Thursday, 10 November 2022

হিমালয়ের আঁচলে

    তানের ঘরের ঠিক সামনে দিয়ে চলে গেছে ইলেকট্রিকের দুটো মোটা তার। সারাদিনের ক্লান্তি ভরা আধবোজা চোখে গা এলিয়েছে তান। প্রতিদিনের মত ফিঙে দুটো এসে বসেছে তারের উপর। এই ফিঙে যুগলের খুনসুটি দেখতে দারুণ লাগে তানের। মনে হয় যেন সারা দিন ধরে জমিয়ে রাখা সমস্ত সুখদু:খের হিসেব মেলাচ্ছে কত্তা-গিন্নীতে। হঠাৎ একটা দমকা হাওয়ায় উড়ে গেল একটা ফিঙে। তারে বসে থাকা ফিঙেটার গভীর চোখটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে তান। যেন চোখে চোখে কথা হচ্ছে দুজনের- 
"কি গো ক'দিন জানলাটাই যে খোলা ছিলনা! কোথায় পালিয়েছিলে?" 
 ধড়মড় করে সোজা হয়ে উঠে বসে তান। আজ দুপুরটা দারুণ মজায় কাটবে। "বেড়াতে গেছিলাম গো" "
ও তাই বলো। তা কদ্দূর গেছিলে শুনি! শোনাও তোমার বেড়ানোর গপ্প।" 
"গেছিলাম সে অনেক উঁচু পাহাড়ে। ঘন সবুজ পাইনের চাদরে মোড়া। আঁকা বাঁকা রাস্তার পাশ দিয়ে ছুটে চলা পাহাড়ি নদীর সঙ্গে গল্প করতে করতে পৌঁছে গেলাম এক স্বপ্নের দেশে।"
 "আমি তো এই জঙ্গলটাতেই একা থাকতে পারিনা আর তুমি একা একা অত দূর চলে গেলে? তোমার ভয় করল না!" "ভারি অদ্ভুত কথা বলো তো তুমি! একা কেন যাব? ছুটি, আমার একমাত্র বন্ধু ছিল তো আমার সঙ্গে। সে আমায় একা যেতে দেবে নাকি!" 
"ও তাই বলো। তাহলে বলো তোমার বেড়ানোর গল্প।"
 তারটাকে শক্ত করে ধরে জমিয়ে বসল ফিঙেটা। বড় বোদ্ধার মত।
 "অনেকদিন ধরে জায়গাটার নাম শুনছিলাম জানো - জালোরি পাস। খোঁজখবর করে রুট ঠিক করলাম। হিমাচলপ্রদেশের এই প্রান্তিক অঞ্চলে পৌঁছনোর রাস্তা অনেক। আমরা বেছে নিলাম দিল্লী দিয়ে যাওয়ার রাস্তা।" 
"দিল্লী! বাবা সে তো অনেক দূর!" 
"কি যে বলো অত ভাবলে কি বেড়ানো যায়!"
 "তাও ঠিক। যাকগে বলো তারপর!" 
"বেড়ানোর পরিকল্পনা এমনভাবে করেছিলাম যাতে ট্রেন থেকে কোজাগরী পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে পারি।"
 "বাহ। কি দারুণ! কেমন দেখালো চলন্ত চাঁদ!" 
"না গো। কপাল মন্দ হলে কি আর চাঁদ দেখা যায়! সারা রাস্তা আকাশের মুখ গোমড়া। রাতে তো বৃষ্টি হল তুমুল।" 
"এমা! তাহলে চলন্ত চাঁদ দেখা হল না!"
 "নাহ। মাঝরাতে তো তুমুল বৃষ্টি। দিল্লীতে যখন নামলাম তখনও বৃষ্টি। ঘোলা আকাশ। মেজাজ টা একদম খিঁচড়ে গেল জানো!"
 "সেই তো! আকাশ ঘোলা থাকলে আমাদেরও খুব মন খারাপ লাগে। গান গাইতে ইচ্ছেই করে না। তা বেশ তারপর!" "রাতে বাস ধরলাম দিল্লীর কাশ্মীরি গেট থেকে।" 
"ও দিল্লী আর কাশ্মীর বুঝি একই জায়গায়!"
 "ধ্যাৎ! কি যে বলো না! ওটা দিল্লীর একটা জায়গা। ওখানের বাসস্ট্যান্ড থেকে অন্য রাজ্যে যাওয়ার বাস ছাড়ে। বুঝেছ?" "ও আচ্ছা।" 
"বাসে চড়ে আমরা সারারাত চলতে লাগলাম। মাইলের পর মাইল। রাস্তার দুধারে শুধু আলোর রোশনাই। শহুরে কায়দার খাবার দোকান, হোটেল, আরও কতো কি! দিন না রাত বোঝার উপায় নেই।" 
"সে কি বলো! রাতের বেলা দিনের আলো! তাহলে ওখানে আমাদের বন্ধুরা ঘুমোয় কি করে!" 
"ওখানে গাছই নেই তোমার বন্ধুরা থাকবে কোথায়? সব পালিয়ে গেছে কোথায় কে জানে!" 
"আহারে! গাছই নেই!" 
"না সমস্ত গাছ কেটে, চওড়া রাস্তা বানানো হয়েছে। বিদ্যুতের গতিতে সেখানে গাড়ি চলে। যতদূর দেখা যায় কালো পিচঢালা রাস্তা আর ছুটে চলা বেপরোয়া গাড়ি।" 
"তা বাসে করে কোথায় নামলে?" "আমি ভেবেছিলাম মান্ডিতে নামব। ছুটি বলল অট বলে একটা জায়গার কথা। সেখান থেকে নাকি আমাদের যাওয়ার জায়গাটা কাছে হবে। তাই টিকিট বদলে ফেললাম।" 
       তান আর ফিঙের গল্পের মাঝে তারটাতে এসে বসল একটা বাঁশপাতি পাখি। কি তার রঙ আর কি তন্বী তার গড়ন। ফিঙে উল্লসিত হয়ে বলল - 
"ঐ দেখো আমার বন্ধুও তোমার গল্প শুনতে এসেছে। শোন হে, তান কেমন পাহাড়ের গল্প বলছে। আমরা তো অত উড়তে পারিনা, তাই গল্পই শুনি!" 
        তানের শ্রোতার সংখ্যা এক থেকে দুই হল। 
"তা বলো বলো তার পর কি সব হোল" 
"সক্কালবেলা তুমুল বৃষ্টির মধ্যে বাসের কন্ডাকটর চেঁচাচ্ছে- অটবালো আগে আইয়ে–। বুঝলাম নামতে হবে।" 
"এমা ভিজে যাবে যে গো"- আঁতকে উঠল বাঁশপাতিটা। প্রচন্ড বৃষ্টিতে ওর ওই বাঁশের পাতার মত চেহারা যেমন ভিজে আরও শুকিয়ে যায়, ও যেন তেমনটা হওয়ার কথাই ভাবল মনে মনে। 
"না গো না, আমরা তো জ্যাকেট ফ্যাকেট পরে একদম রেডি। হঠাৎ দেখলাম ঝুপ করে অন্ধকার নেমে এল।" 
"সকালবেলা অন্ধকার! পাহাড়ে এমন হয় বুঝি!"
 "আমরাও তো ঘাবড়ে গেছিলাম, তারপর দেখলাম একটা টানেলে ঢুকে পড়েছে আমাদের বাস।" 
"টানেল! সে আবার কি জিনিস!" 
"গুহা। আস্ত একটা পাহাড় ফুটো করে তার পেটের ভিতর বানানো সাড়ে তিন কিলোমটার লম্বা রাস্তা এঁকে বেঁকে চলে গেছে। বেশ খানিকক্ষণ অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে চলার পর আলোর বিন্দু দেখা গেল একটা। সেই বিন্দু বড় হতে হতে আমরা পাহাড়ের পেট থেকে বেরিয়ে এলাম আলোর মধ্যে। কন্ডাকটর আমাদের নামিয়ে দিল। আর বাসের খোল থেকে বের করে দিল আমাদের মালপত্র। তখন চারিদিক সাদা হয়ে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। সেই সাদা ধোয়াঁর মধ্যে কেমন যেন মিলিয়ে গেল বাসটা। চলে গেল মানালির দিকে।" 
"আর তোমরা?"
 "আমরা কোনওরকমে মালপত্র নিয়ে উঠলাম একটা দোকানের চাতালে। সুপুরুষ এক হিমাচলী ভদ্রলোক আমাদের সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন- কাঁহা জায়েঙ্গে? বিস্মিত চোখে আমাদের দেখলেন আপাদমস্তক। কি জানি কেন!" 
বাঁশপাতিটা শিস দিয়ে উঠল আনন্দে। "তোমাদের খুব পছন্দ হয়েছিল বোধহয়"
 "মস্করা করছ! কেন আমাদের পছন্দ হতে নেই নাকি!" 
"এই থামতো! গল্পটা শেষ হবে না। এক্ষুণি সে মিনসে বাসায় ফিরবে আর আমাকে না দেখলেই চিল চিৎকার জুড়বে। তান তুমি বলোতো" 
"আমরা একটা ছোট্ট গাড়ি নিলাম। সাদা রঙের অল্টোগাড়ি। চড়ে বসলাম দুজনে। ছুটি আগে এসেছে এদিকটায়, আমি আসিনি। তাই আমার কাছে পুরো জায়গাটা আনকোরা, নতুন। আমার ডান দিক দিয়ে একদম সাথে সাথে চলেছে বিয়াস নদী। মানালির কাছে বিয়াসের সঙ্গে দেখা হয়েছে আমার। কিন্তু সে বিয়াস এত মলিন ছিল না।" 
                           তানের তখন অল্প বয়স। মাধ্যমিক পরীক্ষার পর বাবা মার সাথে গিয়েছিল মানালি। পাথরে পা দিয়ে দিয়ে চলে গিয়েছিল নদীটার কাছে। নদী যেন নীলঘুর্ণি। পাথরের ফাঁকে ফাঁকে নীল জলের যে অন্তহীন যাত্রা দেখেছিল তান, তার গোটাটাই যেন থমকে গিয়েছে। জলনুপুর পায়ে দিয়ে, বাতাসে শব্দের ঝংকার তুলে ছুটতে থাকা নদীটাকে থামতে বাধ্য করেছে উন্নয়নের কারিগররা। চঞ্চলা একটা নদীকে বানিয়ে তুলেছে ‘লেক’। প্রকৃতির সঙ্গে কি চরম নিষ্ঠুরতা। পাহাড়ের পর পাহাড় ফুটো করে তৈরী করেছে একের পর এক টানেল। কোথাও কোথাও কাটতে কাটতে গোটা পাহাড়কেই ভ্যানিশ করে দিয়েছে আহাম্মকের দল। এক পাহাড়ের মাথা থেকে আর এক পাহাড়ের মাথায় তৈরী হয়েছে কংক্রিটের জঙ্গল। এত অত্যাচার প্রকৃতি কিভাবে সহ্য করে চলেছে! পাথুরে ধুলোয় নদী হারিয়েছে তার রঙ, পাহাড় হারিয়েছে তার সবুজের আবরণ, বাতাস হারিয়েছে তার সৌরভ আর তান আর ছুটির মত পাহাড়ের টানে ছুটে আসা মানুষগুলো, প্রতিনিয়ত হারিয়ে ফেলছে তাদের স্বপ্নের দৃশ্যপট। কি মর্মান্তিক!
 “তা ওই অট না কি বললে সেখানে আছে টা কি?”
 “মিলন আছে। মানুষের অত্যাচারে সমস্ত লাবণ্য হারানো বিয়াসের কালো স্রোতের মধ্যে মিশে যাচ্ছে হিমাচল প্রদেশের অন্যতম পবিত্র নদী তীর্থন।” 
“নদী তো সবই পবিত্র। তা এর আবার আলাদা কি?”
 "এ নদীর পবিত্রতায় আলাদা মাত্রা আনে স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস। তীর্থন নদী তার যাত্রা শুরু করেছে ১৩১২৪ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত তীরথ হিমবাহ থেকে। স্থানীয় মানুষ মনে করেন তীরথ হিমবাহ ক্ষেত্র অত্যন্ত পবিত্র। সেখানে কেউ জোরে কথা বলে না, কেউ কারো ক্ষতি করার কথা ভাবে না, কেউ তার সংযম হারায় না। প্রকৃতির এই পবিত্র ক্ষেত্র ঈশ্বরের জাগ্রত রূপ - এমনটাই তাদের বিশ্বাস। আর এই পবিত্র হিমবাহ থেকে জন্ম নেওয়া তীর্থন নদী তার সমস্ত যাত্রাপথে রেখে যায় পবিত্রতার ছোঁয়া। এই নদীর পবিত্র কলেবর নিজের অস্তিত্বকে বিলীন করে দিয়ে মিশে যায় বিয়াসের স্রোতধারায়।”
 “ তবে তো সে মিশে যাওয়া খুব সুন্দর কি বলো!” 
“না। মন খারাপ করে দেওয়া মিলন। যেন দৈত্যাকার কালো একটা সাপ নির্বিচারে গিলে ফেলছে সুন্দর, ঝলমলে, উচ্ছ্বল, নীলাভ সাদা, অতি পবিত্র এক তরুণীকে।”
 “এ মা তাহলে কি বেড়ানোটাই মাটি হয়ে গেল!” - ঘাড় ঘুরিয়ে জানতে চায় বাঁশপাতিটা।
 “আবার তুই বাজে বকছিস! বলছি না তানকে বলতে দে! বলোতো তান, তারপর কি কি দেখলে?”
 “আমাদের গাড়িটা ছুটে চলতে লাগল তীর্থন নদীকে সাথে নিয়ে। যত উপরের দিকে উঠছি তত যেন মোহময়ী লাগছে তীর্থনকে। তবে খুব বেশিক্ষণ নয়। কিছুটা রাস্তা যাওয়ার পরই আমরা আলাদা হয়ে গেলাম নদীটার থেকে। তীর্থন উপত্যকার কয়েকটা ছোট ছোট গ্রাম পেরিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম। ক্রমশঃ কমে যেতে লাগল ঘরবাড়ির সংখ্যা আর হাতছানি দিতে লাগল চিরপাইন আর ঝাউ এর জঙ্গল।” 
               জঙ্গল শুরু হতেই তান তাকালো ছুটির মুখের দিকে। খুশীতে ঝকঝক করছে ওর মুখটা । জঙ্গল ছুটির খুব পছন্দ। তা সে পাহাড়েই হোক বা সমতলে। এক পশলা বৃষ্টি হয়ে যাওয়ার পর পাহাড়ি রাস্তার পাশের গাছগুলোতে আর এক বিন্দু ধুলো নেই। প্রত্যেকে মেলে ধরেছে তাদের নিজস্ব রঙের বাহার। কত রকমের সবুজ। গাঢ়, একটু ফিকে, কোনটা লালচে সবুজ, কোন গাছে লাল কচি পাতা, কোনওটায় আবার খয়েরি হয়ে যাওয়া পাতা, ঝরে পড়ার অপেক্ষায়। দূরে গ্রামের বাড়িগুলো ঝুলনের মত সাজানো। সদ্য সন্তান হারানো আপেল গাছ গুলো কেমন যেন দুঃখী হয়ে আছে। মাঝে মাঝে কয়েকটা গাছ দাঁড়িয়ে আছে কলাবৌ এর মত ঘোমটা দিয়ে। আপাদ মস্তক নেট দিয়ে ঢাকা সে গাছগুলো। তান ছুটিকে বলে - এ গাছগুলোয় বোধহয় এখনো আপেল আছে তাই না!। মাথা নাড়ে ছুটি। চিরপাইন ছেড়ে ধীরে ধীরে আরও ঘন জঙ্গলের দিকে এগিয়ে চলে দুজনে।
"তা তোমরা গাড়ি করে কোথায় গেলে!" 
"অট টানেল পার হয়ে আমাদের গাড়ি ধরল ন্যাশানাল হাইওয়ে ৩০৫। এই রাস্তার স্থানীয় নাম আনি-বাঞ্জার-অট মার্গ। চলতে চলতে আমরা পেরিয়ে গেলাম বেশ কয়েকটা জনপদ। তীর্থন নদীকে পার করলাম বার তিনেক। সে একবার আমাদের ডান দিকে থাকে তো আবার চলে যায় বাঁদিকে। এই করতে করতে একসময় নদী ছেড়ে আমাদের রাস্তা উঠে গেল উপরের দিকে। নদীটা ক্রমশ: সরু হতে হতে অনেক নীচে নেমে যাচ্ছে। একসময় হারিয়ে গেল আমাদের চলার পথ থেকে। একটা মাঝারি মাপের বাজার এলো। হাতে গোনা কয়েকটি দোকান। এটা নাকি এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বাজার- বাঞ্জার। বাঞ্জার আসলে পুষ্পভদ্রা নদীর উপত্যকা।”
 “ও বাবা আবার নদী!”
 “ হ্যাঁ! ওখানে তো প্রতি বাঁকে পাহাড় নদীর সঙ্গে লুকোচুরি খেলে। তবে এই পুষ্পভদ্রা নদী কোথা থেকে চলা শুরু করেছে তা জানা গেল না। বাঞ্জার উপত্যকা দিয়ে চলতে চলতে সে নাকি কোন পাহাড়ের ভাঁজে মিশে গিয়েছে তীর্থন নদীর সাথে।” ‘দেখেছিস কেমন সুন্দর! একটা নদী আর একটা নদীর সাথে মিলেমিশে চলে! আর তোরা? খালি ঝগড়া করে মরিস, খাবার নিয়ে, বাসা নিয়ে আরও সব কি কি নিয়ে।” 
“ইসস!” ঝাঁঝিয়ে উঠল বাঁশপাতিটা। “শুধু আমরাই ঝগড়া করি তাই না! তোমরা করোনা?”
 “ওই দেখো আবার ঝগড়া করে। আরে গল্পটা শোনোই না মন দিয়ে।” 
 কোথা থেকে উড়ে এসে বসল আর একটা ফিঙে - “বাহ বেশ জমিয়ে গল্প হচ্ছে দেখি! তা আজ কি আর ঘরে ফেরা হবে না?”
 “তান কি সুন্দর পাহাড়ের গল্প বলছে দেখো। তোমারও খুব ভালো লাগবে শোনোই না। ঘরে তো ফিরবই। চলোনা একটু তানের সাথে ঘুরে আসি!” 
              আরও একজন শ্রোতা বাড়ল তানের গল্পের। তান বলছে বাঞ্জারের কথা। হিমাচল প্রদেশের কুলু জেলার ছয়টি তহসিলের একটি হল এই বাঞ্জার। এটি হিমাচলের সেরাজ অঞ্চলের একটি অংশ, যার বিস্তৃতি জালোরি পাস থেকে জাঞ্ঝেলির শিখরি দেবী পর্যন্ত। কুল্লাভি ভাষার একটি উপভাষা হল সেরাজি। এই ভাষায় কথা বলার জন্য বাঞ্জার উপত্যকার অধিবাসীরাও সেরাজি হিমাচলী নামেই পরিচিত। সমস্ত বাঞ্জার উপত্যকায় অরণ্যের অভাবনীয় বৈচিত্র। নীচের দিকে খোশমেজাজী চিরপাইন, মধ্যভাগে রাসভারি দেওদার, সেডার, উচ্চভাগে উদ্বাহু ফার, রোডোডেনড্রনের সারি। তহসিলের ৪৫টি গ্রাম, বাজার দোকান, রসদ সংগ্রহ, যাতায়াত সবকিছুর জন্য এই বাঞ্জারের উপরই নির্ভরশীল। 
নতুন শ্রোতা আক্ষেপ করে - “আমি তো অনেকটা শুনতে পাইনি, এবার শুনি। তা সেখান থেকে কোথায় গেলে তোমরা?” “বাঞ্জার ছাড়াতে ছাড়াতেই আবার বৃষ্টি নামল। আমরা যাব শোজা (Shoja)। বাঞ্জার উপত্যকার উপরের দিকের স্বল্পপরিচিত একটি গ্রাম। বাঞ্জার বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় পনের কিলোমিটার। ঘন দেওদারের জঙ্গলে বৃষ্টির আওয়াজ শুনে মনে হচ্ছিল প্রকৃতি যেন খুব নীচু সপ্তকে মৃদঙ্গ বাজাচ্ছে। বৃষ্টির জন্য এত বড় জঙ্গলে তোমাদের কোন বন্ধুর গান শোনাই গেল না।” 
 “তান, একটু থেমে যাও। ওই মাছরাঙাটাকেও ডেকে নিই।” 
মিষ্টি সুরে শিস দিতে লাগল ফিঙে। তীরের বেগে উড়ে এলো মাছরাঙাটা। কি অসাধারণ সমঝোতা। দেখে অবাক হয়ে গেল তান। যা হোক তানের গল্পের আসর দারুণ জমে উঠেছে। 
“জঙ্গল ক্রমশঃ ঘন হচ্ছে। সরলরেখার মত দাঁড়িয়ে থাকা দেওদার গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে মেঘ যেন আইস বাইস খেলছে। এ গাছ থেকে ও গাছ পালিয়ে বেড়াচ্ছে আর বলছে - রাখো দেখি ধরে আমায়! কিছুক্ষণ চলার পর দেখা হল পুষ্পভদ্রার সঙ্গে”। “ওই যে আর একটা নদী?”
 “হ্যাঁ, তীর্থনের উপনদী। এসে পৌঁছলাম জিভি নামের এক জনপদে। জিভিতে পুষ্পভদ্রার দেখা মেলে বলে অনেকেই এ নদীকে জিভি নদী বলেই চেনে। আসলে এটা একটা বড়সড় পাহাড়ি ঝর্ণার মত। কিন্তু বৃষ্টির জলে ফেঁপে ফুলে সে বেশ স্বাস্থ্যবতী হয়েছে। ছোটবড় বোল্ডারে ধাক্কা মারতে মারতে সশব্দে নেমে আসছে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। ছোট ছোট বাঁকের মুখে সাদা ফেনার মত ঘুরপাক খেয়ে আবার ধরছে নীচে নামার পাথুরে রাস্তা। অসংখ্য দেওদারের সারি নদীটাকে ঘিরে রয়েছে অত্যন্ত রক্ষণশীল অভিভাবকের মত। গাছের ফাঁক দিয়ে একবার দেখা দিয়েই আচমকা হারিয়ে যাচ্ছে পুষ্পভদ্রা।” “বাহ বেশ মজার ব্যাপার কি বলো!” 
“জঙ্গলের পথ ধরে ঘন সবুজের মধ্যে আমাদের সাদা গাড়িটা যেন পালকের মত এগিয়ে চলেছে। চলে এসেছি প্রায় পাঁচ কিলোমিটার মত। মাইলস্টোন জানিয়ে দিল আমরা পোঁছে গেছি শোজা (Shoja) । বৃষ্টিতে ভিজে চারিদিক স্যাঁতস্যাঁত করছে। হাড় হিম করা ঠান্ডায় দুজনে নামলাম গাড়ি থেকে। আমাদের থাকার জায়গা - ফিরগুন হোমস্টে। আমাদের দেখে ছুটে এল কর্মচারী রাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝলাম ও আসলে রাম নয়, হাঁদারাম।” 
খক খক আওয়াজ করে তানের গল্পের শ্রোতারা বুঝিয়ে দিল এই হাঁদারাম ব্যাপারটায় তারা বেশ মজা পেয়েছে। 
“হোমস্টে টা ছুটির একদম পছন্দ হয়নি জানো। ওর মলিন মুখটা দেখে আমারও খুব রাগ হচ্ছিল নিজের উপর। কিন্তু কি করব! এই ইন্টারনেটের চক্করে পড়ে। অনেক করে বোঝালাম একটু কষ্ট করে নাও। অবুঝ তো একেবারেই নয়, মানিয়ে নিল সবটাই। ততক্ষণে বৃষ্টি থেমে গিয়ে সামনের পাহাড়ে দেওদারের মাথায় উঠেছে সোনালী রোদের মুকুট। তার একটু ঝলক পড়েছে ছুটির মুখেও। আমারও মনটা একটু হালকা হল বটে।”
 "ওই ঠান্ডাতে কি করলে তোমরা? শরীর ফুলিয়ে বসে রইলে?"
 "ধুস! আমাদের কি আর তোমাদের মত পালকের কম্বল আছে? আমাদের শরীর গরম করতে কম্বলের মধ্যে ঢুকতে হয়। হোমস্টেটার ঘরগুলো অতটা ভালো না হলেও খুব সুন্দর একটা খাওয়ার জায়গা ছিল। কাঁচের জানলাটার সামনে দাঁড়ালে মনে হত শূণ্যে ভেসে আছি। যতদূর দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের সারি, একটার সাথে একটা হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছে। কতযুগের বন্ধন ওদের! কত শতাব্দীর সখ্যতা।" 
 

