তানের ঘরের ঠিক সামনে দিয়ে চলে গেছে ইলেকট্রিকের দুটো মোটা তার। সারাদিনের ক্লান্তি ভরা আধবোজা চোখে গা এলিয়েছে তান। প্রতিদিনের মত ফিঙে দুটো এসে বসেছে তারের উপর। এই ফিঙে যুগলের খুনসুটি দেখতে দারুণ লাগে তানের। মনে হয় যেন সারা দিন ধরে জমিয়ে রাখা সমস্ত সুখদু:খের হিসেব মেলাচ্ছে কত্তা-গিন্নীতে। হঠাৎ একটা দমকা হাওয়ায় উড়ে গেল একটা ফিঙে। তারে বসে থাকা ফিঙেটার গভীর চোখটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে তান। যেন চোখে চোখে কথা হচ্ছে দুজনের-
"কি গো ক'দিন জানলাটাই যে খোলা ছিলনা! কোথায় পালিয়েছিলে?"
ধড়মড় করে সোজা হয়ে উঠে বসে তান। আজ দুপুরটা দারুণ মজায় কাটবে।
"বেড়াতে গেছিলাম গো"
"
ও তাই বলো। তা কদ্দূর গেছিলে শুনি! শোনাও তোমার বেড়ানোর গপ্প।"
"গেছিলাম সে অনেক উঁচু পাহাড়ে। ঘন সবুজ পাইনের চাদরে মোড়া। আঁকা বাঁকা রাস্তার পাশ দিয়ে ছুটে চলা পাহাড়ি নদীর সঙ্গে গল্প করতে করতে পৌঁছে গেলাম এক স্বপ্নের দেশে।"
"আমি তো এই জঙ্গলটাতেই একা থাকতে পারিনা আর তুমি একা একা অত দূর চলে গেলে? তোমার ভয় করল না!"
"ভারি অদ্ভুত কথা বলো তো তুমি! একা কেন যাব? ছুটি, আমার একমাত্র বন্ধু ছিল তো আমার সঙ্গে। সে আমায় একা যেতে দেবে নাকি!"
"ও তাই বলো। তাহলে বলো তোমার বেড়ানোর গল্প।"
তারটাকে শক্ত করে ধরে জমিয়ে বসল ফিঙেটা। বড় বোদ্ধার মত।
"অনেকদিন ধরে জায়গাটার নাম শুনছিলাম জানো - জালোরি পাস। খোঁজখবর করে রুট ঠিক করলাম। হিমাচলপ্রদেশের এই প্রান্তিক অঞ্চলে পৌঁছনোর রাস্তা অনেক। আমরা বেছে নিলাম দিল্লী দিয়ে যাওয়ার রাস্তা।"
"দিল্লী! বাবা সে তো অনেক দূর!"
"কি যে বলো অত ভাবলে কি বেড়ানো যায়!"
"তাও ঠিক। যাকগে বলো তারপর!"
"বেড়ানোর পরিকল্পনা এমনভাবে করেছিলাম যাতে ট্রেন থেকে কোজাগরী পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে পারি।"
"বাহ। কি দারুণ! কেমন দেখালো চলন্ত চাঁদ!"
"না গো। কপাল মন্দ হলে কি আর চাঁদ দেখা যায়! সারা রাস্তা আকাশের মুখ গোমড়া। রাতে তো বৃষ্টি হল তুমুল।"
"এমা! তাহলে চলন্ত চাঁদ দেখা হল না!"
"নাহ। মাঝরাতে তো তুমুল বৃষ্টি। দিল্লীতে যখন নামলাম তখনও বৃষ্টি। ঘোলা আকাশ। মেজাজ টা একদম খিঁচড়ে গেল জানো!"
"সেই তো! আকাশ ঘোলা থাকলে আমাদেরও খুব মন খারাপ লাগে। গান গাইতে ইচ্ছেই করে না। তা বেশ তারপর!"
"রাতে বাস ধরলাম দিল্লীর কাশ্মীরি গেট থেকে।"
"ও দিল্লী আর কাশ্মীর বুঝি একই জায়গায়!"
"ধ্যাৎ! কি যে বলো না! ওটা দিল্লীর একটা জায়গা। ওখানের বাসস্ট্যান্ড থেকে অন্য রাজ্যে যাওয়ার বাস ছাড়ে। বুঝেছ?"
