাকোরাম পর্বতের সীমানা। এই সীমানায় ভারত এবং চীন উভয় দেশেরই সেনাছাউনী আছে। সেই ছাউনী প্রায় ১০ কিমি দূরে। বেইগ সাহেব আমাদের দেখানোর জন্য বাইনোকুলার নিয়ে এলেন। বেশ কয়েকটা পাথরের উপর বাইনোকুলারটা ঠিক মত রাখতে রাখতে বেইগ সাহেব বলতে লাগলেন তার আক্ষপের কথা। উনি বললেন আমাদের পূর্বজরা নিজেসের অজান্তেই, ঘর থেকে এক পা না বেরিয়েই কখনো হয়েছেন হিন্দুস্তানী, কখনো বাল্টিস্তানী, কখনো আবার পাকিস্তানী। কিন্তু তাদের কথা কেউ শোনেনি। তাদের সমস্যার কথা কেউ ভাবেনি। সময়ের সাথে সাথে নিজেদের অনিচ্ছায় তারা বদলে ফেলতে বাধ্য হয়েছে তাদের সংস্কার, ধর্মবিশ্বাস, জীবনধারা এবং সর্বোপরি নাগরিকত্ব। তবে আজ তারা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে এবং ভারতের নাগরিক হিসাবে তারা অনেক সুরক্ষিত বোধ করে। ইতিমধ্যে বাইনোকুলার ঠিক জায়গায় লাগানো হয়েছে। বেইগ সাহেব একে একে আমাদের দেখাচ্ছেন পাহাড়ের একদম মাথায় মুখোমুখি দুটি সেনাছাউনী যার একটা একটু উঁচুতে। এই উঁচু ছাউনীর মাথায় উড়ছে ভারতীয় তেরঙ্গা। এক ঝলক দেখলেই কেমন গা শিউরে ওঠে। ঐ দুর্গম পর্বতশিখরে টহল দিয়ে চলেছে দু দেশের সেনা। রক্ষা করে চলেছে রাষ্ট্রীয় সীমান্ত। তুরতুক গ্রামের অধিবাসীরা ভারতীয় সেনাদের প্রতি তাদের কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য পালা করে এই রুক্ষ দুর্গম পর্বত শিখরে পায়ে হেঁটে সেনাদের খাবার পৌঁঁছে দিয়ে আসে। আমি বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করি যখন সব টা বরফে ঢেকে যায়! বেইগ সাহেব জবাব দেন - 'দেখা কিতনী উঁচাই পর লহরা রহে হ্যায় হামারা তিরঙ্গা!। কুছ ভি হো যায় উসে ঝুকনা নেহি'।

                        শ্রদ্ধায় মাথা নীচু হয়ে যায়। হয়তো বা সীমান্তের এত কাছে আছে বলেই দেশের প্রতি এত ভালোবাসা। বারবার দেশবদল হয়েছে, বদলেছে জীবন কিন্তু বদলায়নি দেশমাতৃকার প্রতি তাদের ভালোবাসা, জাতীয় পতাকার প্রতি তাদের শ্রদ্ধা, ভারতীয় সেনাদের প্রতি তাদের কর্তব্যনিষ্ঠা। তাই বার বার পাল্টে যাওয়া এই পাল্টিস্তানিরাই আমাদের দেশের সম্পদ, সত্যিকারের হিন্দুস্তানী।

 





Thursday, 3 June 2021

মরুজাহাজ

                         সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী ভারতীয় সেনার অসংখ্য ছাউনী রয়েছে গোটা লাদাখ প্রদেশ জুড়ে। তার মধ্যে যে সেনা শিবিরের কথা শুনলে শরীরের সমস্ত রক্ত হিম হয়ে যায়, সেই সিয়াচেন লাদাখ প্রদেশের নুব্রা উপত্যকার আন্তর্জাতিক সীমারেখা।  নুব্রা উপত্যকায় সিওক আর নুব্রা এই দুই নদীর সঙ্গম। নুব্রা উপত্যকার অনেক জনপদের মধ্যে হুন্ডার অন্যতম আকর্ষণীয়। ধুসর পাহাড়ের কোলে এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে স্নিগ্ধ নুব্রা নদী। সূর্য্যের আলো ছায়ায় কোথাও কাজল কালো কোথাও বা সবুজ সে নদীর জল।  ঠিক যেন ছোটবেলায় খাতায় আঁকা নদীর মত। নদীর দুধারে সামান্য ঘাস। তারপরেই ধু ধু সাদা বালি। নুব্রা ভারতের শীতল মরুভুমি।
 

 
                          
                      তীব্র বেগে হাওয়া চলার জন্য এই উপত্যকার বালিতে ছোট ছোট বালিয়াড়ি তৈরী হয়। আবার হাওয়ার গতিতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।  প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য, সময়ের সাথে সেই সৌন্দর্য্যের রূপবদল, এ সব ছাড়াও এই জায়গার অন্যতম আকর্ষণ এই শুভ্র মরুভুমি তে ঊটের পিঠে চড়া। প্রচুর ভ্রমণ পিপাসু মানুষ শুধু ঊট চড়ার জন্যই আজকাল হুন্ডারে আসে। নুব্রা উপত্যকার ঊট, সাধারণ ঊটের থেকে আলাদা। এই ঊটের পোশাকি নাম Bactrian camel। সাধারণতঃ আমরা যে ঊট দেখতে অভ্যস্ত তার পিঠে একটা কুঁজ থাকে, কিন্তু এই ঊটগুলির পিঠে দুটি কুঁজ। উচ্চতায় ও এরা অনেক বেঁটে এবং ভীষণ শান্ত নিরীহ প্রকৃতির জীব। হুন্ডারের বালিতে পা দিয়েই পর্যটকের দল কথাবার্তা চালাতে থাকে এই ঊটের সহিসদের সাথে। যাতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঊটের পিঠে চড়ে বালির রাজ্যে খানিক ঘুরে আসা যায়। আমিও প্রথমটায় সেরকমই একটা কিছু ভেবেছিলাম। পায়ে পায়ে এগিয়ে যখন একটা ঊটের সামনে থামলাম, আমার একটুও ইচ্ছে করলনা ওর পিঠে চড়ে বেড়াতে যেতে। এত মায়ায় ভরা চোখ দুটো যেন কত কিছু বলতে চায়। আমি পিঠে চড়ার সিদ্ধান্ত বদলে একটা ঊটের কাছে গিয়ে চুপ করে বসলাম। গা টা যেন রেশমের মত পিচ্ছিল। গায়ে হাত দিতেই আমার দিকে নরম দৃষ্টিতে তাকালো। বুঝলাম এমন স্পর্শে ও খুব একটা অভ্যস্ত নয়। 

 
 