 
 "ওখানে আমাদের বন্ধুরা আছে নিশ্চয়ই?" 
"আছে তো! আকাশটা পরিষ্কার হতেই একে একে বেরিয়ে উড়ে বেড়াতে লাগল এ গাছ থেকে ও গাছে। সানবার্ড, শালিক, আর ছাতারে পাখির মত অনেক পাখি। কেউ ঠান্ডায় সারা শরীর ফুলিয়ে বসে আছে গাছের মগডালে, কেউ আবার এ ডাল থেকে সে ডালে উড়ে বেড়িয়ে গা গরম করে নিচ্ছে। সন্ধ্যা হওয়ার সময় এগিয়ে আসতেই সব জড়ো হতে লাগল গাছে গাছে। সামনের পাহাড়টার পিছনে সূর্য্য ধীরে ধীরে ঢলে পড়ল। আকাশে ছড়িয়ে থাকা ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘগুলো স্নান করতে লাগল ডুবন্ত সূর্য্য থেকে বেরিয়ে আসা রঙের আবীরে। কোনওটা খরগোসের মত, কোনওটা বা কুমীর, আবার কোনওটা দেখতে ছুটন্ত ঘোড়ার মত। ব্যস ঝুপ করে নেমে গেল অন্ধকার। পাহাড়ের কাজকম্মের দিন শেষ।" 

 
 "পাহাড়ে কেন আমাদেরও তো তাই। সন্ধ্যে হলেই বাসায় ঢুকে গুটিসুটি মেরে বসে থাকো আবার সকাল না হওয়া অবধি।" 
           মাছরাঙাটা হঠাৎ যেন ঘাড়ের ব্যায়াম করছে। চোখের নিমেষে উড়ে গিয়ে বসল জলাটার ধারে। ওর বোধহয় আর গল্প শুনতে ভালো লাগছে না।
 "কি হল মাছরাঙার? ভাল্লাগছে না বুঝি!" 
"আরে না না, শুধু গল্প শুনলে কি পেট ভরবে? ও নিশ্চয়ই জলায় কিছু খাবার দেখতে পেয়েছে। তুমি বল তারপর কি হোল?" 
"ভোর না হতেই ঘুম ভেঙে গেছে। ঘরের বাইরে বসেছি দুজনে গরম ধোঁয়া ওঠা চা নিয়ে। উল্টোদিকের পাহাড়টা রোদের ছোঁয়া পেয়ে আড়মোড়া ভাঙছে। একটু একটু করে দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের কোলে ঘুমিয়ে থাকা জিভি। চলে যাওয়ার আগে ঘননীল আকাশে সাদা চাঁদটা যেন শুভেচ্ছা জানিয়ে যায় - ভালো কাটুক দিনটা। আজ আমরা যাব জালোরি পাস। ঠিক সাড়ে নটায় দুধসাদা অল্টো নিয়ে উপস্থিত ইচ্ছুভাই। ছোটখাটো চেহারা, মুখে হালকা হাসি। যা বলা হয়, তাতেই বলে - কোই বাত নহী। মাত্র পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা । হুস করে পৌঁছে গেলাম জালোরি পাস। বাঞ্জার উপত্যকা আর আনি উপত্যকার মধ্যের সংযোগক্ষেত্র এই জালোরি পাস। ১০২৮০ ফুট উচ্চতায় যেখানে আমাদের গাড়ি থামল রাস্তার সেই মোড়েই রয়েছে মহাকালী মন্দির। কিন্তু এই মন্দিরটা ঠিক হিমাচলের মন্দিরের মত নয়। তবে এই অঞ্চলের মানুষের কাছে অবশ্যই পুণ্যক্ষেত্র। 
 

 
এখান থেকে দেখতে যাব সিরোলসার লেক। পাঁচ কিলোমিটার মত পায়ে হাঁটা পথ। গাড়ি থেকে নেমেই মনটা যেমন আনন্দে মেতে উঠল, তেমনি আবার খারাপও লাগতে শুরু করল।” 
                 আবার উড়ে এসেছে মাছরাঙাটা। সঙ্গে এসেছে বেশ কয়েকটা দোয়েলও। সমস্ত ইলেক্ট্রিকের তারটা জুড়ে যেন জরুরী সভা বসেছে হরেকরকম পাখির। 
“খারাপ লাগার আবার কি হোল?”
 “ছুটিকে এখানে একা রেখে যেতে হবে। স্থানীয় লোকজন বলছে যেতে আসতে প্রায় চার সাড়ে চার ঘন্টা লাগবে। কি করবে এতক্ষণ একা একা। ছুটি কিন্তু ভীষণ উত্তেজিত। নিজের ছোট্ট স্যাকটায় আমাকে গুছিয়ে দিয়েছে বিস্কুট, জল। বারবার সাবধান করছে যতটা পারা যাবে আমি যেন ততটাই যাই। গাড়ি থেকে নেমেই এত তড়িঘড়ি হাঁটতে শুরু করলাম টাকার ব্যাগটা রয়ে গেল ছুটির কাছে। ক’টা লজেন্স কিনব, সেটাও গেলাম ভুলে। একটু হাঁটার পর মনে হল ভালোই হয়েছে অন্ততঃ লজেন্সের কাগজ ফেলে এই অসাধারণ পথটাকে নোঙরা করার কোন দায় আমার থাকবে না। কিন্তু এই লজেন্সের কাগজ আমার যে কি উপকার করল তা কি বলব।” 
“তুমি লজেন্সই খেলে না তাও কাগজ তোমার উপকার করল! সে আবার কেমন কথা?” মুখ ঝামটা দিয়ে উঠল মাছরাঙাটা।
 “আরে বাবা শোনোই না। মহাকালী মন্দিরের ঠিক পাশ দিয়ে চলে গিয়েছে হাঁটার পথ। কয়েকটা বাঁক ঘুরতেই রাস্তাটা ক্রমশঃ উঁচু হতে লাগল। হারিয়ে গেল নীচের দোকানপাট। শুরুতে একটা দুটো স্থানীয় লোকের দেখা মিলছিল, তারপর তাদেরও আর দেখা পাওয়া গেল না। ক্রমশঃ রাস্তাটা চলেছে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। কখনও একটু এবড়ো খেবড়ো, কখনো জঙ্গলের মেঠো পথ। কোথাও কোন জনপ্রাণী নেই, জঙ্গলের মধ্যে ঝাউ, বার্চ, আরও নানারকম গাছের সাথে কথা বলতে বলতে আমি এগিয়ে চলেছি একা, একেবারে একা।”
 

