ছুটি বলল ওই বাড়িটায় আর থাকব না। এই বাড়িটায় থাকলে কেমন হয়? যেমন ভাবা তেমন কাজ। দশ মিনিটের মধ্যে ব্যাগপত্র গুছিয়ে আমরা বদলে নিলাম আমাদের ঠিকানা। ফিরগুণ থেকে কিরণ হোমস্টে। গোপী ঠাকুর আর তার স্ত্রী অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে চালায় এই হোমস্টে। যেমন ঝকঝকে পরিষ্কার ঘর, তেমনি ঘর থেকে দেখা পাহাড়ের অনবদ্য দৃশ্য। ছুটির খুশি আর ধরে না। সারাটা দিন কাঠের বাড়িটার বারান্দায় বসে তাকিয়ে রইলাম পাহাড়গুলোর দিকে। কিছুক্ষণ বাদে বাদেই বদলে যাচ্ছে পাহাড়গুলোর রঙ, নীচের দিকের একটা বাড়িতে কি যেন অনুষ্ঠান হচ্ছে। পায়ে পায়ে নেমে যাচ্ছে গ্রামের লোকজন। কিন্তু কোন শোরগোল নেই, এতটুকু বিঘ্নিত হয় না পাহাড়ের শান্তি। একটা গাড়ি নিয়ে আমরা গেলাম জিভি ঘুরতে। গোটা পথটা দেওদারের ঘন জঙ্গল। দিনের বেলাতেও প্রায় অন্ধকার। চারিদিকে কেমন যেন রহস্যের গন্ধ। আমাদের গাড়ির শব্দ ছাড়া আর কোন আওয়াজ নেই কোথাও। জোরে কথা বলতেও যেন খারাপ লাগে। মনে হয় প্রকৃতির উপর অবিচার করছি। মাত্র কিলোমটার ছয়েক। পৌঁছে গেলাম জিভি ঝর্নায়। গাড়ি থেকে নেমেই দেখা হয়ে গেল লম্বা লেজওয়ালা এক ম্যাগপাই এর সঙ্গে। কি তার রূপ।
Stay home
Thursday, 10 November 2022
হিমালয়ের আঁচলে
ছুটি বলল ওই বাড়িটায় আর থাকব না। এই বাড়িটায় থাকলে কেমন হয়? যেমন ভাবা তেমন কাজ। দশ মিনিটের মধ্যে ব্যাগপত্র গুছিয়ে আমরা বদলে নিলাম আমাদের ঠিকানা। ফিরগুণ থেকে কিরণ হোমস্টে। গোপী ঠাকুর আর তার স্ত্রী অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে চালায় এই হোমস্টে। যেমন ঝকঝকে পরিষ্কার ঘর, তেমনি ঘর থেকে দেখা পাহাড়ের অনবদ্য দৃশ্য। ছুটির খুশি আর ধরে না। সারাটা দিন কাঠের বাড়িটার বারান্দায় বসে তাকিয়ে রইলাম পাহাড়গুলোর দিকে। কিছুক্ষণ বাদে বাদেই বদলে যাচ্ছে পাহাড়গুলোর রঙ, নীচের দিকের একটা বাড়িতে কি যেন অনুষ্ঠান হচ্ছে। পায়ে পায়ে নেমে যাচ্ছে গ্রামের লোকজন। কিন্তু কোন শোরগোল নেই, এতটুকু বিঘ্নিত হয় না পাহাড়ের শান্তি। একটা গাড়ি নিয়ে আমরা গেলাম জিভি ঘুরতে। গোটা পথটা দেওদারের ঘন জঙ্গল। দিনের বেলাতেও প্রায় অন্ধকার। চারিদিকে কেমন যেন রহস্যের গন্ধ। আমাদের গাড়ির শব্দ ছাড়া আর কোন আওয়াজ নেই কোথাও। জোরে কথা বলতেও যেন খারাপ লাগে। মনে হয় প্রকৃতির উপর অবিচার করছি। মাত্র কিলোমটার ছয়েক। পৌঁছে গেলাম জিভি ঝর্নায়। গাড়ি থেকে নেমেই দেখা হয়ে গেল লম্বা লেজওয়ালা এক ম্যাগপাই এর সঙ্গে। কি তার রূপ।
Tuesday, 11 January 2022
নীলগিরি পঞ্চলিঙ্গেশ্বর
কলকাতা থেকে জাতীয় সড়ক ধরে বালেশ্বর, তারপর সেখান থেকে পঞ্চলিঙ্গেশ্বর যাওয়ার জন্য রাজ্য সড়ক ধরতে হবে। রাস্তার এরকম নিশানা সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়া গেল। জাতীর সড়কে রাস্তার নিশানা বেশির ভাগ জায়গায় থাকলেও খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতেই থাকে না। একটা মাকড়সার মত রাস্তা, যার আটটা আট দিকে গেছে। তার কোনটা যে বালাসোর যাবে, তার কোন নিশানা খুঁঁজে পাওয়া যায় না। যারা সড়কপথে লম্বা রাস্তা সফর করেন, এরকম অভিজ্ঞতা তাদের হামেশাই হয়ে থাকে। অগত্যা দোকানের সাইনবোর্ড, পথচলতি বাইক বা সাইকেলবাবু ই ভরসা। আর যদি সফরের সময় রাজ্যের পরিবর্তন হয়, তাহলে সমস্যাটা আর একটু গুরুতর হয়ে পড়ে। দোকানের সাইনবোর্ডগুলোর অক্ষর ক্রমশঃ অচেনা হয়ে যাওয়ায় তা পড়ে উদ্ধার করা যায় না। একমুখ পান বা গুটখা ঠেসে পথচলতি বাইক বা সাইকেলবাবু যদি অপরিচিত ভাষায় কথা বলেন, তাও খুব একটা বোধগম্য হয় না। আর এক অভিনব আধুনিক উপায় GPS - Global Positioning System। বেশ কয়েকবার এই সিস্টেম এর উপর নির্ভর করার পর এই ব্যবস্থার এক নতুন নামকরণ করার কথা মনে হয়েছে। GPS - ঘূর্ণিপাকের সন্ধানে। যা হোক পাঁচমিশেলি সবরকম উপায়ের সাহায্যে অবশেষে সন্ধান মিলল গন্তব্যে পৌঁঁছনোর রাস্তার। বাংলা আর ওড়িয়া মিলিয়ে মিষ্টিসুরের এক ভাষায় পথচারীরা সন্ধান দিলেন নীলোগিরি পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের।
একই নামের একাধিক জায়গা ভারতবর্ষে অগুণতি আছে। উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূব থেকে পশ্চিম এমন উদাহরণ প্রচুর পাওয়া যায়। নীলগিরি এমনই এক নাম। পশ্চিমঘাট পর্বতমালার অন্যতম প্রসিদ্ধ স্থান। কিন্তু একটু কান করে যদি স্থানীয় মানুষের উচ্চারণ শোনা যায়, তাহলে তার ভৌগলিক অবস্থান ঠাহর করা খুব কঠিন হয় না। দক্ষিণ ভারত ঘেঁষা পশ্চিমঘাট পর্বতমালার নীলগিরি স্থানীয় মানুষের কাছে - নী লা গি রি। এই উচ্চারণে স্পষ্ট দক্ষিণী ভাষার প্রভাব। আমি যে নীলগিরির কথা বলছি তার অবস্থান পশ্চিমবঙ্গের প্রতিবেশী রাজ্যে এবং কেমন যেন একটু বাংলা ভাষার মিশেল দিয়ে এর উচ্চারণ হয় - নী লো গি রি।