নুব্রা উপত্যকায় bactrian camel


                            আমার এমন অদ্ভুত আচরণ দেখে সহিস বেচারা পড়ল বিপদে। বেশ কিছু সময় আমি যদি ওর ঊটটাকে আঁটকে রাখি, তাহলে বেচারার ব্যবসার ক্ষতি হবে। আমি বেড়ানোর পরিকল্পনা ছেড়ে কিছু ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিয়ে সহিসের সাথে গল্প জুড়লাম। জানতে চাইলাম এদের কাহিনী। 

      নুব্রা উপত্যকায় ঊট বিহার
 
                     Bactrian camel ভারতে আসে ১৮৭০ সাল নাগাদ। মধ্য এশিয়া ও আধুনিক চীন দেশের ইয়ারকন্দ এবং আশ পাশের জায়গা থেকে বিভিন্ন পসরা- নুন, উল, ভেড়ার লোম, রেশম দ্রব্য, নীল ইত্যাদি চীন লাদাখ সীমান্তের silk route ধরে ভারতের বাজারে আসত।  এই প্রজাতির ঊট এক কুইন্টাল পর্যন্ত ওজন নিয়ে ছয় থেকে সাত ঘন্টা পাহাড়ী পথে চলতে সক্ষম। শারীরিক গঠনের এমনই বৈচিত্র যে এরা মাইনাস ৪০ ডিগ্রী তাপমাত্রায়ও কর্মক্ষম থাকে। দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান যান হিসাবে ব্যবহৃত হয় এই bactrian camel।  ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৫০ সালে এই silk route বন্ধ হয়ে যায়। এই সময় চীন থেকে আসা বেশ কিছু ব্যবসায়ী বেশ  কয়েকটি bactrian camel স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে ছেড়ে দিয়ে চলে যান। কাজে না লাগার জন্য সে দেশের মানুষের কাছে পরিত্যক্ত হলেও নুব্রা উপত্যকার প্রকৃতি প্রেমী মানুষ গুলো এদের পরিত্যাগ করে নি। অভাবের সংসারে পরিবারের  সদস্য হয়েই তারা রয়ে যায় নুব্রা উপত্যকার মানুষের ঘরে ঘরে। 
                    অত্যন্ত কঠিন জীবনযাত্রায় যেখানে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই এক সংগ্রাম, সেখানে স্বাভাবিক করণেই এই প্রজাতির প্রাণী গুলি কিছুটা অবহেলিত হয়ে পড়ে এবং ক্রমশঃ এদের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হতে থাকে। ২০১২ সালে  গোটা নুব্রা উপত্যকায় এদের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫০ এ। নিকটবর্তী এলাকায় মালপত্র বহনের কাজে এই ঊটকে গ্রামবাসীরা কাজে লাগাত। ২০১৫ সালে এদের সংখ্যা বেড়ে হয় ২১১। এই সময় থেকে লাদাখের পর্যটন শিল্পে এদের কাজে লাগানোর কথা ভাবতে থাকে স্থানীয় অধিবাসীরা। প্রচুর বিরোধিতা এবং অসহযোগিতার মধ্যে দিয়ে ২০০৯ সালে তারা Central Asia Camel Safari নামে একটি বৈধ সমবায় সংস্থা তৈরী করে। মহম্মদ সাফি নামের এক অধিবাসী ঊট গুলিকে মানুষ বহন করার প্রশিক্ষন দেন। আমার সাথে গল্পের মধ্যে সহিস ভাই বলেন বছর দশেক আগে এই ঊটগুলি মানুষ বিনামূল্যে একে অপরকে দিয়ে দিতেন। আজ এক একটি ঊটের দাম ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। একজন সহিস একটি মরশুমে প্রায় ৪ লাখ টাকা পর্য্যন্ত রোজগার করেন একটি ঊট থেকে।
                    প্রকৃতির সাথে মানুষের আবহমান কালের সম্পর্ক। সেই সম্পর্ক যেমন নির্ভরশীলতার তেমনই ধ্বংসাত্মক। যথেচ্ছ ধ্বংস করা, নির্দোষ প্রাণীদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ায়, মানুষ নিজেকে সিদ্ধহস্ত বলে প্রমাণ করেছে বহুবার। কিন্তু bactrian camel তার ব্যতিক্রম। স্থানীয়  মানুষের প্রবল অন্তরঙ্গতা আর একটি প্রজাতিকে  বাঁচিয়ে রাখার প্রবল ইচ্ছাতেই প্রকৃতির কোল থেকে বিলুপ্ত হতে পারেনি এই bactrian camel। অর্থকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীদের ফেলে যাওয়া সেই ঊট গুলোর চোখেও নিশ্চয় এমনই মায়াভরা দৃষ্টি ছিল, যা মানুষের মনে এদের বাঁচিয়ে রাখার তাগিদ তৈরী করে। 
                    এতক্ষণ বক বক করে অনেকটাই ক্ষতি হল সহিস ভাইয়ের। কিন্তু  শত চেষ্টার পরেও  এই ক্ষতিপূরণ করার সুযোগ সহিস ভাই আমাকে দিল না। উল্টে আমাকে বলল - হামারে বাত আপ ধ্যানসে শুনা ইয়েহি তো কামাই হ্যায়।   সত্যি তো কঠিন জীবন সংগ্রাম চালিয়ে বেঁচে থাকা এই প্রত্যন্ত উপত্যকার মানুষের কথা শোনার জন্য আমাদের সময় কোথায়!

Wednesday, 26 May 2021

পদ্ম-পিনাক পাণি

                      আজ বুদ্ধপূর্ণিমা। ভগবান বুদ্ধের পুণ্য আবির্ভাব তিথিতে আজ আকাশের মুখ ভার। দেখা নেই পূর্ণিমার চাঁদের। এমনই এক চাঁদহীন পূর্ণিমা ছিল সেদিন। কোজাগরী পূর্ণিমা। রাতটা কেটেছিল হিমাচল প্রদেশের লাহুল স্পিতি জেলার এক বিখ্যাত জনপদ, উদয়পুরে (উদেপুর নামেও পরিচিত)।  প্রকৃতি যেমন হিমালয়ের অনন্য সম্পদ, ঠিক তেমনই হিমালয়ের পথে পথে এমন কিছু সম্পদের দেখা মেল্‌ যা ভারতের সভ্যতা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় সহনশীলতার সুদৃঢ় বুনিয়াদের নিদর্শন।  প্রত্যন্ত সীমান্ত পাঙ্গি উপত্যকা থেকে ফেরার পথে  উদয়পুর পৌঁছতে প্রায় অন্ধকার হয়ে গেল। হিমালয়ের কোলে কোজাগরী পূর্ণিমার রাত কাটানো যে কোন হিমালয়প্রেমীর কাছে অত্যন্ত লোভনীয়। আমরাও সেই স্বপ্নেই বিভোর ছিলাম। কিন্তু বিধি বাম। উদয়পুর পৌঁছনোর কিছু আগে পথেই নামল তুমুল বৃষ্টি। উদয়পুর থেকে  কেলং যাওয়ার পথে ৯ কিলোমিটার যাওয়ার পর রাস্তা বেঁকে গেল পাহাড়ের একদম শেষ প্রান্তে। বৃষ্টি ভেজা এই রাস্তাটুকু আসতে অনেক সময় লেগে গেল। সেই সঙ্গে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা আর রক্ত জমিয়ে দেওয়া হাওয়া। 