 
 “একেবারে একা? তোমার ভয় করছিল না?” একচোখ বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করল দোয়েল। 
“কিসের ভয়? এত সুন্দর প্রকৃতি একেবারে নিজের মত করে দেখতে পাওয়া এতো দারুণ ব্যাপার। নিস্তব্ধ হিমালয়ের জঙ্গল। মাঝে মাঝে ভেসে আসছে কিছু পাখির ডাক, আর ছোটছোট জলধারার কলকল আওয়াজ। আর গাছ থেকে খসে যাওয়া পাতার স্তুপের উপর দিয়ে হেঁটে চলেছি আমি। কানে আসছে নিজের চলার শব্দ। গাছগুলো ক্রমশঃ ছোট হয়ে আসছে। এ জঙ্গলে দেওদার পাইনের দেখা মেলে না। কোথাও কোন বোর্ড নেই। ঠিক পথে চলছি কিনা, কতদূর এলাম, কতদূর যেতেই বা হবে কিছুই বোঝার কোনও উপায় নেই। একেবারে যাকে বলে হারা উদ্দেশ্যে পথ চলা। চলতে চলতে কোথাও রাস্তায় বোল্ডার পেতে সিঁড়ির ধাপ করে রাখা হয়েছে। 

 
মনে হয় বোধহয় এই কটা ধাপ উঠলেই সিঁড়ি ভাঙার শেষ। কিছুদূর ওঠার পর রাস্তা যায় বেঁকে, বদলে যায় জঙ্গলের রূপ। হঠাৎ গাছের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারে বরফের চাদরে ঢাকা ধৌলাধার পর্বতমালার একটা টুকরো। বাদামী মেঠো রাস্তা, তার পাশে ঘন সবুজ জঙ্গল, ফাঁকে ফাঁকে দুধসাদা বরফের পাহাড়চুড়া আর তার মাথায় ঘননীল আকাশ। সবটা মিলিয়ে যেন ক্যালেন্ডারের একটা পাতা। চোখ জোড়ানো সৌন্দর্য।” 
 

 
"সে না হয় হল। তা এর মধ্যে লজেন্স কোথা থেকে এল বললে না তো!"
 "আরে বলছি তো একটু অপেক্ষা কর। রাস্তার এমন অসাধারণ শোভা দেখতে দেখতে আমি তো এগিয়ে চলেছি। মাঝে মাঝে কয়েকটা ছোট ছোট অস্থায়ী ক্যাম্প চোখে পড়ছে। চেয়ার টেবিল সবই সাজানো আছে, কিন্তু কোন মানুষ নেই। ঝাউ গাছের ছায়ায় ছোট ছোট বিশ্রাম নেওয়ার জায়গা করে রাখা আছে। পাহাড়ি পথ চলার এ এক আনন্দ। চড়তে চড়তে যখন ক্লান্ত লাগে, দুদন্ড ছায়ায় বসলেই আবার চাঙ্গা। এরকম ভাবে বেশ কয়েকটা ক্যাম্প ছেড়ে আসার পর এলো ৩৬০ ডিগ্রী নামের একটা বেশ বড় ক্যাম্প। ঠিক এই ক্যাম্পটার সামনে এসেই চলার রাস্তা টা দুভাগ হয়ে গেছে। একটা চলে গেছে নীচের দিকে, অন্যটা উপরের দিকে। কোনটা যে গন্ত্যব্যে পৌঁছনোর সঠিক রাস্তা তা বোঝার কোন উপায় নেই, জিগ্যেস করার জন্য পথে আর একটি মনিষ্যিও নেই। পুরো ধাঁধায় পড়ে গেলাম। এইরকম নির্জন জঙ্গলে পথা হারালে দুর্গতির সীমা থাকবে না। কি যে করি!"
 "ব্যস গেলে তো হারিয়ে! সব গল্প খতম।"
 "অত সোজা নাকি। এতটা রাস্তা এগিয়ে গিয়ে ফিরে আসা যায়! রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করলাম। দেখলাম নীচের দিকে যে রাস্তাটা চলে গেছে সেটাতে পাতা ছাড়া আর কিছু পড়ে নেই। বুঝলাম ওটা স্থানীয় গ্রামবাসীর গ্রামে যাওয়ার রাস্তা। অন্য রাস্তাতে লজেন্সের কাগজ, চুইংগামের খোল, প্লাস্টিকের বোতল এ সব ছড়িয়ে আছে। বুঝলাম পাহাড়ে চড়তে আসা হিরোর দল এই পথ দিয়েই গেছে লেকের দিকে। যেতে যেতে নির্বিচারে নোংরা করে গেছে রাস্তাটাকে। এ পথিক তো আর ফিরে আসবে না! এই ভাবে লজেন্সের কাগজ আমাকে এ যাত্রা হারিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে দিল।" 
"তুমি হয়তো বেঁচে গেলে, কিন্তু আমাদের বন্ধুদের কত বিপদ বলো। খাবার ভেবে এইসব ছাইভস্ম খেয়ে ফেললে বেচারা বেঘোরে প্রাণ হারাবে।"- মন খারাপ করে বলে উঠল দোয়েলটা। 
"একদম ঠিক কথা বলেছ। কিন্তু কে আর এই সত্যি টা বুঝছে বলো! চলতে চলতে আমি বেশ অনেকটা উঠে এসেছি। প্রায় ঘন্টা দেড়েক ধরে একনাগাড়ে হেঁটে চলেছি। কখনো চড়াই, কখনো উতরাই। এতক্ষণে একজন ভদ্রলোককে নেমে আসতে দেখলাম। জিগ্যেস করলাম আর কত পথ বাকি। উনি বললেন আর মিনিট কুড়ি লাগবে। ধড়ে প্রাণ এলো। আমি তাহলে গন্তব্যের প্রায় কাছাকাছি। শেষ ক্যাম্পটাতে দুজন স্থানীয় মানুষের দেখা মিলল। তাঁরা দেখিয়ে দিলেন লেকের পথ। পথের বাঁকে এসে রাস্তা টা সোজা নেমে গেছে ঢাল হয়ে। একটা নালা পার হয়ে আবার উঠতে হল অপর পারে। এরপরেই একটা মাঠের মত গোল জায়গা। বেশ কয়েকটি দোকান পাট রয়েছে সেখানে। তার মধ্যে এক দোকানের দোকানী পার্বতী ভার্মা। আমাকে জানিয়ে দিলেন পৌঁছেই গিয়েছি আমি। ঠিক যেখানে মাঠটা শেষ হল, সেখান থেকেই নেমে গিয়েছে বেশ কয়েকটা সিঁড়ি। কয়েকধাপ নামার পরেই দেখতে পেলাম লম্বা গাছের সারি দিয়ে ঘেরা লেকটা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বেশ অনেকটা নষ্ট করে দিয়েছে মানুষের তৈরী সবুজ রঙের বেড়া। কিন্তু স্থির সবুজ জলে চারিদিকের গাছের ছায়া বেশ মোহময়ী করে তুলেছে ১০৪৯৬ ফুট উচ্চতায় ধ্যানস্থ প্রকৃতির এই একখন্ড জলরাশিকে।"
 

   
            তানের সমস্ত শ্রোতার দল মুগ্ধ হয়ে শুনছে প্রকৃতির কোণায় লুকিয়ে থাকা এই রোমাঞ্চকর জায়গার কথা।   "লেকটির ঠিক বাঁ পাশে একটু উঁচুতে রয়েছে একটি মন্দির। হিমাচল প্রদেশের মন্দিরের মত কাঠের কাজ এই মন্দিরে না থাকলেও এই মন্দিরের প্রাচীনত্ব সম্পর্কে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। এই মন্দিরে পূজিত হন বুড়ি নাগিন। অবয়বের নিরিখে তিনি কালীরই রূপ। কিন্তু এই বুড়ি নাগিনকে ঘিরে রয়েছে বিচিত্র লোকগাথা। তার কয়েকটি মুখে মুখে চলে আসছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। সমগ্র হিমাচল প্রদেশে নাগদেবতার আরাধনা হয় বিভিন্ন মন্দিরে। এই লোকগাথা সেই প্রাদেশিক সংস্কৃতির একটি অঙ্গবিশেষ। কেউ বলেন বুড়ি নাগিন কোন এক সময় জঙ্গলের পথে চলতে চলতে পৌঁছে যান এই অঞ্চলে। তাঁর কাঁধে ছিল অনেক বাসনপত্র। তিনি যখন এই অঞ্চলে পৌঁছোন, তখন সেখানে একদল বালিকা খেলা করছিল। বুড়ি নাগিন এই অঞ্চলে বাস করবেন বলে মনস্থ করেন। কিন্তু ওই বালিকার দল তাদের জায়গা ছাড়তে নারাজ। অবশেষে স্থির হল দুপক্ষকেই খেলায় অংশ নিতে হবে। যে পক্ষ জিতবে সেই পক্ষের দখলে যাবে এই অঞ্চল। বালিকাদের ধারণা ছিল বুড়ি নাগিনের বয়স হয়েছে, খেলায় জেতা তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে না। কিন্তু তাদের সমস্ত ধারণা ভুল প্রমাণ করে খেলায় জিতে অঞ্চলের দখল নেন বুড়ি নাগিন। কাঁধ থেকে নামিয়ে রাখেন বাসনপত্র। আর সেই বাসনপত্রের ভারে পাথুরে মাটি বসে গিয়ে তৈরী হয় আজকের সিরোলসর লেক। বিশ্বাস অবিশ্বাসের কথা আলাদা, কিন্তু এ ধরণের লোকগাথা আর প্রকৃতি সাধনার এইরকম হাজারো উদাহরণ ছড়িয়ে আছে আমাদের দেশের আনাচে কানাচে। 
                  অন্য একটি প্রচলিত লোকগাথা বলে বুড়ি নাগিন আসলে শেষনাগ, কমরুনাগ, ঘুন্ডানাগ, মাহুনাগ অর্থাৎ হিমাচলে উপাসিত সমস্ত নাগদেবতার মা। এই সিরোলসর লেকের জলের নীচে রয়েছে তাঁর স্ব্বর্ণখচিত প্রাসাদ। এই পাহাড়ের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে কোন এক ব্রাহ্মণ এই হ্রদের কাছে এসে পড়েন এবং এর জলে ডুবে যান। সেই সময় বুড়ি নাগিন তাকে বাঁচান এবং নিজের প্রাসাদে নিয়ে গিয়ে রাখেন। বেশ কিছুদিন পর ব্রাহ্মণ নিজের পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে বুড়ি নাগিন তাকে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেন একটা শর্তে। ব্রাহ্মণ কোন অবস্থাতেই কাউকে বুড়ি নাগিনের কথা বলতে পারবেন না। ব্রাহ্মণ রাজি হন। পরিবারের লোকেরা ব্রাহ্মণের জীবিত থাকার আশা তো প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন, স্বাভাবিক ভাবেই তাঁকে ফিরে পেয়ে তাদের আনন্দ আর ধরে না। বেশ কিছুদিন পরে পরিবারের সদস্যরা জানতে চায় তাঁর বেঁচে ফেরার কাহিনী। অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই তাদের নিরস্ত করতে পারেননা ব্রাহ্মণ। অবশেষে নাছোড়বান্দা পরিবারের সকলকে বলে ফেলেন বুড়ি নাগিনের কথা। আর এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই ব্রাহ্মণের মৃত্যু হয়। বুড়ি নাগিন অত্যন্ত সম্ভ্রমের সঙ্গে পূজিত হন এই সিরোলসর অঞ্চলে। পার্শ্ববর্তী খান্নাগ গ্রামের সমস্ত বাসিন্দা এই হ্রদকে অত্যন্ত পবিত্র বলে মানেন এবং এই হ্রদের জলের রোগ নিবারণ ক্ষমতা আছে বলেও বিশ্বাস করেন। বুড়ি নাগিন ভক্তদের সমস্ত মনোবাসনা পূর্ণ করেন এমনটাই স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস"। 
 বাঁশপাতির খুব কৌতুহল। "তুমি পুজো করলে ওই মন্দিরে?"
 "না। দূর থেকে শ্রদ্ধা জানালাম। শিবশম্ভুর কাছে নিবেদন জানালাম তিনি যেন স্বমহিমায় এই পবিত্র ক্ষেত্রকে সুরক্ষিত রাখেন। কয়েকটা ছবি তুলে ফেরার রাস্তা ধরলাম। ছুটিটা কতক্ষণ একা একা বসে আছে। দুশ্চিন্তা করছে হয়তো। ফেরার রাস্তাটা চলতে একটু বেশি সময় লাগছে। বেশ কয়েকবার বসলাম। গলাও শুকিয়ে যাচ্ছে বারবার। পা চালিয়ে নামার চেষ্টা করছি। আকাশের মুখটা কেমন ভার। এখানে যদি বৃষ্টি নামে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভেজা ছাড়া কিছু করার নেই। আমি যখন নামছি তখন বেশ কয়েকদল যাত্রী উপরে উঠছে। কয়েকটি বাচ্চা লাফাতে লাফাতে চলেছে। পাহাড়ের প্রতি কেমন তাচ্ছিল্যের মনোভাব। বেশ অনেকটা পথ নেমে এসেছি জালোরি পাসের দিকে। এবার মনটা ছুটির জন্য ছটফট করছে। কি জানি কি করল এতটা সময়। একেবারে এসেই পড়েছি। কোন দিকে না তাকিয়ে সোজা যাব মন্দিরের কাছে যেখানে ছুটিকে ছেড়ে এসেছিলাম। হঠাৎ কে যেন ডেকে উঠল - এইই! দেখি বেশ খানিকটা এগিয়ে এসে একটা দোকানে বসে আছে ছুটি। শনশন ঠান্ডা হাওয়া বইছে। আহা! এই ঠান্ডায় বসে থাকতে বেচারার কত কষ্টই না হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতির এমন মনোরম শোভা খুব কাছ থেকে দেখার লোভ কি সামলানো যায়! তাই গাড়িতে না বসে প্রকৃতির কোলেই এতটা সময় কাটিয়ে দিয়েছে ছুটি। আর থেকে থেকে তাকিয়েছে সেই পথটার দিকে যেখান দিয়ে আমি ফিরে আসব।"
 "ছুটি কি ভালো বন্ধু গো তোমার! কেমন অপেক্ষা করে বসেছিল তোমার জন্য!"
 "হ্যাঁ। ঠিক যেমন তোমার মিনসে তোমার জন্য বাসায় বসে থাকে।" 
"উঁহ। ছাই থাকে। যাকগে বলো তারপর ফিরে এলে?"
 "ওই দোকানের ভদ্রলোক খন্নাগের বাসিন্দা। হিমাচলী সুপুরুষ। লম্বা কোট পরে সামলাচ্ছেন ওই হাওয়ার মুখে সাজানো দোকান। পরম যত্নে আমাদের খাওয়ালেন হিমাচলের খাবার সিড্ডু, সঙ্গে গরম গাওয়া ঘি এর টাকনা, বেশ লাগল খেতে। কয়েক মিটার হেঁটেই আমরা পৌঁছে গেলাম গাড়ির গাছে। ইচ্ছুভাই অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। একটা স্থানীয় দোকানে ঢুকে খাব ঠিক করলাম আমরা। আসল উদ্দেশ্য স্থানীয় মানুষের সাথে একটু কথাবার্তা বলা। কিন্তু আকাশটা ক্রমশ: ভারী হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি নামবে। আমরা শোজায় ফেরার রাস্তা ধরলাম"।
 "কি ভালো! ফিরে এসে টেনে ঘুম দিলে বলো?"
 "ঘুম কি গো। ঘরে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। তুমুল বৃষ্টিতে চারিদিক সাদা। অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে সমস্ত পাহাড়, জঙ্গল, রাস্তা। জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম সাদা সাবুদানার মত বরফ ভর্তি হয়ে গিয়েছে সামনের বাগানটায়। কি যে সুন্দর দেখাচ্ছে চারদিকটা। হঠাৎ একটা আলোর ঝলকানি দেখতে পেলাম। কান ফাটানো আওয়াজ করে বাজ পড়ল। ব্যস মুহুর্তের মধ্যে চারিদিক অন্ধকার। পাহাড়ে বিদ্যুৎবিভ্রাট মানে সে যে কবে ঠিক হবে তা কেউ জানে না। হাঁদারামকে বলা হল মোমবাতি আনতে সে গেল তো গেলই। অন্ধকারে ভুতের মত বসে আছি আমি আর ছুটি। বেশ লাগছিল দুজনে ঠান্ডায় গুটিসুটি মেরে বসে থাকতে। চারদিক ঘুরঘুট্টি অন্ধকার, মাঝে মাঝে এক একটা গাড়ির হেডলাইট দেখা যাচ্ছে আর মনে হচ্ছে এই বুঝি কারেন্ট এল। রাতের খাবারের সাথে প্রায় মোমবাতি এল। অন্ধকারে কি যে খেলাম কিছুই বোঝা গেল না। শুধু এটা বোঝা যাচ্ছিল যে বৃষ্টি থেমেছে। নীচে জিভির বাড়ির আলোগুলো তারার মত চকমক করছে, যেন ব্যঙ্গ করছে আমাদের ওই অন্ধকার শোজাকে।" 
"এই তোরা সবাই মিলে এখানে কিসের মিটিং করছিস রে! আবার কার কি সমস্যা হল?" হইচই করতে করতে একদল ছাতারে উড়ে এল। এক মুহুর্তে শান্ত সভা হয়ে উঠল হট্টমেলা। 
ফিঙে যথেষ্ট বিরক্ত- "তোরা যেখানেই যাবি গোল বাঁধাবি। শোন না চুপ করে তান কেমন অন্য এক দুনিয়ার গল্প বলছে। একদম অন্যরকম সব কিছু। বলো না তান" 
"ঘুম ভাঙতেই চারিদিকে আলো ঝলমলে একটা মিষ্টি সকাল। চা এর সন্ধানে বেরোন হল রাস্তায়। এক মহিলার মনোহারি দোকানের পাশেই ছোট্ট খাওয়ার জায়গা। চা অর্ডার করে ঢুকলাম। সামনে আদিগন্ত পাহাড় রোদের রোশনাইতে ঝলমল করছে। যতদূর দেখা যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। আর আকাশের যে সীমানায় গিয়ে দৃষ্টি আটকে যায় সেখানে দু'হাত ছড়িয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ধৌলাধার পর্বতশ্রেণী।