জাতীয় সড়ক ছেড়ে উড়িষ্যা রাজ্য সড়ক ধরে এগোতেই সমস্ত দৃশ্যটা বদলে
গেল।। পিচ ঢালা রাস্তার দুধারের ইউক্যালিপটাস গাছগুলো যেন একটানা একটা
সামিয়ানা তৈরী করেছে। ফাঁক দিয়ে দেখতে পাওয়া আকাশ আর গাছের সারি যেন
মহামহিমের অতিকায় ক্যানভাস। রাস্তার দুধারে ফসলের ক্ষেতে কোথাও কোথাও
লাগেনি কাস্তের ছোঁয়া। জন্মভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগের মুহূর্তে ফসলের
সম্ভার যেন মায়ের আদর খাচ্ছে প্রাণভরে। মাঝেমাঝেই পথচলতি মানুষকে জিজ্ঞাসা করতে করতে যেতে হচ্ছে পাছে রাস্তা হারাতে হয়। যাকেই জিজ্ঞাসা করা হয় তিনি পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের আগে নীলোগিরির উল্লেখ করেন। বোঝা যায় পর্যটকের কাছে পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের গুরুত্ব যাই হোক না কেন স্থানীয় মানুষের কাছে নীলোগিরি অনেক বেশি গুরুত্ব পায়।
এ নীলোগিরি কোন পর্বতমালা নয়। মালভূমি অঞ্চলে বিস্তৃত টিলার সারি। অতিকায় গোলাকৃতি বোল্ডার একের উপর এক যেন মাপ করে সাজানো। নীলোগিরি উড়িষ্যার বালেশ্বর জেলার অন্তর্ভুক্ত একটি মফস্বল শহর। এই জনপদের অধিবাসীর সংখ্যা সাকুল্যে হাজার পনেরো। কিন্তু শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা আমাদের দেশের জাতীয় গড়ের তুলনায় বেশি। এই জনপদের প্রসিদ্ধি প্রত্নপ্রস্তর যুগ থেকে। পরবর্তীকালে বৈদিক যুগের ইতিহাসে এবং রামায়ণে এই জনপদের বিশেষ উল্লেখ পাওয়া যায়। স্বাধীনতা উত্তর ভারতীয় ইতিহাসেও এই জনপদ বিশেষ ভাবে নিজের স্থান করে নেয়। বিংশ শতাব্দীতে গণজাগরণের বিভিন্ন পর্য্যায়ে এই জনপদের মানুষদের ভূমিকা বার বার ইতিহাস রচনা করেছে। কৃষক সম্প্রদায় বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় অত্যাচারী রাজার বিরূদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠেছেন কিন্তু তাদের সেই প্রতিবাদ নির্বিচারে দমন করা হয়েছে নৃশংসভাবে। অবশেষে এই নীলোগিরিই হয়ে ওঠে ভারতবর্ষের কৃষক আন্দোলনের পুণ্যজন্মভূমি। উড়িষ্যার স্বাধীনতা সংগ্রামী বলরাম রাজ, শ্যামসুন্দর পারিদা, কৈলাসচন্দ্র মোহান্তি, বনমালী দাস, বৈষ্ণব পট্টনায়েক, সতীশ চন্দ্র দাস, নন্দকিশোর পট্টনায়েক এবং আরও অনেকে স্থানীয় রাজার বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন করেন এবং তাকে ভারতের নবগঠিত জাতীয় সরকারের অন্তর্ভূক্ত হতে বাধ্য করেন। এই আন্দোলনই ছিল স্বাধীন ভারতবর্ষের প্রথম সংগঠিত কৃষক আন্দোলন এবং এই আন্দোলনের ফলস্বরূপ আরও ৫৭৬ টি স্থানীয় রাজার শাসিত অঞ্চল জাতীয় সরকারের অন্তর্ভূক্ত হয়। এরপর থেকেই ভারতের জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাসে নীলোগিরির নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে আর সেই গরিমার প্রকাশ যুগ যুগ ধরে পাওয়া যায় স্থানীয় মানুষের গর্বিত অনুভবের মধ্যে দিয়ে।
আবহমানকাল ধরে চলে আসা প্রকৃতি সাধনার অন্যতম নিদর্শণ পঞ্চলিঙ্গেশ্বর। পঞ্চলিঙ্গেশ্বরকে যদি প্রকৃতির নিজস্ব শিল্পকর্ম বলে ধরে নেওয়া যায়, সেটাই বোধহয় এই স্থানের সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত বর্নণা হবে। প্রবল বেগে বয়ে চলা একটি পাহাড়ি ঝর্ণার খুব সরু স্রোতের মুখে পাঁঁচটা শিবলিঙ্গের আকারের পাথর পঞ্চলিঙ্গেশ্বর হিসেবে পূজিত হন। পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের স্থাপনার সম্পর্কে বিভিন্নরকম লোককথা শোনা যায়। লোককথা অনুযায়ী রামায়ণে পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের উল্লেখ আছে এবং মনে করা হয় বনবাসে থাকাকালীন সীতা এই লিঙ্গগুলি স্থাপন করেন। অন্য আর এক লোককথা অনুযায়ী পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে বানাসুর এই স্বয়ম্ভু লিঙ্গের আরাধনা করেন। স্থাপিতই হোন বা স্বয়ম্বূই হোন প্রাকৃতিক এই জলধারায় নিরন্তর অভিষিক্ত হন পঞ্চলিঙ্গেশ্বর। এই অভিষেক স্নানই এই স্থানের অন্যতম দ্রষ্টব্য।
https://photos.app.goo.gl/YpRbZknx3MrF1SE98
বিগতদিনে যারা পঞ্চলিঙ্গেশ্বর দর্শণ করেছেন তাদের কাছে শুনেছি এই লিঙ্গগুলিকে ঝর্ণাধারার মধ্যে স্পর্শ করা যেত । বর্তমানে পর্যটকদের সেই স্পর্শসুখ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করার জন্য ঝর্ণায় যাওয়ার পথ লোহার গেট দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পঞ্চলিঙ্গেশ্বরে পাঁচ সংখ্যার বিশেষ গুরুত্ব আছে। লোহার গেট দিয়ে বন্ধ জায়গার সামনের চাতালে পাঁঁচজন পুরোহিত পাঁচটি লিঙ্গ নিয়ে বসে আছেন। ভক্তদের যার যেটায় ইচ্ছে অর্ঘ্য চড়িয়ে যাচ্ছেন।