                         গাড়ি থেকে নেমে অল্প কিছুটা রাস্তা হেঁটে  পাহাড়টার একদম শেষ প্রান্তে পৌঁঁছে  গেলাম। খাড়া পাহাড়ের নীচে বয়ে চলেছে চন্দ্রভাগা। বৃষ্টির জন্য সব ধোঁয়া মনে হচ্ছে। একদম শেষ মাথায় দেখতে পাওয়া যাচ্ছে দুধ সাদা মন্দিরের চুড়া - ত্রিলোকীনাথ। এই মন্দির ভারতবর্ষের ধর্মীয় সহনশীলতার ইতিহাস বহন করে। আসল মন্দিরটির অস্তিত্ব বিলুপ্ত। কেউ বলেন এ মন্দির পান্ডবদের  বানানো আবার কেউ বা বলেন কুলুর রাজপরিবার এই মন্দির নির্মাণ করেছেন। তা সে যেই নির্মাণ করুক না কেন এ মন্দিরের আকর্ষণ এর ধর্মীয় গ্রহণ যোগ্যতায়। বৌদ্ধ ধর্মের সাথে হিন্দু ধর্মের চিন্তা ভাবনায় মৌলিক বিভেদ থাকলেও তা যে কখনো সামাজিক গঠনে ভাঙ্গন ধরায়নি, এই মন্দির তার অন্যতম উদাহরণ। কথিত আছে এই মন্দিরের জায়গায় একসময় বৌদ্ধ বিহার ছিল। পরবর্তী সময়ে হিন্দু ধর্মের মানুষ এখানে শিব পূজা শুরু করেন । অন্য একটি মত অনুসারে ত্রিলোকীনাথ আদতে শিব মন্দির যেখানে বৌদ্ধ গুরু পদ্মসম্ভব অষ্টম শতাব্দী তে ভগবান বুদ্ধের আরাধনা শুরু করেন। ইতিহাস যাই বলুক না কেন এখানে হিন্দু ও বৌদ্ধ উভয় ধর্মের মানুষ আসেন। বিগ্রহকে যে জ্ঞানে পূজা করতে তিনি ইচ্ছুক, সেই জ্ঞানেই পূজা করার স্বাধীনতা সমস্ত ভক্তের আছে। 

                        মন্দিরের প্রবেশ পথ বেশ সংকীর্ণ। চাতালে দাঁড়ালে মনে হয় কোন একটি বাড়ির উঠোনে গৃহদেবতার মন্দির। এটি ভারতবর্ষের একমাত্র মন্দির যে মন্দিরের বিগ্রহ বৌদ্ধ লামা এবং হিন্দু পুরোহিত একসাথে পূজো করেন। মন্দিরের চাতালে শিবের বাহন নন্দী র জন্য একটি ছোট্ট একটি চালা করা আছে। পাশে একটি ঘরে রাখা আছে বৌদ্ধ দের Prayer wheel। 

                                                                       ত্রিলোকীনাথ মন্দির

                    মন্দিরের বিগ্রহ বড় বিচিত্র। বিগ্রহটির ছয় হাত,  যা ভগবান বুদ্ধের অবলোকিতেশ্বর রূপ। বিগ্রহের মাথায় শিবের জটা। হাতে জপমালা। শিবের গলায় উপবীত, কোমরে পেঁচানো সাপ। বুদ্ধের  গলায়, কানে, বাহুতে রাজকীয় অলঙ্কার। ধ্যানমগ্ন মহাযোগী মুদ্রায় শিব আর পদ্মপাণি অবলোকিতেশ্বরের সহাবস্থান। শিবের জটার চুড়ায় রয়েছেন অমিতাভ বুদ্ধ - যিনি সীমাহীন আলোর প্রতীক। মন্দির প্রাঙ্গনে ভক্তের দল নিজেদের আরাধ্য দেবতার প্রতি প্রণাম জানান। কেউ বলেন 'ওম মণি পদ্মে ওম', কেউ বলেন 'ওম নমঃ শিবায়ঃ'।  কিন্তু কারো প্রণাম অন্যের প্রণাম কে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে না। এমনই এ মন্দিরের শৃঙ্খলা। বৌদ্ধ লামাই হোন বা হিন্দু পুরোহিত, ভক্তের বিশ্বাসে কোনওরকম প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করেন না।

                 


                                                                     ত্রিলোকীনাথের বিগ্রহ

                             যে রূপেই তিনি বিরাজমান হন না কেন আসলে তিনি ত্রিলোকী নাথ অর্থাৎ ত্রি-লোক বা ত্রিভূবনের নাথ, জগতের রক্ষাকর্তা।   সৃষ্টির প্রতি তাঁর নিরন্তর কৃপাদৃষ্টি। দুই ধর্মের বিশ্বাসের এক অভাবনীয় সংযোগের দেখা মেলে এই ত্রিলোকীনাথ মন্দিরে। এই মন্দিরের পবিত্রতা কৈলাস-মানসসরোবরের সমতুল্য বলে ভক্তরা মনে করেন।  দুটি ভিন্ন ধর্মের আরাধ্য দেবতার এই মেলবন্ধন,  যুগ যুগ ধরে চলে আসা দুই ধর্মের এই সহনশীলতা  বোধহয় শুধুমাত্র ভারতবর্ষেই দেখা যায়। 
                            অবিরাম বৃষ্টিতে ভিজে, ঠান্ডায় প্রায় জমে যাওয়ার পর ত্রিলোকীনাথের এই মোহময় বিগ্রহ দর্শন জীবনের এক পরম প্রাপ্তি। সমগ্র জগতের শান্তিযজ্ঞে নিমগ্ন এই পদ্ম-পিনাক পাণির উদ্দেশ্যে করজোড়ে প্রণাম জানালাম। প্রার্থনা জানালাম - 
বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি
শুষ্ক হৃদয় লয়ে আছে দাঁড়ায়ে
ঊর্ধ মুখে নরনারী

Sunday, 23 May 2021

ভারতের নীলকন্ঠ

              ভারতীয় সনাতন সংস্কৃতিতে নীল রঙ কে নানা ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নীল কখনো পরাক্রমের প্রতীক, কখনো বা সাহসিকতার,  কখনো পৌরুষের। হিন্দু দেবদেবীরা  যারা  উক্ত গুণের অধিকারী, তাদের গায়ের রঙ নীল। তা সে শিব ই হোন বা বিষ্ণু। নীল রঙের ঔজ্জল্যই তার আকর্ষণ। ভারতীয় সংস্কৃতিতে নীল রঙের ব্যবহারেও প্রচুর বৈচিত্র আছে। যেমন রাজস্থানের বিশনয় সম্প্রদায়ের মানুষ নীল রঙের বস্ত্র গায়ে দেন না। এই সম্প্রদায়ের মানুষ প্রকৃতিকে ঈশ্বর রূপে আরাধনা করে। নীল রঙ যেহেতু বিশেষ এক ধরণের গাছ থেকে একসময় তৈরী হত, তাই এই রঙ তৈরী করতে গিয়ে এই নীল গাছ গুলিকে ধ্বংস করা হত। প্রকৃতির এই অপূরণীয় ক্ষতি যাতে না হয়, তাই এই সম্প্রদায়ের মানুষ নীল বস্ত্র বর্জন করেন। বড় বিচিত্র নীলের বিষয়। 