ছুটি বলল ওই বাড়িটায় আর থাকব না। এই বাড়িটায় থাকলে কেমন হয়? যেমন ভাবা তেমন কাজ। দশ মিনিটের মধ্যে ব্যাগপত্র গুছিয়ে আমরা বদলে নিলাম আমাদের ঠিকানা। ফিরগুণ থেকে কিরণ হোমস্টে। গোপী ঠাকুর আর তার স্ত্রী অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে চালায় এই হোমস্টে। যেমন ঝকঝকে পরিষ্কার ঘর, তেমনি ঘর থেকে দেখা পাহাড়ের অনবদ্য দৃশ্য। ছুটির খুশি আর ধরে না। সারাটা দিন কাঠের বাড়িটার বারান্দায় বসে তাকিয়ে রইলাম পাহাড়গুলোর দিকে। কিছুক্ষণ বাদে বাদেই বদলে যাচ্ছে পাহাড়গুলোর রঙ, নীচের দিকের একটা বাড়িতে কি যেন অনুষ্ঠান হচ্ছে। পায়ে পায়ে নেমে যাচ্ছে গ্রামের লোকজন। কিন্তু কোন শোরগোল নেই, এতটুকু বিঘ্নিত হয় না পাহাড়ের শান্তি। একটা গাড়ি নিয়ে আমরা গেলাম জিভি ঘুরতে। গোটা পথটা দেওদারের ঘন জঙ্গল। দিনের বেলাতেও প্রায় অন্ধকার। চারিদিকে কেমন যেন রহস্যের গন্ধ। আমাদের গাড়ির শব্দ ছাড়া আর কোন আওয়াজ নেই কোথাও। জোরে কথা বলতেও যেন খারাপ লাগে। মনে হয় প্রকৃতির উপর অবিচার করছি। মাত্র কিলোমটার ছয়েক। পৌঁছে গেলাম জিভি ঝর্নায়। গাড়ি থেকে নেমেই দেখা হয়ে গেল লম্বা লেজওয়ালা এক ম্যাগপাই এর সঙ্গে। কি তার রূপ। 
 

 
ঝর্ণার স্রোতটাকে পাথর দিয়ে বেঁধে কিছুটা কৃত্রিম করে ফেললেও ঝর্ণা পর্যন্ত পৌঁছানোর রাস্তাটা এতটুকু হারায়নি তার নিজস্বতা। স্যাঁতস্যাঁতে পাথরের গায়ে ফার্ণের আলপনা। কত যে বিচিত্র তার ধরণ। প্রকৃতির নিখুঁত চিত্রকলা। কয়েক পা হেঁটেই পৌঁছে গেলাম জিভি ঝর্ণা। কিছু সময় মোহিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম ওই অবিরাম পড়তে থাকা জলধারার দিকে। যেন ধ্যানমগন মহাযোগীর মাথায় প্রকৃতির অনন্ত বর্ষণ। ছুটির আনন্দ আর বাঁধ মানে না। আপনমনে গেয়ে ওঠে - হাঁ রে রে রে রে রে আমায় ছেড়ে দে রে দে রে। ছুটির অসামান্য সুরেলা কন্ঠ আর ঝর্ণার কলতান দু’য়ে মিলে এক মহাজাগতিক পরিবেশের সাক্ষী হয়ে রইলাম আমি। 
“তুমি গান গাইলে না?” 
“ধুর কি যে বলো! ছুটি গান গাইলে আমি গান গাইবার চেষ্টাই করি না। আমি শুধু অনুভব করলাম কত সৌভাগ্য আমার।
 
 
শোজা থেকে জিভির দূরত্ব কম হলেও উচ্চতার ফারাক প্রায় তিনহাজার ফুট। ফলে দুটি জায়গার প্রাকৃতিক দৃশ্যের বিস্তর ফারাক। জিভির বুক চিরেই বয়ে চলেছে পুষ্পভদ্রা। ঘন জঙ্গলের মধ্যে পাহাড়ের কোলে সাজানো গোছানো সুন্দর গ্রাম জিভি। অতিথিদের জন্য সাজানো আছে হাজারো পসরা। স্থানীয় ফল থেকে তৈরী বিভিন্ন স্বাদের ওয়াইন সাজিয়ে বসে আছে একের পর এক দোকানী। নিজের ছোট দোকানে একমনে সোয়েটার বুনে চলেছে রোমা ভার্মা। মুখের মিষ্টি হাসি আর আন্তরিক আলিঙ্গন শহুরে কেতাদুরস্ত উচ্চশিক্ষিত সেলসগার্লের থেকে অনেক বেশি আকর্ষণীয়। মনের কোণায় কোথায় যেন দাগ কেটে যায়, মনে হয় ক্যামেরায় বন্দি করে রাখি মেয়েটাকে। 
 
 “শুধু ছবি তুললে! কিছু কিনলে না ওর কাছ থেকে?” ঝাঁঝিয়ে উঠল এক ছাতারে
 “কিনলাম তো। ছুটির জ্বালায় না কিনে পালানোর জো আছে! কিনেই পরেও ফেললাম সোয়েটারখানা। বরফে ঢেকে যাওয়ার সময় হল গ্রামটার। তোড়জোড় চলছে বেশ কিছুদিনের বেঁচে থাকার রসদ গুছিয়ে রাখার। ছবির মত সুন্দর গ্রাম আর শিশুর মত সরল মানুষগুলোর সাথে বেশ কিছু সময় কাটিয়ে ফিরে এলাম শোজায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝুপ করে নামল অন্ধকার। রীতিমতো বুকের পাটা নিয়ে সারা সন্ধ্যেটা ছুটির সাথে অন্ত্যাক্ষরী খেলে কাটিয়ে দিলাম। রাতে যখন নীচে নামলাম কৃষ্ণপক্ষের আকাশে চাঁদ একটু নরম হয়েছে। আকাশে ঝকঝক করছে একদল তারা। একদিকে ধ্রুবতারা আর একদিকে সন্ধ্যাতারা যেন পরস্পরের দিকে তাকিয়ে আছে চিরবিরহী যুগলের মত। দুজনের মধ্যে দূরত্ব লক্ষ যোজন কিন্তু কেউ কারো থেকে চোখ ফেরায় না। ভোর না হতেই ঘুম ভেঙেছে। কত আর ঘুমোব? ধৌলাধারের আকাশে শুরু হয়েছে হোলিখেলা। প্রথমে হালকা লাল, তারপর সোনালি, তারপর গোলাপী আর সবশেষে সত্যিকারের নীল আকাশ। যে নীলের কোন তুলনা হয় না। একেবারে নিষ্কলঙ্ক, নির্মল, অভ্রনীল। সমস্ত পর্বতশ্রেনী যেন আড়মোড়া ভাঙছে তার মায়ের আদরের স্পর্শ নিয়ে।” 
 
 
 
“ভোরের আলোয় আমরাও এরকমভাবেই জাগি। কিন্তু আমাদের জাগা এত যত্ন করে কেউ দেখেনা। যাক গে বলো তোমার কথা।” 
“আমাদের বেড়ানো শেষ। রাতে অট থেকে ধরব দিল্লী ফেরার বাস। কিন্তু গোটা দিনটা চেটেপুটে নেব তীর্থন নদীর আনন্দ। গাড়ি ধরে সোজা তীর্থন উপত্যকা। কি অপূর্ব চঞ্চলা নদী এই তীর্থন। নদীখাতের দুধারে ঘন সবুজ পাহাড় আর তার বুকে স্থানীয় মানুষের ধাপ চাষ। আর মাঝে মাঝেই কলাবৌ এর মত ঢাকা দেওয়া গাছগুলো। নদীর স্রোতটা যেন তালে তালে ছুটে চলেছে পাথরে ধাক্কা খেতে খেতে - ছম ছম ছম। ধারে ধারে নয়নাভিরাম হোমস্টে আর কাফে। কোথাও রোদ পড়ে চকচক করছে নীল জলের ধারা আর একটু ছায়া পেলেই রঙ বদলে তার মুখ ভার। 
 
 
 
 
ফলের দোকানে দেখা মিলল এক অশীতিপর আপ্পীর। আমাদের হামলে পড়ে আপেল কেনা দেখে এগিয়ে এলেন। হাতে তুলে নিলেন বড় টমাটোর মত দেখতে একটা ফল। নাম একটা বললেন, ভাঙাচোরা উচ্চারণে মনে হল জোবানি। বললেন এ অঞ্চলে আপেলের থেকে বেশি এর ফলন আর খেতে নাকি আপেলের যেয়ে ঢের ভালো। শুধুমাত্র এই বয়স্ক মানুষটার অনুরোধ রাখতেই কিনে ফেললাম দুখানা। একটা কাফের পাশ দিয়ে নদী পর্যন্ত চলে এসেছি দুজনে। তীর্থনের কাঁচের মত জলের নীচে দেখা যাচ্ছে ছোটবড় হাজারো নুড়ি যারা না জানি কত যুগ ধরে ধন্য হয়ে আসছে এই পবিত্র জলধারার পূণ্য স্পর্শসুখে। একদম সামনে এসে দেখা মিলল একটা ঘোমটা পড়া গাছের। ওমা এ তো আপেল নয়! এ যে অন্য ফল। ওই জোবানি। না আসলে এই ফলকে ওরা বলে জাপানী ফল। পারসিমোন - জাপানের জাতীয় ফল। সম্প্রতি হিমাচলের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এই ফলের চাষ হয় রমরমিয়ে। পরিপক্ক ফলকে তোমাদের হাত থেকে বাঁচাতে অমন ঘোমটা পরিয়ে রাখা হয়।” “ কি জ্বালা বল! শুধু তোমরা খাবে! আমরা খাবো না! এ কিন্তু ভারি অন্যায়।” 
“অন্যায় তো বটেই। অর্থ আর বৈভবের পিছনে ছুটতে ছুটতে এমন হাজারো অন্যায় নিরন্তর করে চলেছে মানুষ। আর পরম সহনশীল প্রকৃতি সহ্য করে যাচ্ছে সমস্ত অন্যায়। অপেক্ষা করছে সহ্যের সীমা ছাড়ানোর। প্রকৃতি নিরন্তর নিজেকে নি:শেষ করে তার সন্তানদের হাতে তুলে দিচ্ছে স্বাচ্ছন্দের পসরা। প্রত্যন্ত পাহাড়ের মানুষ এখন আবহাওয়ার খবর নেওয়ার জন্য ইন্টারনেটে চোখ রাখে। পাহাড়ের বিদ্যুৎবিভ্রাট এখন আর একদিনের বেশি স্থায়ী হয় না। বাতিস্তম্ভের আলোয় এখন তারারা মুখ লুকায়। অশীতিপর আপ্পি এখন দেশের ফসল ছেড়ে বিদেশের ফলের তরফদারি করেন। কিন্তু তবু কোন অমোঘ টানে একটু কাজের ফাঁক পেলেই আমরা ছুটে যাই একটু নির্জনতার সন্ধানে, প্রকৃতির ঘনসবুজ গালিচায় দুদন্ড জিরিয়ে নিতে আর তোমরা তাকিয়ে থাকো আমাদের বন্ধ জানলাগুলোর দিকে।"

Tuesday, 11 January 2022

নীলগিরি পঞ্চলিঙ্গেশ্বর

              অতিমারীর জেরে বেশ কিছুদিন শৈবক্ষেত্র দর্শণে ভাটা পড়েছে। দু একবার চেষ্টা করে বিফলও হতে হয়েছে। এবারেও নানা বাধা বিপত্তির মেঘ ঘনাচ্ছিল কিন্তু গর্জন বা বর্ষণ কোনটাই বিশেষ করে উঠতে পারেনি। পরিকল্পনা থাকলেও দীর্ঘদিন পর বাস্তব হল পঞ্চলিঙ্গেশ্বর দেখার স্বপ্ন। 

           কলকাতা থেকে জাতীয় সড়ক ধরে বালেশ্বর, তারপর সেখান থেকে পঞ্চলিঙ্গেশ্বর যাওয়ার জন্য রাজ্য সড়ক ধরতে হবে। রাস্তার এরকম নিশানা সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়া গেল। জাতীর সড়কে রাস্তার নিশানা বেশির ভাগ জায়গায় থাকলেও খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতেই থাকে না।  একটা মাকড়সার মত রাস্তা, যার আটটা আট দিকে গেছে। তার কোনটা যে বালাসোর যাবে, তার কোন নিশানা খুঁঁজে পাওয়া যায় না।  যারা সড়কপথে লম্বা রাস্তা সফর করেন, এরকম অভিজ্ঞতা তাদের হামেশাই হয়ে থাকে। অগত্যা দোকানের সাইনবোর্ড, পথচলতি বাইক বা সাইকেলবাবু ই ভরসা। আর যদি সফরের সময় রাজ্যের পরিবর্তন হয়, তাহলে সমস্যাটা আর একটু গুরুতর হয়ে পড়ে। দোকানের সাইনবোর্ডগুলোর অক্ষর ক্রমশঃ অচেনা হয়ে যাওয়ায় তা পড়ে উদ্ধার করা যায় না। একমুখ পান বা গুটখা ঠেসে পথচলতি বাইক বা সাইকেলবাবু যদি অপরিচিত ভাষায় কথা বলেন, তাও খুব একটা বোধগম্য হয় না। আর এক অভিনব আধুনিক উপায় GPS - Global Positioning System। বেশ কয়েকবার এই সিস্টেম এর উপর নির্ভর করার পর এই ব্যবস্থার এক নতুন নামকরণ করার কথা মনে হয়েছে। GPS - ঘূর্ণিপাকের সন্ধানে। যা হোক পাঁচমিশেলি সবরকম উপায়ের সাহায্যে অবশেষে সন্ধান মিলল গন্তব্যে পৌঁঁছনোর রাস্তার। বাংলা আর ওড়িয়া মিলিয়ে মিষ্টিসুরের এক ভাষায় পথচারীরা সন্ধান দিলেন নীলোগিরি পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের।