একটু উঁচু চাতাল থেকে এই পঞ্চরঙ্গের দৃশ্য দেখছেন মহাদেবের অনুচর নন্দী । নন্দীর ঠিক পিছনেই পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের ভোগভান্ডার। সেখানে পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের পাঁচ রকম ভোগ পাওয়া যায়। পাঁচ রকম ভোগ আসলে পাঁচ রকম লাড্ডু। নারকোল আর চিনির লাড্ডু, নারকোল আর গুড়ের লাড্ডু, মিহিদানার লাড্ডু, বোঁঁদের লাড্ডু আর খই-গুড়ের লাড্ডু। প্রতি প্রকার ভোগের মূল্য পাঁচ টাকা, পাঁচরকম ভোগ একত্রে পঁচিশ টাকা। সব কিছুই পাঁচের প্যাঁচে।
এই প্যাঁচটা একটু খুলতে ইচ্ছে করল। পাঁচরকম ভোগ দেওয়ার এই প্রথায় কেমন পাঁচ পৃথক অস্তিত্বের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। চাতালের একদম পিছনের দিকে একটি হনুমান মন্দির আছে। সেখানে ভক্তদের আনাগোনা বিশেষ নেই। হনুমান মন্দিরের পুরোহিত ভক্তের অভাবে বেজার মুখে বসে আছেন। আমাকে দেখে একটু খুশিই হয়েছিলেন বোধহয় কিন্তু বিড়ম্বনায় পড়ে গেলেন আমার প্যাঁচানো প্রশ্ন শুনে। ওনার উত্তর শুনে এটুকু বোঝা গেল পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের পাঁচটি লিঙ্গের আকার একরকম নয়। কোনটা বেশ বড় আবার কোনটা একেবারেই গোল নুড়ির মত। হনুমান মন্দিরের পূজারী হলেও লিঙ্গগুলি সীতামাতার প্রতিষ্ঠিত এইরকম কাহিনীতে তাঁর বিশেষ রুচি নেই। বরং তিনি বিশ্বাস করেন লিঙ্গগুলি স্বয়ম্ভু হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। পাঁচটা পৃথক লিঙ্গ সম্পর্কে ওনার ধারণা খুব পরিষ্কার নয় তবে আবহমান কাল ধরে পঞ্চলিঙ্গকে একই দেবতা বা পঞ্চলিঙ্গেশ্বর হিসেবেই অর্চনা করা হয় এবং তিনিও তাইই করে থাকেন। মন্দিরের চাতালে যেখানে পাঁচজন পুরোহিত পাঁচটি লিঙ্গের পূজো করছেন সেখানে কি মন্ত্র পড়া হচ্ছে একবার কান করে শোনার চেষ্টা করলাম। ভক্তবৃন্দের তান্ডব আর ফুল মালার ঠেলাঠেলিতে কিছু তেমন বোঝা গেল না। অগত্যা পাঁচের প্যাঁচ মাথায় নিয়েই পঞ্চলিঙ্গেশ্বর ক্ষেত্র থেকে নামার রাস্তা ধরে ফেললাম। পাহাড় কেটে তৈরী রাস্তায় সিঁড়ির ধাপ ঘুরে ঘুরে নেমে এসেছি বেশ খানিকটা। হালকা জঙ্গল ঘেরা রাস্তা। একটা গাছের নীচে ত্রিপল খাটিয়ে বসে আছেন একজন সাধুগোছের মানুষ। সামনে বিক্রীর জন্য রাখা কয়েকটি বই। বিশ্রাম নেওয়ার অছিলায় একটু বসলাম তাঁর পাশে। বই গুলো ওড়িয়া ভাষায় লেখা, আমার আয়ত্তের বাইরে। শুধু একটা জায়গায় চোখ আঁটকাল। পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের অর্চনামন্ত্র। আমার মনের সমস্ত প্যাঁচ খুলে দিল এই মন্ত্র। সংস্কৃত ভাষায় লেখা। এই মন্ত্র অনেকটা পঞ্চভূত গায়ত্রী মন্ত্রের মত।
Friday, 11 June 2021
পাল্টিস্তানি
যে কোন দুই দেশের সীমান্ত আর সেই সীমান্তবর্তী মানুষের ইতিহাস সবসময়েই বৈচিত্রে ভরা। আর সেই দুই দেশ যদি ভারত আর পাকিস্তান হয় তাহলে তো আর কথাই নেই। লাদাখ প্রদেশের সিয়াচেন হিমবাহ ভারত পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক সীমানা। এই সিয়াচেন ক্ষেত্রে প্রবেশ করার আগে কয়েকটি সীমান্তবর্তী গ্রাম আছে। যার মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে শেষের গ্রাম তুরতুক। নুব্রা উপত্যকার শিওক নদীর ধারে পাহাড় ঘেরা শান্ত গ্রাম। কেমন যেন রহস্য দিয়ে ঘেরা। ভৌগলিক অবস্থান অনুযায়ী তুরতুক বাল্টিস্তানের অন্তর্গত যা পুরোপুরি পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণাধীন। এই অদ্ভুত টানাপোড়েনের সূচনা হয়, ১৯৪৭-৪৮ এ ইন্দো-পাক যুদ্ধের সময় থেকে। এই সময়ে পাকিস্তানের গিলগিট অঞ্চলের Gilgit Scouts বাল্টিস্তানের দগরা প্রশাসন কে উচ্ছেদ করে সমস্ত বাল্টিস্তান দখল করে। সেই সময় থেকে তুরতুক, পাকিস্তান সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। বাল্টিস্তা্ন, উত্তর কাশ্মীরের রাজাদের শাসন কালে ভারতের অন্তর্গত ছিল এবং এখানকার অধিবাসীরা বাল্টি বলেই পরিচিত ছিলেন। পাকিস্তানের দখলে যাওয়ার পর এই স্থান গিলগিট বাল্টিস্তান হিসাবে পরিচিত হয়। বাল্টিস্তানের মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মবিশ্বাস সবকিছুই পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশের মানুষদের থেকে একটু অন্যরকম। ১৯৭১ সালে আবার ইন্দো পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়। এই অঞ্চল টি site for Battle of Turtuk হিসাবে চিহ্নিত হয়। ব্রিগেডিয়ার উদয় সিং এর নেতৃত্বে Ladakh scouts এবং Nubra guards এর সেনাবাহিনী পাকিস্তানের সেনাবাহিনী কে বিতাড়িত করে তুরতুক গ্রাম কে আবার ভারতীয় সেনার দখলে নিয়ে আসে। এই যুদ্ধের পর বাল্টিক পাকিস্তান অঞ্চলের চারটি গ্রাম - তুরতুক, তাকসি, চালুংখা আর ধোথাং কে ভারতীয় সেনা পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে এবং গ্রাম গুলি ভারতভুমির অন্তর্ভুক্ত হয়। এই অসাধারণ সাফল্যের জন্য ব্রিগেডিয়ার উদয় সিং এবং তাঁর second in command মেজর চেওয়াং রিঞ্চেন কে মহাবীর চক্র সম্মানে ভূষিত করা হয়। ১৯৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধের সময় আবার পাকিস্তানের আতঙ্কবাদী সংগঠন এই গ্রাম গুলি দখল করার চেষ্টা করে, কিন্তু ভারতীয় সেনা বাহিনীর দক্ষতায় সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ২০১০ সাল পর্য্যন্ত তুরতুক সহ সমস্ত ভারতীয় গ্রাম গুলিতেই সেনাবাহিনী ছাড়া কারো প্রবেশাধিকার ছিল না। তবে ২০১০ সালে তুরতুক গ্রামটিকে পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