                 নীল কখনো আবার সৌভাগ্যের প্রতীক। বিজয়া দশমীর দিন কোনো ভাবে কেউ যদি নীলকন্ঠ পাখির দেখা পান তাহলে তা পরম সৌভাগ্যের প্রতীক বলে মনে করা হয়। রামায়ণের বর্ণনা অনুযায়ী রাম যেদিন রাবণ বধের উদ্দেশ্যে রওনা হন, সেদিন তিনি নীলকন্ঠ পাখির দেখা পান, আর সেদিন ছিল বিজয়া দশমী। শিবপুরাণে আবার নীলকন্ঠ পাখিকে শিবালয়ের দূত হিসাবে বর্ণনা করা হয়। বিজয়া দশমীর শেষে মা যখন তাঁর সন্তানদের নিয়ে কৈলাসের  উদ্দেশ্যে রওনা হন, সেই খবর কৈলাসপতির কাছে পৌঁছে দেয় এই নীলকন্ঠ পাখি।

                                                               নীলকন্ঠ পাখি (Indian Roller)

                নীল যে শুধুই শুভ বা শুদ্ধতার প্রতীক তা কিন্তু নয়। নীল রঙ বর্জন করার অন্যতম কারণ হিসাবে  মনে করা হয়, নীল হল বিষের রঙ। সমুদ্র মন্থনের সময় এই বিষ পান করে ছিলেন মহাদেব এবং এই বিষের রঙেই তিনি নীলকন্ঠ। যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন নীল রঙের বোধহয় নিজস্ব সহনশীলতা আছে, যা তাকে দেয় অনন্ত বিস্তার, বিপুল গভীরতা। 

                  হিমালয়ের আনাচে কানাচে এমন নীলের দেখা মেলে বহু জায়গায়। এমনই এক নীলের সন্ধানে গিয়েছিলাম ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্য লাদাখ এ। লাদাখ কে বর্ণনা করতে গেলে খুব সহজে পরস্পর বিপরীত দুটি শব্দ বলা যায় - রুক্ষ আর মনোরম। সবুজের অনুপস্থিতিতে মাইলের পর মাইল রুক্ষ পাহাড় কিভাবে প্রাকৃতিক শিল্পকলার সম্ভার সাজিয়ে বসে আছে, তা দেখতেই লাদাখ এ আসা। লাদাখ এর প্রধান শহর লে থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়া যায়। তবে লাদাখ রাজ্যের সিংহ ভাগ যেহেতু সেনাদের দখলে, তাই সাধারণ মানুষের যাওয়ার অনুমতি মেলে খুব অল্প কয়েকটি জায়গায়। লেহ থেকে বেরিয়ে পৃথিবীর সর্বোচ্চ যান চলাচলের উপযুক্ত গিরিখাত, খার-দুং-লা পার হয়ে আমাদের গাড়ি ছুটে চলল সেই নীল গন্তব্যে। পথে যেতে যেতে যে নৈসর্গিক দৃশ্য চাক্ষুষ করলাম তা বর্ণনা করার মত ভাষা আমার ভান্ডারে নেই। রুক্ষ পাহাড়, তার গায়ে তীব্র হাওয়ার ধাক্কায় তৈরী হওয়া বিভিন্ন রকম আকার। কোনটা দুর্গের মত, কোনটা বা সেনাদলের সারি, কোনটা যেন রথের মত, কোনটা আবার আস্ত রাজপ্রাসাদ। কোনও কোনও পাহাড়ের গোড়া থেকে মাথা অবধি রক্তবর্ণ গ্রানাইটের দেওয়াল, কোনওটায় সবুজ, কোনওটায় আবার দুধ সাদা। আমাদের গন্তব্যের কাছাকাছি এসে পড়েছি বলে যখন জানতে পারলাম, তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে বটে কিন্তু এই উচ্চতায় এ সময়ে যথেষ্ট দিনের আলো। পাহাড়ের একটা বাঁক ঘুরতেই আচমকা দেখা দিল ঘন নীল জলরাশি। যেন প্রচুর পরিমাণ নীল রঙ জলে গুলে রেখে দেওয়া হয়েছে। হারিয়ে গেল এক নিমেষে। এই হারিয়ে খোঁজাই হিমালয়ের সবথেকে বড় আকর্ষণ। কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা পৌঁঁছে গেলাম আমাদের নীল গন্তব্যে, ৪৩৫০ মিটার উচ্চতায়, হিমালয়ের কোলে আন্তর্জাতিক সীমাকে গিলে ফেলা বিপুল এক জলের ভান্ডার।  এ ভান্ডারের মাত্র ৪০ শতাংশ ভারতবর্ষের দখলে, বাকি ৬০ শতাংশ চীন তথা চীন অধিকৃত তিব্বতের। 

                    এ জলরাশির রঙ বিভিন্ন সময়ে বদল হয়। ঘন নীল থেকে আকাশী, আকাশী থেকে সবুজ, সবুজ থেকে লালচে গোলাপী। প্রকৃতির নিত্য হোলিখেলা। প্রবল হাওয়ায় জলে ওঠে ছোট্ট ছোট্ট ঢেউ যার নীচে কাঁচের মত পাথরগুলো খুব আস্তে আস্তে গড়িয়ে যেতে থাকে শামুকের মত। এ হ্রদ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণার পর কিছু আশ্চর্য্য তথ্য পাওয়া যায়। এই হ্রদের জল সম্পূর্ণ আবদ্ধ, অন্য কোন জলের স্রোতের সাথে এর কোন সম্পর্ক না থাকায় এই জল মাত্রাতিরিক্ত নোনা। এই হ্রদের জলে প্রচুর খনিজ পদার্থ থাকায় জলের রঙ ঘন নীল। নোনা  হলেও এই হ্রদের জল শীতকালে সম্পুর্ণ বরফ হয়ে যায়। মাত্র কয়েকপ্রকার কবচী জীব ছাড়া এই হ্রদের জলে কোন জীব বাঁচতে পারে না। অর্থাৎ এই হ্রদের নান্দনিক উৎকর্ষ যাই হোক না কেন ব্যবহারিক উৎকর্ষ বিশেষ উল্লেখযোগ্য নয়। যতক্ষণ আলোর শেষ রেখা টুকু পড়তে লাগল চেটেপুটে উপভোগ করলাম এর রংবাহার। 