           একই নামের একাধিক জায়গা ভারতবর্ষে অগুণতি আছে।  উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূব থেকে পশ্চিম এমন উদাহরণ প্রচুর পাওয়া যায়। নীলগিরি এমনই এক নাম। পশ্চিমঘাট পর্বতমালার অন্যতম প্রসিদ্ধ স্থান। কিন্তু একটু কান করে যদি স্থানীয় মানুষের উচ্চারণ শোনা যায়, তাহলে তার ভৌগলিক অবস্থান ঠাহর করা খুব কঠিন হয় না। দক্ষিণ ভারত ঘেঁষা পশ্চিমঘাট পর্বতমালার নীলগিরি  স্থানীয় মানুষের কাছে - নী লা গি রি। এই উচ্চারণে স্পষ্ট দক্ষিণী ভাষার প্রভাব। আমি যে নীলগিরির কথা বলছি তার অবস্থান পশ্চিমবঙ্গের প্রতিবেশী রাজ্যে এবং কেমন যেন একটু বাংলা ভাষার মিশেল দিয়ে এর উচ্চারণ হয় - নী লো গি রি। 

             জাতীয় সড়ক ছেড়ে উড়িষ্যা রাজ্য সড়ক ধরে এগোতেই সমস্ত দৃশ্যটা বদলে গেল।। পিচ ঢালা রাস্তার দুধারের ইউক্যালিপটাস গাছগুলো যেন একটানা একটা সামিয়ানা তৈরী করেছে।  ফাঁক দিয়ে দেখতে পাওয়া আকাশ আর গাছের সারি যেন মহামহিমের অতিকায় ক্যানভাস। রাস্তার দুধারে ফসলের ক্ষেতে কোথাও কোথাও লাগেনি কাস্তের ছোঁয়া। জন্মভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগের মুহূর্তে ফসলের সম্ভার যেন মায়ের আদর খাচ্ছে প্রাণভরে। মাঝেমাঝেই পথচলতি মানুষকে জিজ্ঞাসা করতে করতে যেতে হচ্ছে পাছে রাস্তা হারাতে হয়। যাকেই জিজ্ঞাসা করা হয় তিনি পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের আগে নীলোগিরির উল্লেখ করেন। বোঝা যায় পর্যটকের কাছে পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের গুরুত্ব যাই হোক না কেন স্থানীয় মানুষের কাছে নীলোগিরি অনেক বেশি গুরুত্ব পায়। 

                   এ নীলোগিরি কোন পর্বতমালা নয়। মালভূমি  অঞ্চলে বিস্তৃত টিলার সারি। অতিকায় গোলাকৃতি বোল্ডার একের উপর এক যেন মাপ করে সাজানো। নীলোগিরি উড়িষ্যার বালেশ্বর জেলার অন্তর্ভুক্ত একটি মফস্বল শহর। এই জনপদের অধিবাসীর সংখ্যা সাকুল্যে হাজার পনেরো।  কিন্তু  শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা আমাদের দেশের জাতীয় গড়ের তুলনায় বেশি। এই জনপদের প্রসিদ্ধি প্রত্নপ্রস্তর যুগ থেকে। পরবর্তীকালে বৈদিক যুগের ইতিহাসে এবং রামায়ণে এই জনপদের বিশেষ উল্লেখ পাওয়া যায়। স্বাধীনতা উত্তর ভারতীয় ইতিহাসেও এই জনপদ বিশেষ ভাবে নিজের স্থান করে নেয়। বিংশ শতাব্দীতে গণজাগরণের বিভিন্ন পর্য্যায়ে এই জনপদের মানুষদের ভূমিকা বার বার ইতিহাস রচনা করেছে। কৃষক সম্প্রদায় বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় অত্যাচারী রাজার বিরূদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠেছেন কিন্তু তাদের সেই প্রতিবাদ নির্বিচারে দমন করা হয়েছে নৃশংসভাবে। অবশেষে এই নীলোগিরিই হয়ে ওঠে ভারতবর্ষের কৃষক আন্দোলনের পুণ্যজন্মভূমি। উড়িষ্যার স্বাধীনতা সংগ্রামী বলরাম রাজ, শ্যামসুন্দর পারিদা, কৈলাসচন্দ্র মোহান্তি, বনমালী দাস, বৈষ্ণব পট্টনায়েক, সতীশ চন্দ্র দাস, নন্দকিশোর পট্টনায়েক এবং আরও অনেকে স্থানীয় রাজার বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন করেন এবং তাকে ভারতের নবগঠিত জাতীয় সরকারের অন্তর্ভূক্ত হতে বাধ্য করেন। এই আন্দোলনই ছিল স্বাধীন ভারতবর্ষের প্রথম সংগঠিত কৃষক আন্দোলন এবং এই আন্দোলনের ফলস্বরূপ আরও ৫৭৬ টি স্থানীয় রাজার শাসিত অঞ্চল জাতীয় সরকারের অন্তর্ভূক্ত হয়। এরপর থেকেই ভারতের জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাসে নীলোগিরির নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে আর সেই গরিমার প্রকাশ যুগ যুগ ধরে পাওয়া যায় স্থানীয় মানুষের গর্বিত অনুভবের মধ্যে দিয়ে। 

                আবহমানকাল ধরে চলে আসা প্রকৃতি সাধনার অন্যতম নিদর্শণ পঞ্চলিঙ্গেশ্বর। পঞ্চলিঙ্গেশ্বরকে যদি প্রকৃতির নিজস্ব শিল্পকর্ম বলে ধরে নেওয়া যায়, সেটাই বোধহয় এই স্থানের সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত বর্নণা হবে। প্রবল বেগে বয়ে চলা একটি পাহাড়ি ঝর্ণার খুব সরু স্রোতের মুখে পাঁঁচটা শিবলিঙ্গের আকারের পাথর পঞ্চলিঙ্গেশ্বর হিসেবে পূজিত হন। পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের স্থাপনার সম্পর্কে বিভিন্নরকম লোককথা শোনা যায়। লোককথা অনুযায়ী রামায়ণে পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের উল্লেখ আছে এবং মনে করা হয় বনবাসে থাকাকালীন সীতা এই লিঙ্গগুলি স্থাপন করেন। অন্য আর এক লোককথা অনুযায়ী পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে বানাসুর এই স্বয়ম্ভু লিঙ্গের আরাধনা করেন।  স্থাপিতই হোন বা স্বয়ম্বূই হোন প্রাকৃতিক এই জলধারায় নিরন্তর অভিষিক্ত হন পঞ্চলিঙ্গেশ্বর। এই অভিষেক স্নানই এই স্থানের অন্যতম দ্রষ্টব্য। 

https://photos.app.goo.gl/YpRbZknx3MrF1SE98

                 বিগতদিনে যারা পঞ্চলিঙ্গেশ্বর দর্শণ করেছেন তাদের কাছে শুনেছি এই লিঙ্গগুলিকে ঝর্ণাধারার মধ্যে স্পর্শ করা যেত । বর্তমানে পর্যটকদের সেই স্পর্শসুখ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করার জন্য ঝর্ণায় যাওয়ার পথ লোহার গেট দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পঞ্চলিঙ্গেশ্বরে পাঁচ সংখ্যার বিশেষ গুরুত্ব আছে। লোহার গেট দিয়ে বন্ধ জায়গার সামনের চাতালে পাঁঁচজন পুরোহিত পাঁচটি লিঙ্গ নিয়ে বসে আছেন। ভক্তদের যার যেটায় ইচ্ছে অর্ঘ্য  চড়িয়ে যাচ্ছেন। 

 


একটু উঁচু চাতাল থেকে এই পঞ্চরঙ্গের দৃশ্য দেখছেন মহাদেবের অনুচর নন্দী । নন্দীর ঠিক পিছনেই পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের ভোগভান্ডার। সেখানে পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের পাঁচ রকম ভোগ পাওয়া যায়। পাঁচ রকম ভোগ আসলে পাঁচ রকম লাড্ডু। নারকোল আর চিনির লাড্ডু, নারকোল আর গুড়ের লাড্ডু, মিহিদানার লাড্ডু, বোঁঁদের লাড্ডু আর খই-গুড়ের লাড্ডু। প্রতি প্রকার ভোগের মূল্য পাঁচ টাকা, পাঁচরকম ভোগ একত্রে পঁচিশ টাকা। সব কিছুই পাঁচের প্যাঁচে। 

                 এই প্যাঁচটা একটু খুলতে ইচ্ছে করল। পাঁচরকম ভোগ দেওয়ার এই প্রথায় কেমন পাঁচ পৃথক অস্তিত্বের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। চাতালের একদম পিছনের দিকে একটি হনুমান মন্দির আছে। সেখানে ভক্তদের আনাগোনা বিশেষ নেই। হনুমান মন্দিরের পুরোহিত ভক্তের অভাবে বেজার মুখে বসে আছেন। আমাকে দেখে একটু খুশিই হয়েছিলেন বোধহয় কিন্তু বিড়ম্বনায় পড়ে গেলেন আমার প্যাঁচানো প্রশ্ন শুনে। ওনার উত্তর শুনে এটুকু বোঝা গেল পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের পাঁচটি লিঙ্গের আকার একরকম নয়।  কোনটা বেশ বড় আবার কোনটা একেবারেই গোল নুড়ির মত। হনুমান মন্দিরের পূজারী হলেও  লিঙ্গগুলি সীতামাতার প্রতিষ্ঠিত এইরকম কাহিনীতে তাঁর বিশেষ রুচি নেই। বরং তিনি বিশ্বাস করেন লিঙ্গগুলি স্বয়ম্ভু হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। পাঁচটা পৃথক লিঙ্গ সম্পর্কে ওনার ধারণা খুব পরিষ্কার নয় তবে আবহমান কাল ধরে পঞ্চলিঙ্গকে একই দেবতা বা পঞ্চলিঙ্গেশ্বর হিসেবেই অর্চনা করা হয় এবং তিনিও তাইই করে থাকেন। মন্দিরের চাতালে যেখানে পাঁচজন পুরোহিত পাঁচটি লিঙ্গের পূজো করছেন সেখানে কি মন্ত্র পড়া হচ্ছে একবার কান করে শোনার চেষ্টা করলাম। ভক্তবৃন্দের তান্ডব আর ফুল মালার ঠেলাঠেলিতে কিছু তেমন বোঝা গেল না। অগত্যা পাঁচের প্যাঁচ মাথায় নিয়েই পঞ্চলিঙ্গেশ্বর ক্ষেত্র থেকে নামার রাস্তা ধরে ফেললাম। পাহাড় কেটে তৈরী রাস্তায় সিঁড়ির ধাপ ঘুরে ঘুরে নেমে এসেছি বেশ খানিকটা। হালকা জঙ্গল ঘেরা রাস্তা। একটা গাছের নীচে ত্রিপল খাটিয়ে বসে আছেন একজন সাধুগোছের মানুষ। সামনে বিক্রীর জন্য রাখা কয়েকটি বই। বিশ্রাম নেওয়ার অছিলায় একটু বসলাম তাঁর পাশে। বই গুলো ওড়িয়া ভাষায় লেখা, আমার আয়ত্তের বাইরে। শুধু একটা জায়গায় চোখ আঁটকাল। পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের অর্চনামন্ত্র। আমার মনের সমস্ত প্যাঁচ খুলে দিল এই মন্ত্র। সংস্কৃত ভাষায় লেখা। এই মন্ত্র  অনেকটা পঞ্চভূত গায়ত্রী মন্ত্রের  মত।

ওম বসুন্ধরায় বিধমহি
তন্নো ভূমি প্রচোদয়াত 
ওম সর্বপ্রাণায় বিধমহি
তন্নো বায়ু প্রচোদয়াত
ওম আকাশায়চ বিধমহি
তন্নো গগনাং প্রচোদয়াত
ওম জল বিম্বায় বিধমহি
তন্নো বরুণা প্রচোদয়াত
ওম মহাজ্বালায় বিধমহি
তন্নো অগ্নি প্রচোদয়াত
ওম

                     পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের অর্চনা মন্ত্র থেকে এ কথা স্পষ্ট হয় এই ঈশ্বরের সাধনার মাধ্যমে ভক্ত আসলে সেই সৃষ্টিকর্তার প্রতিই ভক্তি অর্ঘ্য নিবেদন করেন, যিনি প্রকৃতির সৃষ্টির পাঁচটি উপাদান (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুত, ব্যোম) কে সুরক্ষিত রাখেন। এই নিবেদনই প্রকৃতি সাধনার গোড়ার কথা।
                              উপরে ওঠবার তাড়ায় চারিদিক ভালো করে লক্ষ্য করিনি। ধীরেসুস্থে ফেরার পথে দেখলাম সিঁড়ির ধাপ শেষ হতে না হতেই রাস্তার দুধারে পসরা সাজিয়ে বসেছেন অসংখ্য দোকানী। এরা প্রধানতঃ নীলোগিরি জনপদের বাসিন্দা। পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের দর্শণের উদ্দেশ্যে আসা অগণিত ভক্তই এদের জীবিকানির্বাহের একমাত্র মাধ্যম। দু'একজনের সাথে কথা বলে জানলাম কোন এক সময়ে যে জনপদ ছিল কৃষক আন্দোলনের আঁতুর ঘর, সেখানে চাষ আবাদ করা মানুষের সংখ্যা ক্রমশঃ কমছে। বৃদ্ধি পাওয়া শিক্ষার হার  কি তাহলে শিক্ষিত যুবকদের সাথে চাষের ক্ষেতের দূরত্ব কিছুটা বাড়িয়ে তুলেছে? যা হোক সঠিক পরিসংখ্যান ছাড়া এমন মন্তব্য করার কোন যুক্তি নেই।  ভক্ত আর ভগবান উভয়েরই কৃপাদৃষ্টি এদের উপর নিরন্তর পড়তে থাকুক। 
                             প্রকৃতির কোলে আত্মগোপন করে থাকা জগদীশ্বরের এই প্রতিনিধিদের আবিষ্কার করেছেন যিনি বা যারা, তারা নিঃসন্দেহে প্রকৃতি সাধক এবং প্রকৃতির মধ্যেই সন্ধান করেন তাদের ইষ্টদেবতার। তপোলব্ধ সেইসমস্ত সাধকের সাধনার কল্যাণে  প্রকৃতির এই লুকিয়ে থাকা বিস্ময় আজ ঈশ্বর কল্পনায় পূজিত হয়ে চলেছেন অগণিত দর্শণার্থীর মাধ্যমে। নিজের সৃষ্টির প্রতি ত্রিভুবণেশ্বরের অমোঘ প্রেম স্বর্গীয় তানে আবর্তিত হয়ে চলেছে যুগ যুগ ধরে। আর সেই তানের অনন্ত প্রবাহ বয়ে নিয়ে চলেছে মানুষ - ত্রিভুবণেশ্বরের প্রেমাস্পদ হয়ে-
 
                                               আমায় নইলে ত্রিভুবণেশ্বর তোমার প্রেম হত যে মিছে





          