তুরতুক থেকে শিওক নদীর উপত্যকাতুরতুকের প্রতি পর্যটকরা যে কারণে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট হন তা আসলে খুব বিরল এক দৃশ্য। পর্যটকদের মধ্যে এই ধারণা আছে তুরতুক থেকে পৃথিবীর দ্বিতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ K2 বা গডউইন অস্টিন দেখতে পাওয়া যায়। কথাটা মিথ্যে না হলেও অর্ধসত্য বলা যেতে পারে। তুরতুক গ্রামের উপরের পাহাড় থেকে আকাশের সীমানায় এই শৃঙ্গ দেখা যায় বটে কিন্তু সাধারণ পর্যটক রা সেই জায়গা পর্য্যন্ত পৌঁছতে পারেন না।
তুরতুক গ্রামে পৌঁছনোর জন্য যে জায়গা অবধি গাড়ি যায়, তা একটা খরস্রোতা ঝর্ণার একদম ধারে। পায়ে চলা রাস্তায় খানিকটা এগিয়ে গেলেই ঝর্ণাটির উপর একটা লোহার ব্রিজ । আশপাশে কোন গ্রাম আছে বলে ধারণাই করা যায় না। ব্রিজ পার হয়ে অপর পারে গিয়ে উঠলাম একদম ঘন এক জঙ্গলের মধ্যে। জঙ্গলের বুক চিরে পাহাড়ী রাস্তা খানিকটা গিয়েই বেঁকে গিয়েছে। কেমন যেন নিষিদ্ধ অঞ্চলে চলে আসার মত অনুভুতি হচ্ছিল। একেই বোধহয় বলে সীমান্তবর্তী অঞ্চল। ঝর্ণার জলের বয়ে চলা আর পাখির ডাক ছাড়া কোন আওয়াজ নেই । পাহাড়ি পথে খানিকটা এগিয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ যেন দিগন্ত খুলে গেল। গ্রামে ঢোকার রাস্তাটা কেমন যেন জঙ্গল দিয়ে আড়াল করা। গ্রামটিকে যেন সযত্নে প্রকৃতির কোলে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। চারিদিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা সবুজ একটা গ্রাম। সামনে প্রশস্ত বার্লি ক্ষেত। দূরে দূরে কয়েকটি বাড়ি যেন ঝুলনের মত সাজানো।
সীমান্তের গ্রাম তুরতুকের বার্লি ক্ষেত
দু'ধারে ক্ষেত আর মাঝখান দিয়ে চলেছে মেঠো রাস্তা। এঁকে বেঁকে গ্রামবাসীদের বাড়ির পাশ দিয়ে। তুরতুক গ্রামের অধিবাসী রা বাল্টি ভাষায় কথা বলে। এখনো মহিলারা বাইরের লোক দেখলে লজ্জায় মুখ ঢাকেন এবং বাড়ির ভিতর ঢুকে যান। যে কয়েকজন মহিলা সামনাসামনি আসেন তাদের দেখেই মনে হয় তারা অত্যন্ত প্রাচীন এবং অভিজাত সম্প্রদায়ের মানুষ। গায়ের রঙ, শরীরের গড়ন সব কিছুর মধ্যেই যেন সেই প্রাচীনত্ব, আভিজাত্য প্রকাশ পায়। পাহাড়ের এই রুক্ষ আবহাওয়া, তীক্ষ্ণ সূর্য্যের আলো কোন কিছুতেই যেন তাদের সোনার মত বর্ণে এতটুকু খাদ মেশাতে পারেনি।
Silk route এর অন্তর্গত হওয়ায় তুরতুক গ্রামে বিভিন্ন সময়ে মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন জায়গা থেকে ব্যবসায়ীরা এসেছেন। কালের ধারায় তুরতুকে বসবাসকারী তিব্বতীয় বন ধর্মাবলম্বী বিভিন্ন জনজাতির মানুষের ধর্ম, সংস্কৃতি এবং জীবনধারায় আমুল পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। ইতিহাস বলে শিওক নদীর ধারে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক অংশে বসবাসকারী বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি বিশ্বাস রাখা একদল মানুষের মধ্যে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এসে পড়েন বিখ্যাত ইসলাম কবি মীর সঈদ আলী হামাদানি। এরপর থেকেই তুরতুক গ্রামের বাসিন্দারা ইসলাম ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন। কিন্তু আজও তুরতুক গ্রামের অধিবাসীরা বন ধর্মের বেশ কিছু আচার আচরণ মেনে চলেন । নমাজধারী ইসলাম ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও তুরতুক গ্রামের অধিবাসীরা সম্পূর্ণ নিরামিশাষী।
সীমান্তবর্তী গ্রাম হওয়ায় বৈদেশিক বাণিজ্যে তুরতুক গ্রামের যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা আছে। এই গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরেই খোবানি বা apricot এর চাষ হয়। এই খোবানি ফল থেকে তার বীজ বের করে তাকে শুকিয়ে বিদেশে রপ্তানি করার সমস্ত কাজ টা তুরতুক গ্রামের মহিলারা করে থাকেন। এই খোবানির জন্যই তুরতুক গ্রামকে বার বার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছে পাকিস্তান এবং এই গ্রাম আক্রান্ত হয়েছে।