                       আমরা ঘুরে আসার কিছুদিন পর থেকেই শুরু হয়ে গেল এই সীমান্ত প্রদেশে ভারত-চীন দুই দেশের অধিকার রক্ষার লড়াই। খবরের কাগজে পড়তে লাগলাম সে চেনা জায়গার নাম -  চুশুল। এই বিপুল জলরাশি কে মাঝখানে রেখে দীর্ঘ কয়েকমাস চলতে লাগল প্রাণঘাতী সংঘর্ষ। এখনো 'হয় নাই শেষ'। এ যেন আর এক দফা সমুদ্র মন্থন। প্রকৃতির এমন অমূল্য সম্পদ তাকে কি খড়ির গন্ডি তে বাঁধা যায়! এই বিপুল জলরাশির মধ্যে দাগ কেটে কি আমার তোমার ভাগ করা সম্ভব! কিছুতেই নয়। আর এই অসম্ভব কে সম্ভব করার জন্য দু'দেশের মানুষের দুর্বার প্রচেষ্টা বছরের পর বছর ধরে বাতাসে ছড়ায় বিষ। সেই বিষ নিরন্তর পান করে চলে ব্রহ্মান্ডের এই ক্ষুদ্র অংশ। এই বোধহয় সত্যিকারের হলাহল পান।  নিজের সৃষ্টির একটুকরো অংশের মধ্যে এভাবেই বোধহয় নিজেকে প্রকাশ করেন দেবাদিদেব। প্রকৃতির এই নীল সম্পদ - প্যাঙ্গং সো হয়ে ওঠে ভারতের নীলকন্ঠ।

                

প্যাংগং সো  - এ রঙের বাহার

Friday, 7 May 2021

হাসেন অন্তর্যামী

                   প্রকৃতির নিয়মে বছরের অনেকটা সময় গৃহবন্দী হয়ে অবসর জীবন কাটাতে বাধ্য হন, এমন মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে তো বটেই, ভারতবর্ষেও কিছু কম নয়। এমন কিছু মানুষের সান্নিধ্যে কয়েকদিন কাটাতে গিয়েছিলাম হিমাচল প্রদেশের এক অচেনা প্রান্তে। হিমালয়ের পিরপাঞ্জাল আর জাঁস্কর  শাখার মধ্যবর্তী অঞ্চল পাঙ্গি উপত্যকা নামেই পরিচিত। পাঙ্গি উপত্যকায় প্রধানতঃ হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষের বাস। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ভোট দের আধিক্য থাকায় পাঙ্গি উপত্যকা প্রধানতঃ চারটি ভাটোরী তে বিভক্ত। সেই চারটি ভাটোরির অন্যতম হল সুরাল ভাটোরী। বাঁদিকে পিরপাঞ্জাল আর ডানদিকে জাঁস্কারের মাঝে শান্ত, সবুজ নির্জন জনপদ সুরাল। পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলেছে সুরাল নালা। বছরে চার থেকে পাঁচ মাস জলের স্রোত বয়ে যায় এই উপত্যকায়। বাকি সময় সবকিছু বরফের নীচে, সমস্ত মানুষ গৃহবন্দী।  পাথুরে উপত্যকায় বয়ে চলা সুরাল নালার দুই ধারে উঁচু পাহাড়ের ঢাল। সুরালের উচ্চতা ১০০০০ ফুটের কিছু বেশি। ছোট বড় মিলিয়ে গোটা তিনেক প্রাইমারী এবং ইন্টারস্কুল আছে, যা সুরালের জনসংখ্যার তুলনায় চলনসই। এমনই একটি স্কুলের মাস্টারমশাই পবন সিং নেগি র সাথে আলাপ হল সুরাল গ্রামে। জানতে চাইলাম সুরালের ইতিকথা।

                       সুরাল নালা                  

পাঙ্গি উপত্যকা হিমাচল প্রদেশের প্রান্তিক অংশ এবং জম্মু কাশ্মীর সীমানার সাথে যুক্ত। হিমাচলের বেশ কয়েকটি গিরিবর্ত্ম এই পাঙ্গি উপত্যকা কে বিচ্ছিন্ন করে রাখে বছরের অর্ধেকের বেশি সময়। কিলার  থেকে সাচ পাস (১৪৪৮২ ফুট) পার হয়ে পোঁছতে হয় এই স্বর্গীয় ভুখন্ডে। সাচ পাস থেকে সোজা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গাড়ি যখন নামতে থাকে দুর্বার গতিতে, মনে হয় এ যেন এক অন্যরকম নাগরদোলা। সুরাল, ভারত ভুখন্ডের বহু প্রাচীন জনপদ। কথিত আছে হিমাচলের শাসকবর্গ অপরাধের শাস্তি হিসাবে প্রজাদের এই ভুখন্ডে পাঠিয়ে দিতেন যাতে তারা সহজে আর মূল ভুখন্ডে ফিরতে না পারে। 

                   সে যেভাবেই গড়ে উঠুক, দুটি ভিন্ন ধর্মের মানুষ আবহমান কাল ধরে জীবনধারণ করে চলেছে প্রকৃতির এই ইন্দ্রলোকে। কথা বলতে বলতে পবন নেগি আমাদের নিয়ে এসেছেন একটা উঁচু জায়গায় যেখান থেকে সুরাল নালার সর্পিল গতি দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। পাহাড়ের সমস্ত ঢালে ঘন জঙ্গল। লা্‌ল, হলুদ আর সবুজ রঙে যেন আগুন জ্বলছে। জানতে পারলাম এই বিভিন্ন রঙ আসলে বিভিন্ন বয়সের ভুজ গাছের পাতার। একেবারে কচি পাতা আগুনের মত লাল, মধ্যবয়সী পাতা ঘন সবুজ আর প্রাপ্তবয়স্ক পাতা কাঁচা সোনার মত হলুদ।


                                                                   ভুজ গাছের জঙ্গল

                                ভারতের সনাতন সংস্কৃতিতে ভুজ গাছের ছালের ব্যবহার বহুজনবিদিত। কিন্তু হিমালয়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এই ঐতিহাসিক বৃক্ষের বিপুল সমাহার সম্পর্কে আমার অন্ততঃ কোন ধারণা ছিল না। নেগি সাহেব অতি যত্ন সহকারে আমেদের ঘুরিয়ে দেখাচ্ছেন তাঁর জন্মভূমি। প্রকৃতির সাথে লড়াই করতে করতে লৌহকঠিন ব্যক্তিত্বের অধিকারী প্রত্যেক সুরালবাসী, ঠিক তেমনই তাদের আবেগ। কৌতুহলী আমার মন। প্রশ্ন করে বসি এই সুরাল নালা কোথা থেকে আসছে? নেগি সাহেব বলেন এই নালার উৎস হিমাচল আর জম্মু কাশ্মীরের সীমান্তে অবস্থিত শিবশঙ্কর শৃঙ্গ। এ কেমন শৃঙ্গ? নেগি সাহেব বলেন - "যাও খুদ দেখকে আও ক্যায়সে শঙ্কর ভগবান পাহাড় কী চোটি সে হামে রকসা কর রহে হ্যায়"। ভারী অদ্ভুত তো! নেগি সাহেব আমাদের রাস্তা বাতলে দিলেন, চলতে শুরু করলাম। নেগি সাহেব জয়ধ্বনী দিলেন - জয় শিব শঙ্কর। 