Friday, 11 June 2021

পাল্টিস্তানি

                          যে কোন  দুই দেশের সীমান্ত আর সেই সীমান্তবর্তী মানুষের ইতিহাস  সবসময়েই বৈচিত্রে ভরা। আর সেই দুই দেশ যদি ভারত আর পাকিস্তান হয় তাহলে তো আর কথাই নেই। লাদাখ প্রদেশের সিয়াচেন হিমবাহ ভারত পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক সীমানা। এই সিয়াচেন ক্ষেত্রে প্রবেশ করার আগে কয়েকটি সীমান্তবর্তী গ্রাম আছে। যার মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে শেষের গ্রাম তুরতুক। নুব্রা উপত্যকার শিওক নদীর ধারে পাহাড় ঘেরা শান্ত গ্রাম। কেমন যেন রহস্য দিয়ে ঘেরা। ভৌগলিক অবস্থান অনুযায়ী তুরতুক  বাল্টিস্তানের অন্তর্গত যা পুরোপুরি পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণাধীন। এই অদ্ভুত টানাপোড়েনের সূচনা হয়, ১৯৪৭-৪৮ এ ইন্দো-পাক যুদ্ধের সময় থেকে। এই সময়ে পাকিস্তানের গিলগিট অঞ্চলের Gilgit Scouts বাল্টিস্তানের দগরা প্রশাসন কে উচ্ছেদ করে সমস্ত বাল্টিস্তান দখল করে। সেই সময় থেকে তুরতুক, পাকিস্তান সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। বাল্টিস্তা্‌ন, উত্তর কাশ্মীরের রাজাদের শাসন কালে ভারতের অন্তর্গত ছিল এবং এখানকার অধিবাসীরা বাল্টি বলেই পরিচিত ছিলেন। পাকিস্তানের দখলে যাওয়ার পর এই স্থান গিলগিট বাল্টিস্তান হিসাবে পরিচিত হয়। বাল্টিস্তানের মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মবিশ্বাস সবকিছুই পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশের মানুষদের থেকে একটু অন্যরকম। ১৯৭১ সালে আবার ইন্দো পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়। এই অঞ্চল টি site for Battle of Turtuk  হিসাবে চিহ্নিত হয়। ব্রিগেডিয়ার উদয় সিং এর নেতৃত্বে Ladakh scouts এবং Nubra guards  এর সেনাবাহিনী পাকিস্তানের সেনাবাহিনী কে বিতাড়িত করে তুরতুক গ্রাম  কে আবার ভারতীয় সেনার দখলে নিয়ে আসে। এই যুদ্ধের পর  বাল্টিক পাকিস্তান অঞ্চলের  চারটি গ্রাম - তুরতুক, তাকসি, চালুংখা আর ধোথাং  কে ভারতীয় সেনা পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে এবং গ্রাম গুলি ভারতভুমির অন্তর্ভুক্ত হয়। এই অসাধারণ সাফল্যের জন্য ব্রিগেডিয়ার উদয় সিং  এবং তাঁর  second in command মেজর চেওয়াং রিঞ্চেন কে মহাবীর চক্র সম্মানে ভূষিত করা হয়। ১৯৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধের সময় আবার পাকিস্তানের আতঙ্কবাদী সংগঠন এই গ্রাম গুলি দখল করার চেষ্টা করে, কিন্তু ভারতীয় সেনা বাহিনীর দক্ষতায় সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ২০১০ সাল পর্য্যন্ত তুরতুক সহ সমস্ত ভারতীয় গ্রাম গুলিতেই সেনাবাহিনী ছাড়া কারো প্রবেশাধিকার ছিল না। তবে ২০১০ সালে তুরতুক গ্রামটিকে পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়। 

                                                                                           তুরতুক থেকে শিওক নদীর উপত্যকা

                      তুরতুকের প্রতি পর্যটকরা যে কারণে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট হন তা আসলে খুব বিরল এক দৃশ্য। পর্যটকদের মধ্যে এই ধারণা আছে তুরতুক থেকে পৃথিবীর দ্বিতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ K2 বা গডউইন অস্টিন দেখতে পাওয়া যায়। কথাটা মিথ্যে না হলেও অর্ধসত্য বলা যেতে পারে। তুরতুক গ্রামের উপরের পাহাড় থেকে আকাশের সীমানায় এই শৃঙ্গ দেখা যায় বটে কিন্তু সাধারণ পর্যটক রা সেই জায়গা পর্য্যন্ত পৌঁছতে পারেন না।

                            তুরতুক গ্রামে পৌঁছনোর জন্য যে জায়গা অবধি গাড়ি যায়, তা একটা খরস্রোতা ঝর্ণার একদম ধারে। পায়ে চলা রাস্তায় খানিকটা এগিয়ে গেলেই ঝর্ণাটির উপর একটা লোহার ব্রিজ । আশপাশে কোন গ্রাম আছে বলে ধারণাই করা যায় না। ব্রিজ পার হয়ে অপর পারে গিয়ে উঠলাম একদম ঘন এক জঙ্গলের মধ্যে। জঙ্গলের বুক চিরে পাহাড়ী রাস্তা খানিকটা গিয়েই বেঁকে গিয়েছে। কেমন যেন নিষিদ্ধ অঞ্চলে চলে আসার মত অনুভুতি হচ্ছিল। একেই বোধহয় বলে সীমান্তবর্তী অঞ্চল। ঝর্ণার জলের বয়ে চলা আর পাখির ডাক ছাড়া কোন আওয়াজ নেই । পাহাড়ি পথে খানিকটা এগিয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ যেন দিগন্ত খুলে গেল।  গ্রামে ঢোকার রাস্তাটা কেমন যেন জঙ্গল দিয়ে আড়াল করা। গ্রামটিকে যেন সযত্নে প্রকৃতির কোলে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। চারিদিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা সবুজ একটা গ্রাম। সামনে প্রশস্ত বার্লি ক্ষেত। দূরে দূরে কয়েকটি বাড়ি যেন ঝুলনের মত সাজানো।

            
                সীমান্তের গ্রাম তুরতুকের বার্লি ক্ষেত

 দু'ধারে ক্ষেত আর মাঝখান দিয়ে চলেছে মেঠো রাস্তা। এঁকে বেঁকে গ্রামবাসীদের বাড়ির পাশ দিয়ে। তুরতুক গ্রামের অধিবাসী রা বাল্টি ভাষায় কথা বলে। এখনো মহিলারা বাইরের লোক দেখলে লজ্জায় মুখ ঢাকেন এবং বাড়ির ভিতর ঢুকে যান। যে কয়েকজন মহিলা সামনাসামনি আসেন তাদের দেখেই মনে হয় তারা  অত্যন্ত প্রাচীন এবং অভিজাত সম্প্রদায়ের মানুষ। গায়ের রঙ, শরীরের গড়ন সব কিছুর মধ্যেই যেন সেই প্রাচীনত্ব, আভিজাত্য প্রকাশ পায়।  পাহাড়ের এই রুক্ষ আবহাওয়া, তীক্ষ্ণ সূর্য্যের আলো কোন কিছুতেই যেন তাদের সোনার মত বর্ণে এতটুকু খাদ মেশাতে পারেনি।

                                                                                                 তুরতুক গ্রামের অধিবাসী

Silk route এর অন্তর্গত হওয়ায় তুরতুক গ্রামে বিভিন্ন সময়ে মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন জায়গা থেকে ব্যবসায়ীরা এসেছেন।  কালের ধারায় তুরতুকে বসবাসকারী তিব্বতীয় বন ধর্মাবলম্বী বিভিন্ন জনজাতির মানুষের  ধর্ম, সংস্কৃতি এবং জীবনধারায় আমুল পরিবর্তন  ঘটে গিয়েছে। ইতিহাস বলে শিওক নদীর ধারে  সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক অংশে বসবাসকারী বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি বিশ্বাস রাখা একদল মানুষের মধ্যে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এসে পড়েন বিখ্যাত ইসলাম কবি মীর সঈদ আলী হামাদানি। এরপর থেকেই তুরতুক গ্রামের বাসিন্দারা ইসলাম ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন। কিন্তু আজও তুরতুক গ্রামের অধিবাসীরা বন ধর্মের বেশ কিছু আচার আচরণ মেনে চলেন । নমাজধারী ইসলাম ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও তুরতুক গ্রামের অধিবাসীরা সম্পূর্ণ নিরামিশাষী। 

                   সীমান্তবর্তী গ্রাম হওয়ায় বৈদেশিক বাণিজ্যে তুরতুক গ্রামের যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা আছে। এই গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরেই খোবানি বা apricot এর চাষ হয়। এই খোবানি ফল থেকে তার বীজ বের করে তাকে শুকিয়ে বিদেশে রপ্তানি করার সমস্ত কাজ টা তুরতুক গ্রামের মহিলারা করে থাকেন। এই খোবানির জন্যই তুরতুক গ্রামকে বার বার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছে পাকিস্তান এবং এই গ্রাম আক্রান্ত হয়েছে।

 
 তুরতুক গ্রামে খোবানি (apricot) এর চাষ

                  গ্রামে ঘুরতে ঘুরতে আলাপ হল মধ্যবয়সী হুসেন বেইগ এর সাথে। শিক্ষিত মানুষ, গ্রামের প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক। ওনার সাথে যখন ওনার বাড়ির পথে চলেছি, পথে দেখা মিলল একঝাঁক ম্যাগপাই পাখির। নিজেদের মধ্যে হইচই করে ঘুরে বেড়াচ্ছে গ্রামের বিভিন্ন বাড়ির কোণায়। 


                                                                             ম্যাগপাই                                                     

                            গ্রামের গল্প বলতে বলতে বেইগ সাহেব আমাদের নিয়ে গেলেন ওনার নির্মীয়মান বাড়ির পিছনে। সেখান থেকে শিওক নদীর চর দেখে মনে হচ্ছে যেন ছোটবড় বিভিন্ন মাপের মাদুর পাতা আছে প্রকৃতির কোলে। মাঝে মাঝে দু একটা লম্বা লম্বা গাছ। বাঁদিকে তাকালেই দেখা যায় রুক্ষ কারাকোরাম পর্বতের সীমানা। এই সীমানায় ভারত এবং চীন উভয় দেশেরই সেনাছাউনী আছে। সেই ছাউনী প্রায় ১০ কিমি দূরে। বেইগ সাহেব আমাদের দেখানোর জন্য বাইনোকুলার নিয়ে এলেন। বেশ কয়েকটা পাথরের উপর বাইনোকুলারটা ঠিক মত রাখতে রাখতে বেইগ সাহেব বলতে লাগলেন তার আক্ষপের কথা। উনি বললেন আমাদের পূর্বজরা নিজেসের অজান্তেই, ঘর থেকে এক পা না বেরিয়েই কখনো হয়েছেন হিন্দুস্তানী, কখনো বাল্টিস্তানী, কখনো আবার পাকিস্তানী। কিন্তু তাদের কথা কেউ শোনেনি। তাদের সমস্যার কথা কেউ ভাবেনি। সময়ের সাথে সাথে নিজেদের অনিচ্ছায় তারা বদলে ফেলতে বাধ্য হয়েছে তাদের সংস্কার, ধর্মবিশ্বাস, জীবনধারা এবং সর্বোপরি নাগরিকত্ব। তবে আজ তারা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে এবং ভারতের নাগরিক হিসাবে তারা অনেক সুরক্ষিত বোধ করে। ইতিমধ্যে বাইনোকুলার ঠিক জায়গায় লাগানো হয়েছে। বেইগ সাহেব একে একে আমাদের দেখাচ্ছেন পাহাড়ের একদম মাথায় মুখোমুখি দুটি সেনাছাউনী যার একটা একটু উঁচুতে। এই উঁচু ছাউনীর মাথায় উড়ছে ভারতীয় তেরঙ্গা। এক ঝলক দেখলেই কেমন গা শিউরে ওঠে। ঐ দুর্গম পর্বতশিখরে টহল দিয়ে চলেছে দু দেশের সেনা। রক্ষা করে চলেছে রাষ্ট্রীয় সীমান্ত। তুরতুক গ্রামের অধিবাসীরা ভারতীয় সেনাদের প্রতি তাদের কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য পালা করে এই রুক্ষ দুর্গম পর্বত শিখরে পায়ে হেঁটে সেনাদের খাবার পৌঁঁছে দিয়ে আসে। আমি বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করি যখন সব টা বরফে ঢেকে যায়! বেইগ সাহেব জবাব দেন - 'দেখা কিতনী উঁচাই পর লহরা রহে হ্যায় হামারা তিরঙ্গা!। কুছ ভি হো যায় উসে ঝুকনা নেহি'।

                        শ্রদ্ধায় মাথা নীচু হয়ে যায়। হয়তো বা সীমান্তের এত কাছে আছে বলেই দেশের প্রতি এত ভালোবাসা। বারবার দেশবদল হয়েছে, বদলেছে জীবন কিন্তু বদলায়নি দেশমাতৃকার প্রতি তাদের ভালোবাসা, জাতীয় পতাকার প্রতি তাদের শ্রদ্ধা, ভারতীয় সেনাদের প্রতি তাদের কর্তব্যনিষ্ঠা। তাই বার বার পাল্টে যাওয়া এই পাল্টিস্তানিরাই আমাদের দেশের সম্পদ, সত্যিকারের হিন্দুস্তানী।

 





Thursday, 3 June 2021

মরুজাহাজ

                         সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী ভারতীয় সেনার অসংখ্য ছাউনী রয়েছে গোটা লাদাখ প্রদেশ জুড়ে। তার মধ্যে যে সেনা শিবিরের কথা শুনলে শরীরের সমস্ত রক্ত হিম হয়ে যায়, সেই সিয়াচেন লাদাখ প্রদেশের নুব্রা উপত্যকার আন্তর্জাতিক সীমারেখা।  নুব্রা উপত্যকায় সিওক আর নুব্রা এই দুই নদীর সঙ্গম। নুব্রা উপত্যকার অনেক জনপদের মধ্যে হুন্ডার অন্যতম আকর্ষণীয়। ধুসর পাহাড়ের কোলে এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে স্নিগ্ধ নুব্রা নদী। সূর্য্যের আলো ছায়ায় কোথাও কাজল কালো কোথাও বা সবুজ সে নদীর জল।  ঠিক যেন ছোটবেলায় খাতায় আঁকা নদীর মত। নদীর দুধারে সামান্য ঘাস। তারপরেই ধু ধু সাদা বালি। নুব্রা ভারতের শীতল মরুভুমি।
 

 
                          
                      তীব্র বেগে হাওয়া চলার জন্য এই উপত্যকার বালিতে ছোট ছোট বালিয়াড়ি তৈরী হয়। আবার হাওয়ার গতিতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।  প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য, সময়ের সাথে সেই সৌন্দর্য্যের রূপবদল, এ সব ছাড়াও এই জায়গার অন্যতম আকর্ষণ এই শুভ্র মরুভুমি তে ঊটের পিঠে চড়া। প্রচুর ভ্রমণ পিপাসু মানুষ শুধু ঊট চড়ার জন্যই আজকাল হুন্ডারে আসে। নুব্রা উপত্যকার ঊট, সাধারণ ঊটের থেকে আলাদা। এই ঊটের পোশাকি নাম Bactrian camel। সাধারণতঃ আমরা যে ঊট দেখতে অভ্যস্ত তার পিঠে একটা কুঁজ থাকে, কিন্তু এই ঊটগুলির পিঠে দুটি কুঁজ। উচ্চতায় ও এরা অনেক বেঁটে এবং ভীষণ শান্ত নিরীহ প্রকৃতির জীব। হুন্ডারের বালিতে পা দিয়েই পর্যটকের দল কথাবার্তা চালাতে থাকে এই ঊটের সহিসদের সাথে। যাতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঊটের পিঠে চড়ে বালির রাজ্যে খানিক ঘুরে আসা যায়। আমিও প্রথমটায় সেরকমই একটা কিছু ভেবেছিলাম। পায়ে পায়ে এগিয়ে যখন একটা ঊটের সামনে থামলাম, আমার একটুও ইচ্ছে করলনা ওর পিঠে চড়ে বেড়াতে যেতে। এত মায়ায় ভরা চোখ দুটো যেন কত কিছু বলতে চায়। আমি পিঠে চড়ার সিদ্ধান্ত বদলে একটা ঊটের কাছে গিয়ে চুপ করে বসলাম। গা টা যেন রেশমের মত পিচ্ছিল। গায়ে হাত দিতেই আমার দিকে নরম দৃষ্টিতে তাকালো। বুঝলাম এমন স্পর্শে ও খুব একটা অভ্যস্ত নয়। 

 
 