গ্রামে ঘুরতে ঘুরতে আলাপ হল মধ্যবয়সী হুসেন বেইগ এর সাথে। শিক্ষিত মানুষ, গ্রামের প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক। ওনার সাথে যখন ওনার বাড়ির পথে চলেছি, পথে দেখা মিলল একঝাঁক ম্যাগপাই পাখির। নিজেদের মধ্যে হইচই করে ঘুরে বেড়াচ্ছে গ্রামের বিভিন্ন বাড়ির কোণায়।
ম্যাগপাই
গ্রামের গল্প বলতে বলতে বেইগ সাহেব আমাদের নিয়ে গেলেন ওনার নির্মীয়মান বাড়ির পিছনে। সেখান থেকে শিওক নদীর চর দেখে মনে হচ্ছে যেন ছোটবড় বিভিন্ন মাপের মাদুর পাতা আছে প্রকৃতির কোলে। মাঝে মাঝে দু একটা লম্বা লম্বা গাছ। বাঁদিকে তাকালেই দেখা যায় রুক্ষ কারাকোরাম পর্বতের সীমানা। এই সীমানায় ভারত এবং চীন উভয় দেশেরই সেনাছাউনী আছে। সেই ছাউনী প্রায় ১০ কিমি দূরে। বেইগ সাহেব আমাদের দেখানোর জন্য বাইনোকুলার নিয়ে এলেন। বেশ কয়েকটা পাথরের উপর বাইনোকুলারটা ঠিক মত রাখতে রাখতে বেইগ সাহেব বলতে লাগলেন তার আক্ষপের কথা। উনি বললেন আমাদের পূর্বজরা নিজেসের অজান্তেই, ঘর থেকে এক পা না বেরিয়েই কখনো হয়েছেন হিন্দুস্তানী, কখনো বাল্টিস্তানী, কখনো আবার পাকিস্তানী। কিন্তু তাদের কথা কেউ শোনেনি। তাদের সমস্যার কথা কেউ ভাবেনি। সময়ের সাথে সাথে নিজেদের অনিচ্ছায় তারা বদলে ফেলতে বাধ্য হয়েছে তাদের সংস্কার, ধর্মবিশ্বাস, জীবনধারা এবং সর্বোপরি নাগরিকত্ব। তবে আজ তারা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে এবং ভারতের নাগরিক হিসাবে তারা অনেক সুরক্ষিত বোধ করে। ইতিমধ্যে বাইনোকুলার ঠিক জায়গায় লাগানো হয়েছে। বেইগ সাহেব একে একে আমাদের দেখাচ্ছেন পাহাড়ের একদম মাথায় মুখোমুখি দুটি সেনাছাউনী যার একটা একটু উঁচুতে। এই উঁচু ছাউনীর মাথায় উড়ছে ভারতীয় তেরঙ্গা। এক ঝলক দেখলেই কেমন গা শিউরে ওঠে। ঐ দুর্গম পর্বতশিখরে টহল দিয়ে চলেছে দু দেশের সেনা। রক্ষা করে চলেছে রাষ্ট্রীয় সীমান্ত। তুরতুক গ্রামের অধিবাসীরা ভারতীয় সেনাদের প্রতি তাদের কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য পালা করে এই রুক্ষ দুর্গম পর্বত শিখরে পায়ে হেঁটে সেনাদের খাবার পৌঁঁছে দিয়ে আসে। আমি বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করি যখন সব টা বরফে ঢেকে যায়! বেইগ সাহেব জবাব দেন - 'দেখা কিতনী উঁচাই পর লহরা রহে হ্যায় হামারা তিরঙ্গা!। কুছ ভি হো যায় উসে ঝুকনা নেহি'।
শ্রদ্ধায় মাথা নীচু হয়ে যায়। হয়তো বা সীমান্তের এত কাছে আছে বলেই দেশের প্রতি এত ভালোবাসা। বারবার দেশবদল হয়েছে, বদলেছে জীবন কিন্তু বদলায়নি দেশমাতৃকার প্রতি তাদের ভালোবাসা, জাতীয় পতাকার প্রতি তাদের শ্রদ্ধা, ভারতীয় সেনাদের প্রতি তাদের কর্তব্যনিষ্ঠা। তাই বার বার পাল্টে যাওয়া এই পাল্টিস্তানিরাই আমাদের দেশের সম্পদ, সত্যিকারের হিন্দুস্তানী।
Thursday, 3 June 2021
মরুজাহাজ
সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী ভারতীয় সেনার অসংখ্য ছাউনী রয়েছে গোটা লাদাখ প্রদেশ জুড়ে। তার মধ্যে যে সেনা শিবিরের কথা শুনলে শরীরের সমস্ত রক্ত হিম হয়ে যায়, সেই সিয়াচেন লাদাখ প্রদেশের নুব্রা উপত্যকার আন্তর্জাতিক সীমারেখা। নুব্রা উপত্যকায় সিওক আর নুব্রা এই দুই নদীর সঙ্গম। নুব্রা উপত্যকার অনেক জনপদের মধ্যে হুন্ডার অন্যতম আকর্ষণীয়। ধুসর পাহাড়ের কোলে এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে স্নিগ্ধ নুব্রা নদী। সূর্য্যের আলো ছায়ায় কোথাও কাজল কালো কোথাও বা সবুজ সে নদীর জল। ঠিক যেন ছোটবেলায় খাতায় আঁকা নদীর মত। নদীর দুধারে সামান্য ঘাস। তারপরেই ধু ধু সাদা বালি। নুব্রা ভারতের শীতল মরুভুমি।
Wednesday, 26 May 2021
পদ্ম-পিনাক পাণি
আজ বুদ্ধপূর্ণিমা। ভগবান বুদ্ধের পুণ্য আবির্ভাব তিথিতে আজ আকাশের মুখ ভার। দেখা নেই পূর্ণিমার চাঁদের। এমনই এক চাঁদহীন পূর্ণিমা ছিল সেদিন। কোজাগরী পূর্ণিমা। রাতটা কেটেছিল হিমাচল প্রদেশের লাহুল স্পিতি জেলার এক বিখ্যাত জনপদ, উদয়পুরে (উদেপুর নামেও পরিচিত)। প্রকৃতি যেমন হিমালয়ের অনন্য সম্পদ, ঠিক তেমনই হিমালয়ের পথে পথে এমন কিছু সম্পদের দেখা মেল্ যা ভারতের সভ্যতা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় সহনশীলতার সুদৃঢ় বুনিয়াদের নিদর্শন। প্রত্যন্ত সীমান্ত পাঙ্গি উপত্যকা থেকে ফেরার পথে উদয়পুর পৌঁছতে প্রায় অন্ধকার হয়ে গেল। হিমালয়ের কোলে কোজাগরী পূর্ণিমার রাত কাটানো যে কোন হিমালয়প্রেমীর কাছে অত্যন্ত লোভনীয়। আমরাও সেই স্বপ্নেই বিভোর ছিলাম। কিন্তু বিধি বাম। উদয়পুর পৌঁছনোর কিছু আগে পথেই নামল তুমুল বৃষ্টি। উদয়পুর থেকে কেলং যাওয়ার পথে ৯ কিলোমিটার যাওয়ার পর রাস্তা বেঁকে গেল পাহাড়ের একদম শেষ প্রান্তে। বৃষ্টি ভেজা এই রাস্তাটুকু আসতে অনেক সময় লেগে গেল। সেই সঙ্গে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা আর রক্ত জমিয়ে দেওয়া হাওয়া।