                           সুরাল নালার পাশ দিয়ে পাহাড়ি রাস্তা। অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য। ক্রমশঃ চলতে চলতে অনেক পিছনে ফেলে এসেছি সুরাল গ্রাম। দুধারে অসংখ্য বরফের পাহাড়, পাহাড়ের গা বেয়ে সারি সারি ছোট বড় ঝরনা নেমে এসে মিশে যাচ্ছে সুরাল নালায়। বেশ কয়েক কিলোমিটার হেঁটে ফেলেছি। হঠাৎ দু তিনটে পাহাড়ের মাঝখান থেকে উঁকি মারল আড়াআড়ি ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা আপাদমস্তক বরফে ঢাকা এক শৃঙ্গ। বড় অদ্ভুত তার গড়ন। সামনের দিকটা যেন হাতির শুঁড়ের মত। যত সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি শৃঙ্গের গড়ন বদলে যাচ্ছে। খানিক দুর যাওয়ার পর পুরো প্রশস্ত শৃঙ্গ  দেখতে পেলাম।  যেন প্রকান্ড এক শঙ্খ। যে শঙ্খ বাজানোর ক্ষমতা মহাযোগী মহাদেব ছাড়া আর কারো নেই। কি অদ্ভুত এই শৃঙ্গের রূপ। পরতে পরতে যেন অনুভব করা যায় ত্রিলোকেশ্বরের উপস্থিতি। মনে পড়ে গেল কোন একজনের লেখায় পড়েছিলাম শঙ্খের মত দেখতে বলে এই শৃঙ্গকে পর্বতারোহীরা শিবশঙ্খ শৃঙ্গ নামে চেনেন। কিন্তু সুরাল বাসীর কাছে এই পাহাড়ই শিব শঙ্করের বাসভুমি। বিস্ময়ের আরও কিছু বাকি ছিল।  খানিকটা  এগিয়ে গিয়ে পাহাড়ের চুড়ার দিকে তাকাতেই কানে বেজে উঠল নেগি সাহেবের কথাগুলো। নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছি না। বরফে মোড়া শঙ্খ আকৃতির এই পাহাড়ের মাথায় স্বয়ং শিবশঙ্কর বিরাজমান। তাঁর কৃপাদৃষ্টি সরাসরি সুরাল গ্রামের দিকে। প্রকৃতির এই বিস্ময় নিজে চোখে না দেখলে হয়তো বিশ্বাস করতাম না। ইনিই নেগি সাহেবের শিবশঙ্কর,  যিনি প্রকৃতির উচ্চাসনে বসে অবিরাম রক্ষা করে চলেছেন তাঁর সৃষ্টির প্রতিটি অনুকণা। সকলের নাগালের বাইরে সমস্ত পার্থিব মায়াজাল এড়িয়ে অবিচল, ধ্যানমগ্ন জগদীশ্বর। সৃষ্টির সমস্ত কলহ, বিবাদ, অভিমান, অহংকার সমস্ত কিছুকে যেন প্রাণভরে উপভোগ করছেন সচ্চিদানন্দ।


                                                    

                                                        বরফ ঢাকা শৃঙ্গের চুড়ায় শিবশঙ্কর

                       অদ্ভুতদর্শন এই শৃঙ্গের চুড়ায় আসীন  রজতগিরিনিভম কে দেখে মনে হল, এই পরম ঐশ্বর্য্য অবহেলা করি আমরা।  পার্থিব চাওয়া পাওয়া নিয়ে গড়ে তুলি আত্মপ্রত্যয়ের অসাড় গর্ভগৃহ। সে গর্ভগৃহ ঊজ্জ্বল করে তুলি অহংকারের রোশনাই দিয়ে, সাজিয়ে তুলতে জ্বালাই উচ্চাশার হাজারবাতি।  প্রাপ্তির সেই অন্তঃসারশূণ্য আস্ফালন দেখে অবশ্যই তাঁর করুণা হয়,  হাসেন অন্তর্যামী।

Friday, 30 April 2021

শিব ঠাকুরের বিয়ে

                           সংশয়, হতাশা আতঙ্ক সমস্ত কিছুর সাথে আরো একটা নতুন বছর কালের নিয়মে চলে এল। সারা পৃথিবীর সমস্ত জাতি ধর্ম নির্বিশেষে নববর্ষের একটা অন্যরকম গুরুত্ব আছে। প্রত্যেক ধর্মের নিজস্ব ক্যালেন্ডার, বর্ষবরণের আলাদা আলাদা রীতি, আচার অনুষ্ঠান। কিন্তু পৃথিবী জুড়ে সব আনন্দ অনুষ্ঠান আজ যেন কেমন থমকে গেছে। প্রকৃতি তার নিজের ছন্দে চলছে ঠিকই কিন্তু কোথাও যেন সেই ছন্দও ভারসাম্যহীন। প্রকৃতির কঠিন অভিঘাত থেকে বুক দিয়ে আমাদের আগলে রেখেছে যে হিমালয়, তিনিও যেন আজ বার্তা পাঠাচ্ছেন - আমাকে একটু একা থাকতে দাও। 

                       সমস্ত কিছু তে আগল দিয়ে রাখলেও আগল দেওয়া যায়না মায়ের মনে। নববর্ষের দুদিন আগেই নীল ষষ্ঠীর ব্রত। সন্তানের মঙ্গলকামনায় মহাদেবের প্রতি অর্ঘ্য নিবেদন করেন মা। বাইরে বেরোতে না পারায়  মা এবার বাধ্য হয়ে ঘরেই নীলের বাতি জ্বালালেন। আসলে এই দিনটি হর-পার্বতীর বিবাহের দিন। স্বর্গীয় এই বিবাহকে ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টির প্রধান মঞ্চ হিসাবে দেখা হয়। তাই এই দিনে শিবের আরাধনা, ব্রহ্মান্ডের গতি বয়ে নিয়ে যাওয়া সন্তানদের সম্যক মঙ্গল সাধন করে। সন্ধ্যা নামতেই মা শিবের ঘরে বাতি জ্বালালেন। বাতির শিখার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলাম। মনটা চলে গেল কয়েকবছর আগে দেখে আসা শিবঠাকুরের বিয়ের সেই জায়গাটা তে । যে ক্ষেত্রের নাম ত্রিযুগীনারায়ণ।