নুব্রা উপত্যকায় bactrian camel


                            আমার এমন অদ্ভুত আচরণ দেখে সহিস বেচারা পড়ল বিপদে। বেশ কিছু সময় আমি যদি ওর ঊটটাকে আঁটকে রাখি, তাহলে বেচারার ব্যবসার ক্ষতি হবে। আমি বেড়ানোর পরিকল্পনা ছেড়ে কিছু ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিয়ে সহিসের সাথে গল্প জুড়লাম। জানতে চাইলাম এদের কাহিনী। 

      নুব্রা উপত্যকায় ঊট বিহার
 
                     Bactrian camel ভারতে আসে ১৮৭০ সাল নাগাদ। মধ্য এশিয়া ও আধুনিক চীন দেশের ইয়ারকন্দ এবং আশ পাশের জায়গা থেকে বিভিন্ন পসরা- নুন, উল, ভেড়ার লোম, রেশম দ্রব্য, নীল ইত্যাদি চীন লাদাখ সীমান্তের silk route ধরে ভারতের বাজারে আসত।  এই প্রজাতির ঊট এক কুইন্টাল পর্যন্ত ওজন নিয়ে ছয় থেকে সাত ঘন্টা পাহাড়ী পথে চলতে সক্ষম। শারীরিক গঠনের এমনই বৈচিত্র যে এরা মাইনাস ৪০ ডিগ্রী তাপমাত্রায়ও কর্মক্ষম থাকে। দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান যান হিসাবে ব্যবহৃত হয় এই bactrian camel।  ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৫০ সালে এই silk route বন্ধ হয়ে যায়। এই সময় চীন থেকে আসা বেশ কিছু ব্যবসায়ী বেশ  কয়েকটি bactrian camel স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে ছেড়ে দিয়ে চলে যান। কাজে না লাগার জন্য সে দেশের মানুষের কাছে পরিত্যক্ত হলেও নুব্রা উপত্যকার প্রকৃতি প্রেমী মানুষ গুলো এদের পরিত্যাগ করে নি। অভাবের সংসারে পরিবারের  সদস্য হয়েই তারা রয়ে যায় নুব্রা উপত্যকার মানুষের ঘরে ঘরে। 
                    অত্যন্ত কঠিন জীবনযাত্রায় যেখানে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই এক সংগ্রাম, সেখানে স্বাভাবিক করণেই এই প্রজাতির প্রাণী গুলি কিছুটা অবহেলিত হয়ে পড়ে এবং ক্রমশঃ এদের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হতে থাকে। ২০১২ সালে  গোটা নুব্রা উপত্যকায় এদের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫০ এ। নিকটবর্তী এলাকায় মালপত্র বহনের কাজে এই ঊটকে গ্রামবাসীরা কাজে লাগাত। ২০১৫ সালে এদের সংখ্যা বেড়ে হয় ২১১। এই সময় থেকে লাদাখের পর্যটন শিল্পে এদের কাজে লাগানোর কথা ভাবতে থাকে স্থানীয় অধিবাসীরা। প্রচুর বিরোধিতা এবং অসহযোগিতার মধ্যে দিয়ে ২০০৯ সালে তারা Central Asia Camel Safari নামে একটি বৈধ সমবায় সংস্থা তৈরী করে। মহম্মদ সাফি নামের এক অধিবাসী ঊট গুলিকে মানুষ বহন করার প্রশিক্ষন দেন। আমার সাথে গল্পের মধ্যে সহিস ভাই বলেন বছর দশেক আগে এই ঊটগুলি মানুষ বিনামূল্যে একে অপরকে দিয়ে দিতেন। আজ এক একটি ঊটের দাম ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। একজন সহিস একটি মরশুমে প্রায় ৪ লাখ টাকা পর্য্যন্ত রোজগার করেন একটি ঊট থেকে।
                    প্রকৃতির সাথে মানুষের আবহমান কালের সম্পর্ক। সেই সম্পর্ক যেমন নির্ভরশীলতার তেমনই ধ্বংসাত্মক। যথেচ্ছ ধ্বংস করা, নির্দোষ প্রাণীদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ায়, মানুষ নিজেকে সিদ্ধহস্ত বলে প্রমাণ করেছে বহুবার। কিন্তু bactrian camel তার ব্যতিক্রম। স্থানীয়  মানুষের প্রবল অন্তরঙ্গতা আর একটি প্রজাতিকে  বাঁচিয়ে রাখার প্রবল ইচ্ছাতেই প্রকৃতির কোল থেকে বিলুপ্ত হতে পারেনি এই bactrian camel। অর্থকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীদের ফেলে যাওয়া সেই ঊট গুলোর চোখেও নিশ্চয় এমনই মায়াভরা দৃষ্টি ছিল, যা মানুষের মনে এদের বাঁচিয়ে রাখার তাগিদ তৈরী করে। 
                    এতক্ষণ বক বক করে অনেকটাই ক্ষতি হল সহিস ভাইয়ের। কিন্তু  শত চেষ্টার পরেও  এই ক্ষতিপূরণ করার সুযোগ সহিস ভাই আমাকে দিল না। উল্টে আমাকে বলল - হামারে বাত আপ ধ্যানসে শুনা ইয়েহি তো কামাই হ্যায়।   সত্যি তো কঠিন জীবন সংগ্রাম চালিয়ে বেঁচে থাকা এই প্রত্যন্ত উপত্যকার মানুষের কথা শোনার জন্য আমাদের সময় কোথায়!

Wednesday, 26 May 2021

পদ্ম-পিনাক পাণি

                      আজ বুদ্ধপূর্ণিমা। ভগবান বুদ্ধের পুণ্য আবির্ভাব তিথিতে আজ আকাশের মুখ ভার। দেখা নেই পূর্ণিমার চাঁদের। এমনই এক চাঁদহীন পূর্ণিমা ছিল সেদিন। কোজাগরী পূর্ণিমা। রাতটা কেটেছিল হিমাচল প্রদেশের লাহুল স্পিতি জেলার এক বিখ্যাত জনপদ, উদয়পুরে (উদেপুর নামেও পরিচিত)।  প্রকৃতি যেমন হিমালয়ের অনন্য সম্পদ, ঠিক তেমনই হিমালয়ের পথে পথে এমন কিছু সম্পদের দেখা মেল্‌ যা ভারতের সভ্যতা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় সহনশীলতার সুদৃঢ় বুনিয়াদের নিদর্শন।  প্রত্যন্ত সীমান্ত পাঙ্গি উপত্যকা থেকে ফেরার পথে  উদয়পুর পৌঁছতে প্রায় অন্ধকার হয়ে গেল। হিমালয়ের কোলে কোজাগরী পূর্ণিমার রাত কাটানো যে কোন হিমালয়প্রেমীর কাছে অত্যন্ত লোভনীয়। আমরাও সেই স্বপ্নেই বিভোর ছিলাম। কিন্তু বিধি বাম। উদয়পুর পৌঁছনোর কিছু আগে পথেই নামল তুমুল বৃষ্টি। উদয়পুর থেকে  কেলং যাওয়ার পথে ৯ কিলোমিটার যাওয়ার পর রাস্তা বেঁকে গেল পাহাড়ের একদম শেষ প্রান্তে। বৃষ্টি ভেজা এই রাস্তাটুকু আসতে অনেক সময় লেগে গেল। সেই সঙ্গে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা আর রক্ত জমিয়ে দেওয়া হাওয়া। 

                         গাড়ি থেকে নেমে অল্প কিছুটা রাস্তা হেঁটে  পাহাড়টার একদম শেষ প্রান্তে পৌঁঁছে  গেলাম। খাড়া পাহাড়ের নীচে বয়ে চলেছে চন্দ্রভাগা। বৃষ্টির জন্য সব ধোঁয়া মনে হচ্ছে। একদম শেষ মাথায় দেখতে পাওয়া যাচ্ছে দুধ সাদা মন্দিরের চুড়া - ত্রিলোকীনাথ। এই মন্দির ভারতবর্ষের ধর্মীয় সহনশীলতার ইতিহাস বহন করে। আসল মন্দিরটির অস্তিত্ব বিলুপ্ত। কেউ বলেন এ মন্দির পান্ডবদের  বানানো আবার কেউ বা বলেন কুলুর রাজপরিবার এই মন্দির নির্মাণ করেছেন। তা সে যেই নির্মাণ করুক না কেন এ মন্দিরের আকর্ষণ এর ধর্মীয় গ্রহণ যোগ্যতায়। বৌদ্ধ ধর্মের সাথে হিন্দু ধর্মের চিন্তা ভাবনায় মৌলিক বিভেদ থাকলেও তা যে কখনো সামাজিক গঠনে ভাঙ্গন ধরায়নি, এই মন্দির তার অন্যতম উদাহরণ। কথিত আছে এই মন্দিরের জায়গায় একসময় বৌদ্ধ বিহার ছিল। পরবর্তী সময়ে হিন্দু ধর্মের মানুষ এখানে শিব পূজা শুরু করেন । অন্য একটি মত অনুসারে ত্রিলোকীনাথ আদতে শিব মন্দির যেখানে বৌদ্ধ গুরু পদ্মসম্ভব অষ্টম শতাব্দী তে ভগবান বুদ্ধের আরাধনা শুরু করেন। ইতিহাস যাই বলুক না কেন এখানে হিন্দু ও বৌদ্ধ উভয় ধর্মের মানুষ আসেন। বিগ্রহকে যে জ্ঞানে পূজা করতে তিনি ইচ্ছুক, সেই জ্ঞানেই পূজা করার স্বাধীনতা সমস্ত ভক্তের আছে। 

                        মন্দিরের প্রবেশ পথ বেশ সংকীর্ণ। চাতালে দাঁড়ালে মনে হয় কোন একটি বাড়ির উঠোনে গৃহদেবতার মন্দির। এটি ভারতবর্ষের একমাত্র মন্দির যে মন্দিরের বিগ্রহ বৌদ্ধ লামা এবং হিন্দু পুরোহিত একসাথে পূজো করেন। মন্দিরের চাতালে শিবের বাহন নন্দী র জন্য একটি ছোট্ট একটি চালা করা আছে। পাশে একটি ঘরে রাখা আছে বৌদ্ধ দের Prayer wheel। 

                                                                       ত্রিলোকীনাথ মন্দির

                    মন্দিরের বিগ্রহ বড় বিচিত্র। বিগ্রহটির ছয় হাত,  যা ভগবান বুদ্ধের অবলোকিতেশ্বর রূপ। বিগ্রহের মাথায় শিবের জটা। হাতে জপমালা। শিবের গলায় উপবীত, কোমরে পেঁচানো সাপ। বুদ্ধের  গলায়, কানে, বাহুতে রাজকীয় অলঙ্কার। ধ্যানমগ্ন মহাযোগী মুদ্রায় শিব আর পদ্মপাণি অবলোকিতেশ্বরের সহাবস্থান। শিবের জটার চুড়ায় রয়েছেন অমিতাভ বুদ্ধ - যিনি সীমাহীন আলোর প্রতীক। মন্দির প্রাঙ্গনে ভক্তের দল নিজেদের আরাধ্য দেবতার প্রতি প্রণাম জানান। কেউ বলেন 'ওম মণি পদ্মে ওম', কেউ বলেন 'ওম নমঃ শিবায়ঃ'।  কিন্তু কারো প্রণাম অন্যের প্রণাম কে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে না। এমনই এ মন্দিরের শৃঙ্খলা। বৌদ্ধ লামাই হোন বা হিন্দু পুরোহিত, ভক্তের বিশ্বাসে কোনওরকম প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করেন না।

                 


                                                                     ত্রিলোকীনাথের বিগ্রহ

                             যে রূপেই তিনি বিরাজমান হন না কেন আসলে তিনি ত্রিলোকী নাথ অর্থাৎ ত্রি-লোক বা ত্রিভূবনের নাথ, জগতের রক্ষাকর্তা।   সৃষ্টির প্রতি তাঁর নিরন্তর কৃপাদৃষ্টি। দুই ধর্মের বিশ্বাসের এক অভাবনীয় সংযোগের দেখা মেলে এই ত্রিলোকীনাথ মন্দিরে। এই মন্দিরের পবিত্রতা কৈলাস-মানসসরোবরের সমতুল্য বলে ভক্তরা মনে করেন।  দুটি ভিন্ন ধর্মের আরাধ্য দেবতার এই মেলবন্ধন,  যুগ যুগ ধরে চলে আসা দুই ধর্মের এই সহনশীলতা  বোধহয় শুধুমাত্র ভারতবর্ষেই দেখা যায়। 
                            অবিরাম বৃষ্টিতে ভিজে, ঠান্ডায় প্রায় জমে যাওয়ার পর ত্রিলোকীনাথের এই মোহময় বিগ্রহ দর্শন জীবনের এক পরম প্রাপ্তি। সমগ্র জগতের শান্তিযজ্ঞে নিমগ্ন এই পদ্ম-পিনাক পাণির উদ্দেশ্যে করজোড়ে প্রণাম জানালাম। প্রার্থনা জানালাম - 
বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি
শুষ্ক হৃদয় লয়ে আছে দাঁড়ায়ে
ঊর্ধ মুখে নরনারী

Sunday, 23 May 2021

ভারতের নীলকন্ঠ

              ভারতীয় সনাতন সংস্কৃতিতে নীল রঙ কে নানা ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নীল কখনো পরাক্রমের প্রতীক, কখনো বা সাহসিকতার,  কখনো পৌরুষের। হিন্দু দেবদেবীরা  যারা  উক্ত গুণের অধিকারী, তাদের গায়ের রঙ নীল। তা সে শিব ই হোন বা বিষ্ণু। নীল রঙের ঔজ্জল্যই তার আকর্ষণ। ভারতীয় সংস্কৃতিতে নীল রঙের ব্যবহারেও প্রচুর বৈচিত্র আছে। যেমন রাজস্থানের বিশনয় সম্প্রদায়ের মানুষ নীল রঙের বস্ত্র গায়ে দেন না। এই সম্প্রদায়ের মানুষ প্রকৃতিকে ঈশ্বর রূপে আরাধনা করে। নীল রঙ যেহেতু বিশেষ এক ধরণের গাছ থেকে একসময় তৈরী হত, তাই এই রঙ তৈরী করতে গিয়ে এই নীল গাছ গুলিকে ধ্বংস করা হত। প্রকৃতির এই অপূরণীয় ক্ষতি যাতে না হয়, তাই এই সম্প্রদায়ের মানুষ নীল বস্ত্র বর্জন করেন। বড় বিচিত্র নীলের বিষয়। 

                 নীল কখনো আবার সৌভাগ্যের প্রতীক। বিজয়া দশমীর দিন কোনো ভাবে কেউ যদি নীলকন্ঠ পাখির দেখা পান তাহলে তা পরম সৌভাগ্যের প্রতীক বলে মনে করা হয়। রামায়ণের বর্ণনা অনুযায়ী রাম যেদিন রাবণ বধের উদ্দেশ্যে রওনা হন, সেদিন তিনি নীলকন্ঠ পাখির দেখা পান, আর সেদিন ছিল বিজয়া দশমী। শিবপুরাণে আবার নীলকন্ঠ পাখিকে শিবালয়ের দূত হিসাবে বর্ণনা করা হয়। বিজয়া দশমীর শেষে মা যখন তাঁর সন্তানদের নিয়ে কৈলাসের  উদ্দেশ্যে রওনা হন, সেই খবর কৈলাসপতির কাছে পৌঁছে দেয় এই নীলকন্ঠ পাখি।

                                                               নীলকন্ঠ পাখি (Indian Roller)

                নীল যে শুধুই শুভ বা শুদ্ধতার প্রতীক তা কিন্তু নয়। নীল রঙ বর্জন করার অন্যতম কারণ হিসাবে  মনে করা হয়, নীল হল বিষের রঙ। সমুদ্র মন্থনের সময় এই বিষ পান করে ছিলেন মহাদেব এবং এই বিষের রঙেই তিনি নীলকন্ঠ। যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন নীল রঙের বোধহয় নিজস্ব সহনশীলতা আছে, যা তাকে দেয় অনন্ত বিস্তার, বিপুল গভীরতা। 