গাড়ি থেকে নেমে অল্প কিছুটা রাস্তা হেঁটে পাহাড়টার একদম শেষ প্রান্তে পৌঁঁছে গেলাম। খাড়া পাহাড়ের নীচে বয়ে চলেছে চন্দ্রভাগা। বৃষ্টির জন্য সব ধোঁয়া মনে হচ্ছে। একদম শেষ মাথায় দেখতে পাওয়া যাচ্ছে দুধ সাদা মন্দিরের চুড়া - ত্রিলোকীনাথ। এই মন্দির ভারতবর্ষের ধর্মীয় সহনশীলতার ইতিহাস বহন করে। আসল মন্দিরটির অস্তিত্ব বিলুপ্ত। কেউ বলেন এ মন্দির পান্ডবদের বানানো আবার কেউ বা বলেন কুলুর রাজপরিবার এই মন্দির নির্মাণ করেছেন। তা সে যেই নির্মাণ করুক না কেন এ মন্দিরের আকর্ষণ এর ধর্মীয় গ্রহণ যোগ্যতায়। বৌদ্ধ ধর্মের সাথে হিন্দু ধর্মের চিন্তা ভাবনায় মৌলিক বিভেদ থাকলেও তা যে কখনো সামাজিক গঠনে ভাঙ্গন ধরায়নি, এই মন্দির তার অন্যতম উদাহরণ। কথিত আছে এই মন্দিরের জায়গায় একসময় বৌদ্ধ বিহার ছিল। পরবর্তী সময়ে হিন্দু ধর্মের মানুষ এখানে শিব পূজা শুরু করেন । অন্য একটি মত অনুসারে ত্রিলোকীনাথ আদতে শিব মন্দির যেখানে বৌদ্ধ গুরু পদ্মসম্ভব অষ্টম শতাব্দী তে ভগবান বুদ্ধের আরাধনা শুরু করেন। ইতিহাস যাই বলুক না কেন এখানে হিন্দু ও বৌদ্ধ উভয় ধর্মের মানুষ আসেন। বিগ্রহকে যে জ্ঞানে পূজা করতে তিনি ইচ্ছুক, সেই জ্ঞানেই পূজা করার স্বাধীনতা সমস্ত ভক্তের আছে।
মন্দিরের প্রবেশ পথ বেশ সংকীর্ণ। চাতালে দাঁড়ালে মনে হয় কোন একটি বাড়ির উঠোনে গৃহদেবতার মন্দির। এটি ভারতবর্ষের একমাত্র মন্দির যে মন্দিরের বিগ্রহ বৌদ্ধ লামা এবং হিন্দু পুরোহিত একসাথে পূজো করেন। মন্দিরের চাতালে শিবের বাহন নন্দী র জন্য একটি ছোট্ট একটি চালা করা আছে। পাশে একটি ঘরে রাখা আছে বৌদ্ধ দের Prayer wheel।
ত্রিলোকীনাথ মন্দির মন্দিরের বিগ্রহ বড় বিচিত্র। বিগ্রহটির ছয় হাত, যা ভগবান বুদ্ধের অবলোকিতেশ্বর রূপ। বিগ্রহের মাথায় শিবের জটা। হাতে জপমালা। শিবের গলায় উপবীত, কোমরে পেঁচানো সাপ। বুদ্ধের গলায়, কানে, বাহুতে রাজকীয় অলঙ্কার। ধ্যানমগ্ন মহাযোগী মুদ্রায় শিব আর পদ্মপাণি অবলোকিতেশ্বরের সহাবস্থান। শিবের জটার চুড়ায় রয়েছেন অমিতাভ বুদ্ধ - যিনি সীমাহীন আলোর প্রতীক। মন্দির প্রাঙ্গনে ভক্তের দল নিজেদের আরাধ্য দেবতার প্রতি প্রণাম জানান। কেউ বলেন 'ওম মণি পদ্মে ওম', কেউ বলেন 'ওম নমঃ শিবায়ঃ'। কিন্তু কারো প্রণাম অন্যের প্রণাম কে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে না। এমনই এ মন্দিরের শৃঙ্খলা। বৌদ্ধ লামাই হোন বা হিন্দু পুরোহিত, ভক্তের বিশ্বাসে কোনওরকম প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করেন না।
Sunday, 23 May 2021
ভারতের নীলকন্ঠ
ভারতীয় সনাতন সংস্কৃতিতে নীল রঙ কে নানা ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নীল কখনো পরাক্রমের প্রতীক, কখনো বা সাহসিকতার, কখনো পৌরুষের। হিন্দু দেবদেবীরা যারা উক্ত গুণের অধিকারী, তাদের গায়ের রঙ নীল। তা সে শিব ই হোন বা বিষ্ণু। নীল রঙের ঔজ্জল্যই তার আকর্ষণ। ভারতীয় সংস্কৃতিতে নীল রঙের ব্যবহারেও প্রচুর বৈচিত্র আছে। যেমন রাজস্থানের বিশনয় সম্প্রদায়ের মানুষ নীল রঙের বস্ত্র গায়ে দেন না। এই সম্প্রদায়ের মানুষ প্রকৃতিকে ঈশ্বর রূপে আরাধনা করে। নীল রঙ যেহেতু বিশেষ এক ধরণের গাছ থেকে একসময় তৈরী হত, তাই এই রঙ তৈরী করতে গিয়ে এই নীল গাছ গুলিকে ধ্বংস করা হত। প্রকৃতির এই অপূরণীয় ক্ষতি যাতে না হয়, তাই এই সম্প্রদায়ের মানুষ নীল বস্ত্র বর্জন করেন। বড় বিচিত্র নীলের বিষয়।
নীল কখনো আবার সৌভাগ্যের প্রতীক। বিজয়া দশমীর দিন কোনো ভাবে কেউ যদি নীলকন্ঠ পাখির দেখা পান তাহলে তা পরম সৌভাগ্যের প্রতীক বলে মনে করা হয়। রামায়ণের বর্ণনা অনুযায়ী রাম যেদিন রাবণ বধের উদ্দেশ্যে রওনা হন, সেদিন তিনি নীলকন্ঠ পাখির দেখা পান, আর সেদিন ছিল বিজয়া দশমী। শিবপুরাণে আবার নীলকন্ঠ পাখিকে শিবালয়ের দূত হিসাবে বর্ণনা করা হয়। বিজয়া দশমীর শেষে মা যখন তাঁর সন্তানদের নিয়ে কৈলাসের উদ্দেশ্যে রওনা হন, সেই খবর কৈলাসপতির কাছে পৌঁছে দেয় এই নীলকন্ঠ পাখি।
নীলকন্ঠ পাখি (Indian Roller)নীল যে শুধুই শুভ বা শুদ্ধতার প্রতীক তা কিন্তু নয়। নীল রঙ বর্জন করার অন্যতম কারণ হিসাবে মনে করা হয়, নীল হল বিষের রঙ। সমুদ্র মন্থনের সময় এই বিষ পান করে ছিলেন মহাদেব এবং এই বিষের রঙেই তিনি নীলকন্ঠ। যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন নীল রঙের বোধহয় নিজস্ব সহনশীলতা আছে, যা তাকে দেয় অনন্ত বিস্তার, বিপুল গভীরতা।