                             সেবার উখীমঠে দুদিনের বিশ্রাম। আশ্রমে বসে থাকতে মন চায় না। বেরিয়ে পড়লাম আশপাশের কিছু জায়গা দেখতে। উখীমঠ থেকে কালীমঠ হয়ে পৌঁছলাম ত্রিযুগীনারায়ণ। শুনেছিলাম এই ক্ষেত্রে নাকি হর-পার্বতীর বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু তার সাথে নারায়ণের সম্পর্কটা যে ঠিক কি তা জানা ছিল না। ত্রিযুগীনারায়ণের এই মন্দিরের নামেই পার্শ্ববর্তী গ্রামের নাম ত্রিযুগীনারায়ণ। পাহাড়ি ছোট্ট গ্রাম। মন্দিরের চারপাশে ধাপে ধাপে রয়েছে গ্রামবাসীদের চাষের জমি। তার মাঝখানে  অবিকল কেদারনাথের মন্দিরের আদলে তৈরী ত্রিযুগীনারায়ণ মন্দির। 

 


  ত্রিযুগীনারায়ণ মন্দির

                              মন্দিরের গর্ভগৃহে ঢোকার আগেই দোচালার নীচে রয়েছে প্রকান্ড এক যজ্ঞকুন্ড। এই যজ্ঞকুন্ডই হর-পার্বতীর বিয়ের যজ্ঞস্থল বলে চিহ্নিত। এই যজ্ঞকুন্ডের জ্যোতি অখন্ড। যে ভক্ত এই মন্দিরে প্রবেশ করেন, তিনি এই কুন্ডে কাঠ জুগিয়ে আসেন, যার জন্য এই আগুন কখনও নিভে যায় না। মন্দিরে প্রবেশের আগেই দর্শণ হয় ব্রহ্মশিলার। এই ব্রহ্মশিলাই নাকি হর-পার্বতীর বিবাহ স্থল। মন্দিরের গর্ভগৃহে রয়েছে রুপোর বিষ্ণুমূর্তি। মন্দিরের পূজারীজি মন্দিরের আখ্যান বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন এই অখন্ড জ্যোতি হর-পার্বতীর অখন্ড দাম্পত্যের প্রতীক। আর বিগত তিন যুগ ধরে এই অখন্ড দাম্পত্যের সাক্ষী হিসাবে রয়েছেন নারায়ণ। ত্রি যুগ ব্যাপী অধিষ্ঠানের জন্য তিনি ত্রিযুগীনারায়ণ হিসাবে পূজিত হন। সৃষ্টি আর স্থিতির আবহমান মেলবন্ধনের সাক্ষী এই মন্দির। সন্তানের মঙ্গল কামনায় মায়ের জ্বালানো নীলের বাতির মত অবিনশ্বর। 

                           মনের মধ্যে ঝড় তুলেছে হিমালয়ের একা থাকার আর্তি। পৃথিবীতে আজ অস্তিত্বের সংকট। হে ত্রিযুগীনারায়ণ, হিমালয়ে আজ ভক্তের প্রবেশ  অবারিত নয়। তবু এই অখন্ড জ্যোতি যেন ইন্ধনের অভাবে নিভে না যায়। হাজার হাজার মায়ের জ্বালানো নীলের বাতি যেন নিভে না যায় অতিমারীর দমকা হাওয়ায়।  সৃষ্টির প্রতীক হয়ে জ্বলে থাকা এই অখন্ড আগুন ছড়িয়ে পড়ুক শতকোটি ভক্তের বুকে। প্রজ্জ্বলিত হোক জীবনজ্যোতি। হে রজতগিরি তুমি না হয় কিছুদিন সাধনায় মগ্ন থাকো - একা।  কিন্তু দেখো তোমার কোলে খুঁজে পাওয়া দুদন্ড শান্তির আশ্রয় যেন চিরতরে হারিয়ে না ফেলি।

                             

Sunday, 11 April 2021

ধুণ কি গুণ

                অতিমারীর দৌলতে আমাদের অকাল অবসর জীবনে এখনো ছেদ পড়ে নি। গ্রীস্মের দুপুরের ক্লান্তি কাজের মধ্যে তবু কাটানো যায় কিন্তু এই গৃহবন্দী জীবনে দুপুরটা কাটানো যেন এক শাস্তি। বই পড়লে চোখ বন্ধ হয়ে আসে, টিভি খুললে শুধু ঝগড়া আর অশ্রাব্য গালিগালাজ।  বাধ্য হয়ে মাঝে মাঝে একটু গান শুনি। হঠাৎ খোঁঁজ করতে করতে এক বাঙালী সুফি গায়কের সন্ধান পেলাম। তাক লাগিয়ে দেওয়ার মত সুফি গান গায় ছেলেটি। যেমন তার গায়কী তেমনি তার কন্ঠস্বর। প্রচন্ড energy ছেলেটির পরিবেশনায়। বড় ভালো লাগছে। একটার পর একটা শুনছি। অনেক শ্রোতা তাদের মতামত জানিয়েছেন গান শুনে সেগুলোও নেড়েচেড়ে দেখি। একটি কবীরের দোঁহা শুনছিলাম -  নগর পে চোর আয়েগা। বেশ গভীর বাস্তব তত্ত্বের গান। দেখলাম কোন একজন শ্রোতা লিখেছেন গানের একটি শব্দও বুঝতে পারিনি কিন্তু গানটি খুব ভালো লেগেছে। একেই বোধহয় বলে শিল্পকলার মহিমা আর শিল্পীর পারদর্শিতা। কিভাবে যে শ্রোতার হৃদয়ে সুর পৌঁঁছে যায় তা কেউ জানেনা, শুধু সেই সুরের মূর্ছনা শ্রোতাকে যেন আবিষ্ট করে রাখে। 