                  হিমালয়ের আনাচে কানাচে এমন নীলের দেখা মেলে বহু জায়গায়। এমনই এক নীলের সন্ধানে গিয়েছিলাম ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্য লাদাখ এ। লাদাখ কে বর্ণনা করতে গেলে খুব সহজে পরস্পর বিপরীত দুটি শব্দ বলা যায় - রুক্ষ আর মনোরম। সবুজের অনুপস্থিতিতে মাইলের পর মাইল রুক্ষ পাহাড় কিভাবে প্রাকৃতিক শিল্পকলার সম্ভার সাজিয়ে বসে আছে, তা দেখতেই লাদাখ এ আসা। লাদাখ এর প্রধান শহর লে থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়া যায়। তবে লাদাখ রাজ্যের সিংহ ভাগ যেহেতু সেনাদের দখলে, তাই সাধারণ মানুষের যাওয়ার অনুমতি মেলে খুব অল্প কয়েকটি জায়গায়। লেহ থেকে বেরিয়ে পৃথিবীর সর্বোচ্চ যান চলাচলের উপযুক্ত গিরিখাত, খার-দুং-লা পার হয়ে আমাদের গাড়ি ছুটে চলল সেই নীল গন্তব্যে। পথে যেতে যেতে যে নৈসর্গিক দৃশ্য চাক্ষুষ করলাম তা বর্ণনা করার মত ভাষা আমার ভান্ডারে নেই। রুক্ষ পাহাড়, তার গায়ে তীব্র হাওয়ার ধাক্কায় তৈরী হওয়া বিভিন্ন রকম আকার। কোনটা দুর্গের মত, কোনটা বা সেনাদলের সারি, কোনটা যেন রথের মত, কোনটা আবার আস্ত রাজপ্রাসাদ। কোনও কোনও পাহাড়ের গোড়া থেকে মাথা অবধি রক্তবর্ণ গ্রানাইটের দেওয়াল, কোনওটায় সবুজ, কোনওটায় আবার দুধ সাদা। আমাদের গন্তব্যের কাছাকাছি এসে পড়েছি বলে যখন জানতে পারলাম, তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে বটে কিন্তু এই উচ্চতায় এ সময়ে যথেষ্ট দিনের আলো। পাহাড়ের একটা বাঁক ঘুরতেই আচমকা দেখা দিল ঘন নীল জলরাশি। যেন প্রচুর পরিমাণ নীল রঙ জলে গুলে রেখে দেওয়া হয়েছে। হারিয়ে গেল এক নিমেষে। এই হারিয়ে খোঁজাই হিমালয়ের সবথেকে বড় আকর্ষণ। কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা পৌঁঁছে গেলাম আমাদের নীল গন্তব্যে, ৪৩৫০ মিটার উচ্চতায়, হিমালয়ের কোলে আন্তর্জাতিক সীমাকে গিলে ফেলা বিপুল এক জলের ভান্ডার।  এ ভান্ডারের মাত্র ৪০ শতাংশ ভারতবর্ষের দখলে, বাকি ৬০ শতাংশ চীন তথা চীন অধিকৃত তিব্বতের। 

                    এ জলরাশির রঙ বিভিন্ন সময়ে বদল হয়। ঘন নীল থেকে আকাশী, আকাশী থেকে সবুজ, সবুজ থেকে লালচে গোলাপী। প্রকৃতির নিত্য হোলিখেলা। প্রবল হাওয়ায় জলে ওঠে ছোট্ট ছোট্ট ঢেউ যার নীচে কাঁচের মত পাথরগুলো খুব আস্তে আস্তে গড়িয়ে যেতে থাকে শামুকের মত। এ হ্রদ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণার পর কিছু আশ্চর্য্য তথ্য পাওয়া যায়। এই হ্রদের জল সম্পূর্ণ আবদ্ধ, অন্য কোন জলের স্রোতের সাথে এর কোন সম্পর্ক না থাকায় এই জল মাত্রাতিরিক্ত নোনা। এই হ্রদের জলে প্রচুর খনিজ পদার্থ থাকায় জলের রঙ ঘন নীল। নোনা  হলেও এই হ্রদের জল শীতকালে সম্পুর্ণ বরফ হয়ে যায়। মাত্র কয়েকপ্রকার কবচী জীব ছাড়া এই হ্রদের জলে কোন জীব বাঁচতে পারে না। অর্থাৎ এই হ্রদের নান্দনিক উৎকর্ষ যাই হোক না কেন ব্যবহারিক উৎকর্ষ বিশেষ উল্লেখযোগ্য নয়। যতক্ষণ আলোর শেষ রেখা টুকু পড়তে লাগল চেটেপুটে উপভোগ করলাম এর রংবাহার। 

                       আমরা ঘুরে আসার কিছুদিন পর থেকেই শুরু হয়ে গেল এই সীমান্ত প্রদেশে ভারত-চীন দুই দেশের অধিকার রক্ষার লড়াই। খবরের কাগজে পড়তে লাগলাম সে চেনা জায়গার নাম -  চুশুল। এই বিপুল জলরাশি কে মাঝখানে রেখে দীর্ঘ কয়েকমাস চলতে লাগল প্রাণঘাতী সংঘর্ষ। এখনো 'হয় নাই শেষ'। এ যেন আর এক দফা সমুদ্র মন্থন। প্রকৃতির এমন অমূল্য সম্পদ তাকে কি খড়ির গন্ডি তে বাঁধা যায়! এই বিপুল জলরাশির মধ্যে দাগ কেটে কি আমার তোমার ভাগ করা সম্ভব! কিছুতেই নয়। আর এই অসম্ভব কে সম্ভব করার জন্য দু'দেশের মানুষের দুর্বার প্রচেষ্টা বছরের পর বছর ধরে বাতাসে ছড়ায় বিষ। সেই বিষ নিরন্তর পান করে চলে ব্রহ্মান্ডের এই ক্ষুদ্র অংশ। এই বোধহয় সত্যিকারের হলাহল পান।  নিজের সৃষ্টির একটুকরো অংশের মধ্যে এভাবেই বোধহয় নিজেকে প্রকাশ করেন দেবাদিদেব। প্রকৃতির এই নীল সম্পদ - প্যাঙ্গং সো হয়ে ওঠে ভারতের নীলকন্ঠ।

                

প্যাংগং সো  - এ রঙের বাহার

Friday, 7 May 2021

হাসেন অন্তর্যামী

                   প্রকৃতির নিয়মে বছরের অনেকটা সময় গৃহবন্দী হয়ে অবসর জীবন কাটাতে বাধ্য হন, এমন মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে তো বটেই, ভারতবর্ষেও কিছু কম নয়। এমন কিছু মানুষের সান্নিধ্যে কয়েকদিন কাটাতে গিয়েছিলাম হিমাচল প্রদেশের এক অচেনা প্রান্তে। হিমালয়ের পিরপাঞ্জাল আর জাঁস্কর  শাখার মধ্যবর্তী অঞ্চল পাঙ্গি উপত্যকা নামেই পরিচিত। পাঙ্গি উপত্যকায় প্রধানতঃ হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষের বাস। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ভোট দের আধিক্য থাকায় পাঙ্গি উপত্যকা প্রধানতঃ চারটি ভাটোরী তে বিভক্ত। সেই চারটি ভাটোরির অন্যতম হল সুরাল ভাটোরী। বাঁদিকে পিরপাঞ্জাল আর ডানদিকে জাঁস্কারের মাঝে শান্ত, সবুজ নির্জন জনপদ সুরাল। পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলেছে সুরাল নালা। বছরে চার থেকে পাঁচ মাস জলের স্রোত বয়ে যায় এই উপত্যকায়। বাকি সময় সবকিছু বরফের নীচে, সমস্ত মানুষ গৃহবন্দী।  পাথুরে উপত্যকায় বয়ে চলা সুরাল নালার দুই ধারে উঁচু পাহাড়ের ঢাল। সুরালের উচ্চতা ১০০০০ ফুটের কিছু বেশি। ছোট বড় মিলিয়ে গোটা তিনেক প্রাইমারী এবং ইন্টারস্কুল আছে, যা সুরালের জনসংখ্যার তুলনায় চলনসই। এমনই একটি স্কুলের মাস্টারমশাই পবন সিং নেগি র সাথে আলাপ হল সুরাল গ্রামে। জানতে চাইলাম সুরালের ইতিকথা।

                       সুরাল নালা                  

পাঙ্গি উপত্যকা হিমাচল প্রদেশের প্রান্তিক অংশ এবং জম্মু কাশ্মীর সীমানার সাথে যুক্ত। হিমাচলের বেশ কয়েকটি গিরিবর্ত্ম এই পাঙ্গি উপত্যকা কে বিচ্ছিন্ন করে রাখে বছরের অর্ধেকের বেশি সময়। কিলার  থেকে সাচ পাস (১৪৪৮২ ফুট) পার হয়ে পোঁছতে হয় এই স্বর্গীয় ভুখন্ডে। সাচ পাস থেকে সোজা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গাড়ি যখন নামতে থাকে দুর্বার গতিতে, মনে হয় এ যেন এক অন্যরকম নাগরদোলা। সুরাল, ভারত ভুখন্ডের বহু প্রাচীন জনপদ। কথিত আছে হিমাচলের শাসকবর্গ অপরাধের শাস্তি হিসাবে প্রজাদের এই ভুখন্ডে পাঠিয়ে দিতেন যাতে তারা সহজে আর মূল ভুখন্ডে ফিরতে না পারে। 

                   সে যেভাবেই গড়ে উঠুক, দুটি ভিন্ন ধর্মের মানুষ আবহমান কাল ধরে জীবনধারণ করে চলেছে প্রকৃতির এই ইন্দ্রলোকে। কথা বলতে বলতে পবন নেগি আমাদের নিয়ে এসেছেন একটা উঁচু জায়গায় যেখান থেকে সুরাল নালার সর্পিল গতি দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। পাহাড়ের সমস্ত ঢালে ঘন জঙ্গল। লা্‌ল, হলুদ আর সবুজ রঙে যেন আগুন জ্বলছে। জানতে পারলাম এই বিভিন্ন রঙ আসলে বিভিন্ন বয়সের ভুজ গাছের পাতার। একেবারে কচি পাতা আগুনের মত লাল, মধ্যবয়সী পাতা ঘন সবুজ আর প্রাপ্তবয়স্ক পাতা কাঁচা সোনার মত হলুদ।


                                                                   ভুজ গাছের জঙ্গল

                                ভারতের সনাতন সংস্কৃতিতে ভুজ গাছের ছালের ব্যবহার বহুজনবিদিত। কিন্তু হিমালয়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এই ঐতিহাসিক বৃক্ষের বিপুল সমাহার সম্পর্কে আমার অন্ততঃ কোন ধারণা ছিল না। নেগি সাহেব অতি যত্ন সহকারে আমেদের ঘুরিয়ে দেখাচ্ছেন তাঁর জন্মভূমি। প্রকৃতির সাথে লড়াই করতে করতে লৌহকঠিন ব্যক্তিত্বের অধিকারী প্রত্যেক সুরালবাসী, ঠিক তেমনই তাদের আবেগ। কৌতুহলী আমার মন। প্রশ্ন করে বসি এই সুরাল নালা কোথা থেকে আসছে? নেগি সাহেব বলেন এই নালার উৎস হিমাচল আর জম্মু কাশ্মীরের সীমান্তে অবস্থিত শিবশঙ্কর শৃঙ্গ। এ কেমন শৃঙ্গ? নেগি সাহেব বলেন - "যাও খুদ দেখকে আও ক্যায়সে শঙ্কর ভগবান পাহাড় কী চোটি সে হামে রকসা কর রহে হ্যায়"। ভারী অদ্ভুত তো! নেগি সাহেব আমাদের রাস্তা বাতলে দিলেন, চলতে শুরু করলাম। নেগি সাহেব জয়ধ্বনী দিলেন - জয় শিব শঙ্কর। 

                           সুরাল নালার পাশ দিয়ে পাহাড়ি রাস্তা। অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য। ক্রমশঃ চলতে চলতে অনেক পিছনে ফেলে এসেছি সুরাল গ্রাম। দুধারে অসংখ্য বরফের পাহাড়, পাহাড়ের গা বেয়ে সারি সারি ছোট বড় ঝরনা নেমে এসে মিশে যাচ্ছে সুরাল নালায়। বেশ কয়েক কিলোমিটার হেঁটে ফেলেছি। হঠাৎ দু তিনটে পাহাড়ের মাঝখান থেকে উঁকি মারল আড়াআড়ি ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা আপাদমস্তক বরফে ঢাকা এক শৃঙ্গ। বড় অদ্ভুত তার গড়ন। সামনের দিকটা যেন হাতির শুঁড়ের মত। যত সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি শৃঙ্গের গড়ন বদলে যাচ্ছে। খানিক দুর যাওয়ার পর পুরো প্রশস্ত শৃঙ্গ  দেখতে পেলাম।  যেন প্রকান্ড এক শঙ্খ। যে শঙ্খ বাজানোর ক্ষমতা মহাযোগী মহাদেব ছাড়া আর কারো নেই। কি অদ্ভুত এই শৃঙ্গের রূপ। পরতে পরতে যেন অনুভব করা যায় ত্রিলোকেশ্বরের উপস্থিতি। মনে পড়ে গেল কোন একজনের লেখায় পড়েছিলাম শঙ্খের মত দেখতে বলে এই শৃঙ্গকে পর্বতারোহীরা শিবশঙ্খ শৃঙ্গ নামে চেনেন। কিন্তু সুরাল বাসীর কাছে এই পাহাড়ই শিব শঙ্করের বাসভুমি। বিস্ময়ের আরও কিছু বাকি ছিল।  খানিকটা  এগিয়ে গিয়ে পাহাড়ের চুড়ার দিকে তাকাতেই কানে বেজে উঠল নেগি সাহেবের কথাগুলো। নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছি না। বরফে মোড়া শঙ্খ আকৃতির এই পাহাড়ের মাথায় স্বয়ং শিবশঙ্কর বিরাজমান। তাঁর কৃপাদৃষ্টি সরাসরি সুরাল গ্রামের দিকে। প্রকৃতির এই বিস্ময় নিজে চোখে না দেখলে হয়তো বিশ্বাস করতাম না। ইনিই নেগি সাহেবের শিবশঙ্কর,  যিনি প্রকৃতির উচ্চাসনে বসে অবিরাম রক্ষা করে চলেছেন তাঁর সৃষ্টির প্রতিটি অনুকণা। সকলের নাগালের বাইরে সমস্ত পার্থিব মায়াজাল এড়িয়ে অবিচল, ধ্যানমগ্ন জগদীশ্বর। সৃষ্টির সমস্ত কলহ, বিবাদ, অভিমান, অহংকার সমস্ত কিছুকে যেন প্রাণভরে উপভোগ করছেন সচ্চিদানন্দ।


                                                    

                                                        বরফ ঢাকা শৃঙ্গের চুড়ায় শিবশঙ্কর

                       অদ্ভুতদর্শন এই শৃঙ্গের চুড়ায় আসীন  রজতগিরিনিভম কে দেখে মনে হল, এই পরম ঐশ্বর্য্য অবহেলা করি আমরা।  পার্থিব চাওয়া পাওয়া নিয়ে গড়ে তুলি আত্মপ্রত্যয়ের অসাড় গর্ভগৃহ। সে গর্ভগৃহ ঊজ্জ্বল করে তুলি অহংকারের রোশনাই দিয়ে, সাজিয়ে তুলতে জ্বালাই উচ্চাশার হাজারবাতি।  প্রাপ্তির সেই অন্তঃসারশূণ্য আস্ফালন দেখে অবশ্যই তাঁর করুণা হয়,  হাসেন অন্তর্যামী।