হিমালয়ের আনাচে কানাচে এমন নীলের দেখা মেলে বহু জায়গায়। এমনই এক নীলের সন্ধানে গিয়েছিলাম ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্য লাদাখ এ। লাদাখ কে বর্ণনা করতে গেলে খুব সহজে পরস্পর বিপরীত দুটি শব্দ বলা যায় - রুক্ষ আর মনোরম। সবুজের অনুপস্থিতিতে মাইলের পর মাইল রুক্ষ পাহাড় কিভাবে প্রাকৃতিক শিল্পকলার সম্ভার সাজিয়ে বসে আছে, তা দেখতেই লাদাখ এ আসা। লাদাখ এর প্রধান শহর লে থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়া যায়। তবে লাদাখ রাজ্যের সিংহ ভাগ যেহেতু সেনাদের দখলে, তাই সাধারণ মানুষের যাওয়ার অনুমতি মেলে খুব অল্প কয়েকটি জায়গায়। লেহ থেকে বেরিয়ে পৃথিবীর সর্বোচ্চ যান চলাচলের উপযুক্ত গিরিখাত, খার-দুং-লা পার হয়ে আমাদের গাড়ি ছুটে চলল সেই নীল গন্তব্যে। পথে যেতে যেতে যে নৈসর্গিক দৃশ্য চাক্ষুষ করলাম তা বর্ণনা করার মত ভাষা আমার ভান্ডারে নেই। রুক্ষ পাহাড়, তার গায়ে তীব্র হাওয়ার ধাক্কায় তৈরী হওয়া বিভিন্ন রকম আকার। কোনটা দুর্গের মত, কোনটা বা সেনাদলের সারি, কোনটা যেন রথের মত, কোনটা আবার আস্ত রাজপ্রাসাদ। কোনও কোনও পাহাড়ের গোড়া থেকে মাথা অবধি রক্তবর্ণ গ্রানাইটের দেওয়াল, কোনওটায় সবুজ, কোনওটায় আবার দুধ সাদা। আমাদের গন্তব্যের কাছাকাছি এসে পড়েছি বলে যখন জানতে পারলাম, তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে বটে কিন্তু এই উচ্চতায় এ সময়ে যথেষ্ট দিনের আলো। পাহাড়ের একটা বাঁক ঘুরতেই আচমকা দেখা দিল ঘন নীল জলরাশি। যেন প্রচুর পরিমাণ নীল রঙ জলে গুলে রেখে দেওয়া হয়েছে। হারিয়ে গেল এক নিমেষে। এই হারিয়ে খোঁজাই হিমালয়ের সবথেকে বড় আকর্ষণ। কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা পৌঁঁছে গেলাম আমাদের নীল গন্তব্যে, ৪৩৫০ মিটার উচ্চতায়, হিমালয়ের কোলে আন্তর্জাতিক সীমাকে গিলে ফেলা বিপুল এক জলের ভান্ডার। এ ভান্ডারের মাত্র ৪০ শতাংশ ভারতবর্ষের দখলে, বাকি ৬০ শতাংশ চীন তথা চীন অধিকৃত তিব্বতের।
এ জলরাশির রঙ বিভিন্ন সময়ে বদল হয়। ঘন নীল থেকে আকাশী, আকাশী থেকে সবুজ, সবুজ থেকে লালচে গোলাপী। প্রকৃতির নিত্য হোলিখেলা। প্রবল হাওয়ায় জলে ওঠে ছোট্ট ছোট্ট ঢেউ যার নীচে কাঁচের মত পাথরগুলো খুব আস্তে আস্তে গড়িয়ে যেতে থাকে শামুকের মত। এ হ্রদ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণার পর কিছু আশ্চর্য্য তথ্য পাওয়া যায়। এই হ্রদের জল সম্পূর্ণ আবদ্ধ, অন্য কোন জলের স্রোতের সাথে এর কোন সম্পর্ক না থাকায় এই জল মাত্রাতিরিক্ত নোনা। এই হ্রদের জলে প্রচুর খনিজ পদার্থ থাকায় জলের রঙ ঘন নীল। নোনা হলেও এই হ্রদের জল শীতকালে সম্পুর্ণ বরফ হয়ে যায়। মাত্র কয়েকপ্রকার কবচী জীব ছাড়া এই হ্রদের জলে কোন জীব বাঁচতে পারে না। অর্থাৎ এই হ্রদের নান্দনিক উৎকর্ষ যাই হোক না কেন ব্যবহারিক উৎকর্ষ বিশেষ উল্লেখযোগ্য নয়। যতক্ষণ আলোর শেষ রেখা টুকু পড়তে লাগল চেটেপুটে উপভোগ করলাম এর রংবাহার।
আমরা ঘুরে আসার কিছুদিন পর থেকেই শুরু হয়ে গেল এই সীমান্ত প্রদেশে ভারত-চীন দুই দেশের অধিকার রক্ষার লড়াই। খবরের কাগজে পড়তে লাগলাম সে চেনা জায়গার নাম - চুশুল। এই বিপুল জলরাশি কে মাঝখানে রেখে দীর্ঘ কয়েকমাস চলতে লাগল প্রাণঘাতী সংঘর্ষ। এখনো 'হয় নাই শেষ'। এ যেন আর এক দফা সমুদ্র মন্থন। প্রকৃতির এমন অমূল্য সম্পদ তাকে কি খড়ির গন্ডি তে বাঁধা যায়! এই বিপুল জলরাশির মধ্যে দাগ কেটে কি আমার তোমার ভাগ করা সম্ভব! কিছুতেই নয়। আর এই অসম্ভব কে সম্ভব করার জন্য দু'দেশের মানুষের দুর্বার প্রচেষ্টা বছরের পর বছর ধরে বাতাসে ছড়ায় বিষ। সেই বিষ নিরন্তর পান করে চলে ব্রহ্মান্ডের এই ক্ষুদ্র অংশ। এই বোধহয় সত্যিকারের হলাহল পান। নিজের সৃষ্টির একটুকরো অংশের মধ্যে এভাবেই বোধহয় নিজেকে প্রকাশ করেন দেবাদিদেব। প্রকৃতির এই নীল সম্পদ - প্যাঙ্গং সো হয়ে ওঠে ভারতের নীলকন্ঠ।
Friday, 7 May 2021
হাসেন অন্তর্যামী
প্রকৃতির নিয়মে বছরের অনেকটা সময় গৃহবন্দী হয়ে অবসর জীবন কাটাতে বাধ্য হন, এমন মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে তো বটেই, ভারতবর্ষেও কিছু কম নয়। এমন কিছু মানুষের সান্নিধ্যে কয়েকদিন কাটাতে গিয়েছিলাম হিমাচল প্রদেশের এক অচেনা প্রান্তে। হিমালয়ের পিরপাঞ্জাল আর জাঁস্কর শাখার মধ্যবর্তী অঞ্চল পাঙ্গি উপত্যকা নামেই পরিচিত। পাঙ্গি উপত্যকায় প্রধানতঃ হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষের বাস। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ভোট দের আধিক্য থাকায় পাঙ্গি উপত্যকা প্রধানতঃ চারটি ভাটোরী তে বিভক্ত। সেই চারটি ভাটোরির অন্যতম হল সুরাল ভাটোরী। বাঁদিকে পিরপাঞ্জাল আর ডানদিকে জাঁস্কারের মাঝে শান্ত, সবুজ নির্জন জনপদ সুরাল। পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলেছে সুরাল নালা। বছরে চার থেকে পাঁচ মাস জলের স্রোত বয়ে যায় এই উপত্যকায়। বাকি সময় সবকিছু বরফের নীচে, সমস্ত মানুষ গৃহবন্দী। পাথুরে উপত্যকায় বয়ে চলা সুরাল নালার দুই ধারে উঁচু পাহাড়ের ঢাল। সুরালের উচ্চতা ১০০০০ ফুটের কিছু বেশি। ছোট বড় মিলিয়ে গোটা তিনেক প্রাইমারী এবং ইন্টারস্কুল আছে, যা সুরালের জনসংখ্যার তুলনায় চলনসই। এমনই একটি স্কুলের মাস্টারমশাই পবন সিং নেগি র সাথে আলাপ হল সুরাল গ্রামে। জানতে চাইলাম সুরালের ইতিকথা।