               ক'দিন ধরে হিমালয়ে যাওয়ার জন্য মনটা যেন ছটফট করছে। মেঘ পিওনের ব্যাগের ভিতর মনটাকে পুরে পাড়ি দিলাম হিমালয়ে। বদ্রীনাথধামের ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের যাত্রীনিবাসে সেবার বেশ কয়েকদিন ছিলাম। প্রচন্ড ঠান্ডা। চারিদিকে বরফের পাহাড় আর তা থেকে ধেয়ে আসা হাড় কাঁপানো ঠান্ডা হাওয়া। যাত্রী  গিজ গিজ করছে। যাত্রীনিবাসে তিল ধারণের জায়গা নেই। একটা করে বাস এসে দাঁড়ায় আর শয়ে শয়ে যাত্রী নামে।  ভারতসেবাশ্রমের সমস্ত যাত্রীনিবাসে একটি মন্দির থাকে সেখানে সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা গুরু মহারাজ প্রণবানন্দ স্বামিজীর নিত্য পূজা আরতি করা হয়। আরতি শেষে যে তীর্থক্ষেত্রের যাত্রীনিবাস, সেই তীর্থক্ষেত্রের বিরাজমান দেবতার জয়ধ্বনি দেওয়া হয়। এমনই রীতি। যেমন কেদার ক্ষেত্রে আরতির শেষে কেদারনাথের জয়ধ্বনি করা হয়, রামেশ্বরমে রামেশ্বর মহাদেবের জয়ধ্বনি হয় এইরকম। ঠিক তেমনই আরতি শেষে এখানে সমস্ত ভক্ত মিলিত কন্ঠে বদ্রীবিশালের জয় জয়কার করেন। এই আশ্রমের মহারাজ খুব সঙ্গীতপ্রেমী। ওনার কন্ঠ যে খুব সুরেলা তা নয়, কিন্তু প্রতিদিন আরতির পর উনি বেশ কয়েক জন যাত্রী, সাধু, মহারাজদের নিয়ে গানের আসর বসান। একদিন দেখলাম গান শুনতে অনেক ছোট ছোট ছেলেমেয়ে এসেছে। মাথার চুল এলোমেলো, এই হাড় কাঁপানো ঠান্ডা আঁটকানোর জন্য পর্য্যাপ্ত শীতবস্ত্রও  তাদের নেই। জামা কাপড় যথেষ্ট মলিন। মহারাজ তাদের ধরে বেঁধে নিয়ে এসে ভজন শোনাচ্ছেন। আর মহারাজের কথা অমান্য করা যায় না, তাই ভালো না লাগলেও চুপ করে বসে আছে তারা।  মহারাজের সাথে পরে কথা বলে জানতে পারলাম, পাহাড়ে রাস্তা বানানোর জন্য যে সমস্ত শ্রমিক তাদের পরিবার নিয়ে এসেছে, এরা তাদেরই ছেলে মেয়ে। পাহাড়ে রাস্তা বানানো যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ কাজ, তাই তত দিন এই ছেলেমেয়ে গুলো যাতে একটা ভালো পরিবেশে থাকতে পারে তাই মহারাজ ওদের আশ্রমেই আশ্রয় দিয়েছেন। খুব ভালো লাগল মহারাজের এই সিদ্ধান্তের কথা শুনে। পরদিন সকাল থেকে মন্দিরে একটা ধুণ বাজতে শুরু করল। বিখ্যাত এক দক্ষিণী শিল্পীর কন্ঠে  অখন্ড নারায়ণ ধুন, অপূর্ব তার সুরের মুর্ছনা।

শ্রীমন নারায়ণ নারায়ণ নারায়ণ

ভজ মন নারায়ণ নারায়ণ নারায়ণ

              আশ্রমের গরম জলের প্লান্টের কাছে মহারাজ একটা বড় বস্তা নিয়ে বসে আছেন। আশ্রমের একটি ছেলেকে বলেছেন বাচ্চাগুলোকে ডেকে নিয়ে আসতে। কিছুক্ষণ পরে এক দঙ্গল বাচ্ছা হই হই করে জড়ো হল।  মহারাজ বস্তাটা খুললেন। বাচ্ছা গুলোর জন্য বেশ কিছু জামাকাপড় দিয়ে গেছে গ্রামের লোকজন। মহারাজ একটি করে বাচ্ছাকে ডাকছেন আর তাদের মাপসই একটি করে জামা দিচ্ছেন। তারা যেন আকাশের চাঁদ পাচ্ছে হাতে। তাদের মুখের  হাসির কোন তুলনা হয় না। এবার মহারাজ ওদের সবাই কে নিয়ে বসেছেন, সারাদিনের রুটিন বোঝাচ্ছেন ওদের। সমস্ত কিছুর পরে বললেন - ইয়ে যো ধুন বজ রাহা হ্যায় উসে হর কাম মে শুননা। 

         সারাদিন সমস্ত গান বাজনা বাদ দিয়ে ওই নারায়ণ ধুণ চলতে লাগল আশ্রমে।  বাচ্ছাগুলো সারাদিন হই হই করে, নিজেদের মধ্যে ঝগড়া কখনো বা খুনুসুটি সব চলতে থাকে, তার সাথে ওই ধু্ণ ও চলতে থাকে। আশ্রমের অন্যান্য সাধু, আবাসিক, যাত্রী  সবাই ওই একঘেয়ে ধুণ শুনতে শুনতে বিরক্ত। মহারাজ নির্বিকার। সকালে ঘুম থেকে উঠেই ওই ধু্ণ চালিয়ে দেন। আরতির সময় টুকু বাদে সারাক্ষণ এই ধুণ চলতে থাকে। সকলের মুখে এক কথা আরে ধু্ণ শোনালেই কি এরা ভাল হয়ে যাবে! মহারাজ ও যেন বিষয়টি চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিয়েছেন। এইভাবে প্রায় দিন তিনেক কেটে গেল। পরিপাটি করে চুল আঁচড়ানো, পরিস্কার জামাকাপড় পরা আর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকা ছাড়া তাদের অভ্যাসের বিশেষ পরিবর্তন আমার চোখে তো পড়ল না। সারা আশ্রমে যেন একটা থমথমে পরিবেশ। মহারাজকে কেউ কিছু বলতেও পারেন না, আবার এই অনাসৃষ্টি যেন সইতেও পারেন না। অখন্ড ধুণ কিন্তু এক মুহুর্তের জন্যও থামে না। মনে মনে ভাবি আমি দু দিনের অতিথি এসবের মধ্যে আর নাই বা জড়ালাম। কিন্তু মহারাজের আত্মবিশ্বাসী চোখ যেন আমাকেও বিশ্বাস করতে বাধ্য করে ধুণ কি গুণ নিশ্চয়ই প্রকাশ পাবে। 

            আমার ফেরার সময় হল। একদম ভোরের বাসে রওনা হব যাতে অন্ততঃ ঋষীকেশ অবধি পৌঁঁছতে পারি। মহারাজ কে প্রণাম করে যাওয়ার অনুমতি চাইলাম। মহারাজ ওই বাচ্ছাগুলোর মধ্যে একটি ছেলেকে ডাকলেন - 'আব্দুল, যাও দিদি কো বাস স্ট্যান্ড ছোড় আও' । আব্দুল এক হ্যাঁচকায় পিঠে তুলে নিয়েছে আমার রুকস্যাক। পায়ে গামবুট মাথায় একটা মস্ত টুপি পরে মাথা নাড়তে নাড়তে চলেছে আমাকে এগিয়ে দিতে। ভালো করে ভোর হয় নি। ঠান্ডায় যেন দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে। চারিদিক নিস্তব্ধ। হঠাৎ একটা চেনা সুর কানে এল। আরে! এত সেই অখন্ড ধুণ। কে গাইছে এই জনহীন পাহাড়ে! খেয়াল করে শুনলাম রুকস্যাক কাঁধে নিয়ে পাহাড়ি এবড়ো খেবড়ো রাস্তায় চলতে চলতে আব্দুল গুন গুন করে গাইছে - ভজ মন নারায়ণ নারায়ণ নারায়ণ। আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। হে বদ্রীবিশাল এই না হলে তোমার মহিমা! মহারাজের প্রতি শ্রদ্ধায় মনটা ভরে উঠল। শুধু আক্ষেপ রয়ে গেল, আমার এই প্রাপ্তি মহারাজের সাথে ভাগ করে নিতে পারলাম না ।

                    জয় বদ্রীবিশাল