"ও আচ্ছা।"
"বাসে চড়ে আমরা সারারাত চলতে লাগলাম। মাইলের পর মাইল। রাস্তার দুধারে শুধু আলোর রোশনাই। শহুরে কায়দার খাবার দোকান, হোটেল, আরও কতো কি! দিন না রাত বোঝার উপায় নেই।"
"সে কি বলো! রাতের বেলা দিনের আলো! তাহলে ওখানে আমাদের বন্ধুরা ঘুমোয় কি করে!"
"ওখানে গাছই নেই তোমার বন্ধুরা থাকবে কোথায়? সব পালিয়ে গেছে কোথায় কে জানে!"
"আহারে! গাছই নেই!"
"না সমস্ত গাছ কেটে, চওড়া রাস্তা বানানো হয়েছে। বিদ্যুতের গতিতে সেখানে গাড়ি চলে। যতদূর দেখা যায় কালো পিচঢালা রাস্তা আর ছুটে চলা বেপরোয়া গাড়ি।"
"তা বাসে করে কোথায় নামলে?"
"আমি ভেবেছিলাম মান্ডিতে নামব। ছুটি বলল অট বলে একটা জায়গার কথা। সেখান থেকে নাকি আমাদের যাওয়ার জায়গাটা কাছে হবে। তাই টিকিট বদলে ফেললাম।"
তান আর ফিঙের গল্পের মাঝে তারটাতে এসে বসল একটা বাঁশপাতি পাখি। কি তার রঙ আর কি তন্বী তার গড়ন। ফিঙে উল্লসিত হয়ে বলল -
"ঐ দেখো আমার বন্ধুও তোমার গল্প শুনতে এসেছে। শোন হে, তান কেমন পাহাড়ের গল্প বলছে। আমরা তো অত উড়তে পারিনা, তাই গল্পই শুনি!"
তানের শ্রোতার সংখ্যা এক থেকে দুই হল।
"তা বলো বলো তার পর কি সব হোল"
"সক্কালবেলা তুমুল বৃষ্টির মধ্যে বাসের কন্ডাকটর চেঁচাচ্ছে- অটবালো আগে আইয়ে–। বুঝলাম নামতে হবে।"
"এমা ভিজে যাবে যে গো"-
আঁতকে উঠল বাঁশপাতিটা। প্রচন্ড বৃষ্টিতে ওর ওই বাঁশের পাতার মত চেহারা যেমন ভিজে আরও শুকিয়ে যায়, ও যেন তেমনটা হওয়ার কথাই ভাবল মনে মনে।
"না গো না, আমরা তো জ্যাকেট ফ্যাকেট পরে একদম রেডি। হঠাৎ দেখলাম ঝুপ করে অন্ধকার নেমে এল।"
"সকালবেলা অন্ধকার! পাহাড়ে এমন হয় বুঝি!"
"আমরাও তো ঘাবড়ে গেছিলাম, তারপর দেখলাম একটা টানেলে ঢুকে পড়েছে আমাদের বাস।"
"টানেল! সে আবার কি জিনিস!"
"গুহা। আস্ত একটা পাহাড় ফুটো করে তার পেটের ভিতর বানানো সাড়ে তিন কিলোমটার লম্বা রাস্তা এঁকে বেঁকে চলে গেছে। বেশ খানিকক্ষণ অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে চলার পর আলোর বিন্দু দেখা গেল একটা। সেই বিন্দু বড় হতে হতে আমরা পাহাড়ের পেট থেকে বেরিয়ে এলাম আলোর মধ্যে। কন্ডাকটর আমাদের নামিয়ে দিল। আর বাসের খোল থেকে বের করে দিল আমাদের মালপত্র। তখন চারিদিক সাদা হয়ে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। সেই সাদা ধোয়াঁর মধ্যে কেমন যেন মিলিয়ে গেল বাসটা। চলে গেল মানালির দিকে।"
"আর তোমরা?"
"আমরা কোনওরকমে মালপত্র নিয়ে উঠলাম একটা দোকানের চাতালে। সুপুরুষ এক হিমাচলী ভদ্রলোক আমাদের সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন- কাঁহা জায়েঙ্গে? বিস্মিত চোখে আমাদের দেখলেন আপাদমস্তক। কি জানি কেন!"