সুরাল নালা
পাঙ্গি উপত্যকা হিমাচল প্রদেশের প্রান্তিক অংশ এবং জম্মু কাশ্মীর সীমানার সাথে যুক্ত। হিমাচলের বেশ কয়েকটি গিরিবর্ত্ম এই পাঙ্গি উপত্যকা কে বিচ্ছিন্ন করে রাখে বছরের অর্ধেকের বেশি সময়। কিলার থেকে সাচ পাস (১৪৪৮২ ফুট) পার হয়ে পোঁছতে হয় এই স্বর্গীয় ভুখন্ডে। সাচ পাস থেকে সোজা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গাড়ি যখন নামতে থাকে দুর্বার গতিতে, মনে হয় এ যেন এক অন্যরকম নাগরদোলা। সুরাল, ভারত ভুখন্ডের বহু প্রাচীন জনপদ। কথিত আছে হিমাচলের শাসকবর্গ অপরাধের শাস্তি হিসাবে প্রজাদের এই ভুখন্ডে পাঠিয়ে দিতেন যাতে তারা সহজে আর মূল ভুখন্ডে ফিরতে না পারে।
সে যেভাবেই গড়ে উঠুক, দুটি ভিন্ন ধর্মের মানুষ আবহমান কাল ধরে জীবনধারণ করে চলেছে প্রকৃতির এই ইন্দ্রলোকে। কথা বলতে বলতে পবন নেগি আমাদের নিয়ে এসেছেন একটা উঁচু জায়গায় যেখান থেকে সুরাল নালার সর্পিল গতি দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। পাহাড়ের সমস্ত ঢালে ঘন জঙ্গল। লা্ল, হলুদ আর সবুজ রঙে যেন আগুন জ্বলছে। জানতে পারলাম এই বিভিন্ন রঙ আসলে বিভিন্ন বয়সের ভুজ গাছের পাতার। একেবারে কচি পাতা আগুনের মত লাল, মধ্যবয়সী পাতা ঘন সবুজ আর প্রাপ্তবয়স্ক পাতা কাঁচা সোনার মত হলুদ।
ভুজ গাছের জঙ্গল
ভারতের সনাতন সংস্কৃতিতে ভুজ গাছের ছালের ব্যবহার বহুজনবিদিত। কিন্তু হিমালয়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এই ঐতিহাসিক বৃক্ষের বিপুল সমাহার সম্পর্কে আমার অন্ততঃ কোন ধারণা ছিল না। নেগি সাহেব অতি যত্ন সহকারে আমেদের ঘুরিয়ে দেখাচ্ছেন তাঁর জন্মভূমি। প্রকৃতির সাথে লড়াই করতে করতে লৌহকঠিন ব্যক্তিত্বের অধিকারী প্রত্যেক সুরালবাসী, ঠিক তেমনই তাদের আবেগ। কৌতুহলী আমার মন। প্রশ্ন করে বসি এই সুরাল নালা কোথা থেকে আসছে? নেগি সাহেব বলেন এই নালার উৎস হিমাচল আর জম্মু কাশ্মীরের সীমান্তে অবস্থিত শিবশঙ্কর শৃঙ্গ। এ কেমন শৃঙ্গ? নেগি সাহেব বলেন - "যাও খুদ দেখকে আও ক্যায়সে শঙ্কর ভগবান পাহাড় কী চোটি সে হামে রকসা কর রহে হ্যায়"। ভারী অদ্ভুত তো! নেগি সাহেব আমাদের রাস্তা বাতলে দিলেন, চলতে শুরু করলাম। নেগি সাহেব জয়ধ্বনী দিলেন - জয় শিব শঙ্কর।
সুরাল নালার পাশ দিয়ে পাহাড়ি রাস্তা। অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য। ক্রমশঃ চলতে চলতে অনেক পিছনে ফেলে এসেছি সুরাল গ্রাম। দুধারে অসংখ্য বরফের পাহাড়, পাহাড়ের গা বেয়ে সারি সারি ছোট বড় ঝরনা নেমে এসে মিশে যাচ্ছে সুরাল নালায়। বেশ কয়েক কিলোমিটার হেঁটে ফেলেছি। হঠাৎ দু তিনটে পাহাড়ের মাঝখান থেকে উঁকি মারল আড়াআড়ি ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা আপাদমস্তক বরফে ঢাকা এক শৃঙ্গ। বড় অদ্ভুত তার গড়ন। সামনের দিকটা যেন হাতির শুঁড়ের মত। যত সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি শৃঙ্গের গড়ন বদলে যাচ্ছে। খানিক দুর যাওয়ার পর পুরো প্রশস্ত শৃঙ্গ দেখতে পেলাম। যেন প্রকান্ড এক শঙ্খ। যে শঙ্খ বাজানোর ক্ষমতা মহাযোগী মহাদেব ছাড়া আর কারো নেই। কি অদ্ভুত এই শৃঙ্গের রূপ। পরতে পরতে যেন অনুভব করা যায় ত্রিলোকেশ্বরের উপস্থিতি। মনে পড়ে গেল কোন একজনের লেখায় পড়েছিলাম শঙ্খের মত দেখতে বলে এই শৃঙ্গকে পর্বতারোহীরা শিবশঙ্খ শৃঙ্গ নামে চেনেন। কিন্তু সুরাল বাসীর কাছে এই পাহাড়ই শিব শঙ্করের বাসভুমি। বিস্ময়ের আরও কিছু বাকি ছিল। খানিকটা এগিয়ে গিয়ে পাহাড়ের চুড়ার দিকে তাকাতেই কানে বেজে উঠল নেগি সাহেবের কথাগুলো। নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছি না। বরফে মোড়া শঙ্খ আকৃতির এই পাহাড়ের মাথায় স্বয়ং শিবশঙ্কর বিরাজমান। তাঁর কৃপাদৃষ্টি সরাসরি সুরাল গ্রামের দিকে। প্রকৃতির এই বিস্ময় নিজে চোখে না দেখলে হয়তো বিশ্বাস করতাম না। ইনিই নেগি সাহেবের শিবশঙ্কর, যিনি প্রকৃতির উচ্চাসনে বসে অবিরাম রক্ষা করে চলেছেন তাঁর সৃষ্টির প্রতিটি অনুকণা। সকলের নাগালের বাইরে সমস্ত পার্থিব মায়াজাল এড়িয়ে অবিচল, ধ্যানমগ্ন জগদীশ্বর। সৃষ্টির সমস্ত কলহ, বিবাদ, অভিমান, অহংকার সমস্ত কিছুকে যেন প্রাণভরে উপভোগ করছেন সচ্চিদানন্দ।
বরফ ঢাকা শৃঙ্গের চুড়ায় শিবশঙ্কর
অদ্ভুতদর্শন এই শৃঙ্গের চুড়ায় আসীন রজতগিরিনিভম কে দেখে মনে হল, এই পরম ঐশ্বর্য্য অবহেলা করি আমরা। পার্থিব চাওয়া পাওয়া নিয়ে গড়ে তুলি আত্মপ্রত্যয়ের অসাড় গর্ভগৃহ। সে গর্ভগৃহ ঊজ্জ্বল করে তুলি অহংকারের রোশনাই দিয়ে, সাজিয়ে তুলতে জ্বালাই উচ্চাশার হাজারবাতি। প্রাপ্তির সেই অন্তঃসারশূণ্য আস্ফালন দেখে অবশ্যই তাঁর করুণা হয়, হাসেন অন্তর্যামী।