বাঁশপাতিটা শিস দিয়ে উঠল আনন্দে। "তোমাদের খুব পছন্দ হয়েছিল বোধহয়"
"মস্করা করছ! কেন আমাদের পছন্দ হতে নেই নাকি!"
"এই থামতো! গল্পটা শেষ হবে না। এক্ষুণি সে মিনসে বাসায় ফিরবে আর আমাকে না দেখলেই চিল চিৎকার জুড়বে। তান তুমি বলোতো"
"আমরা একটা ছোট্ট গাড়ি নিলাম। সাদা রঙের অল্টোগাড়ি। চড়ে বসলাম দুজনে। ছুটি আগে এসেছে এদিকটায়, আমি আসিনি। তাই আমার কাছে পুরো জায়গাটা আনকোরা, নতুন। আমার ডান দিক দিয়ে একদম সাথে সাথে চলেছে বিয়াস নদী। মানালির কাছে বিয়াসের সঙ্গে দেখা হয়েছে আমার। কিন্তু সে বিয়াস এত মলিন ছিল না।"
তানের তখন অল্প বয়স। মাধ্যমিক পরীক্ষার পর বাবা মার সাথে গিয়েছিল মানালি। পাথরে পা দিয়ে দিয়ে চলে গিয়েছিল নদীটার কাছে। নদী যেন নীলঘুর্ণি। পাথরের ফাঁকে ফাঁকে নীল জলের যে অন্তহীন যাত্রা দেখেছিল তান, তার গোটাটাই যেন থমকে গিয়েছে। জলনুপুর পায়ে দিয়ে, বাতাসে শব্দের ঝংকার তুলে ছুটতে থাকা নদীটাকে থামতে বাধ্য করেছে উন্নয়নের কারিগররা। চঞ্চলা একটা নদীকে বানিয়ে তুলেছে ‘লেক’। প্রকৃতির সঙ্গে কি চরম নিষ্ঠুরতা। পাহাড়ের পর পাহাড় ফুটো করে তৈরী করেছে একের পর এক টানেল। কোথাও কোথাও কাটতে কাটতে গোটা পাহাড়কেই ভ্যানিশ করে দিয়েছে আহাম্মকের দল। এক পাহাড়ের মাথা থেকে আর এক পাহাড়ের মাথায় তৈরী হয়েছে কংক্রিটের জঙ্গল। এত অত্যাচার প্রকৃতি কিভাবে সহ্য করে চলেছে! পাথুরে ধুলোয় নদী হারিয়েছে তার রঙ, পাহাড় হারিয়েছে তার সবুজের আবরণ, বাতাস হারিয়েছে তার সৌরভ আর তান আর ছুটির মত পাহাড়ের টানে ছুটে আসা মানুষগুলো, প্রতিনিয়ত হারিয়ে ফেলছে তাদের স্বপ্নের দৃশ্যপট। কি মর্মান্তিক!
“তা ওই অট না কি বললে সেখানে আছে টা কি?”
“মিলন আছে। মানুষের অত্যাচারে সমস্ত লাবণ্য হারানো বিয়াসের কালো স্রোতের মধ্যে মিশে যাচ্ছে হিমাচল প্রদেশের অন্যতম পবিত্র নদী তীর্থন।”
“নদী তো সবই পবিত্র। তা এর আবার আলাদা কি?”
"এ নদীর পবিত্রতায় আলাদা মাত্রা আনে স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস। তীর্থন নদী তার যাত্রা শুরু করেছে ১৩১২৪ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত তীরথ হিমবাহ থেকে। স্থানীয় মানুষ মনে করেন তীরথ হিমবাহ ক্ষেত্র অত্যন্ত পবিত্র। সেখানে কেউ জোরে কথা বলে না, কেউ কারো ক্ষতি করার কথা ভাবে না, কেউ তার সংযম হারায় না। প্রকৃতির এই পবিত্র ক্ষেত্র ঈশ্বরের জাগ্রত রূপ - এমনটাই তাদের বিশ্বাস। আর এই পবিত্র হিমবাহ থেকে জন্ম নেওয়া তীর্থন নদী তার সমস্ত যাত্রাপথে রেখে যায় পবিত্রতার ছোঁয়া। এই নদীর পবিত্র কলেবর নিজের অস্তিত্বকে বিলীন করে দিয়ে মিশে যায় বিয়াসের স্রোতধারায়।”
“ তবে তো সে মিশে যাওয়া খুব সুন্দর কি বলো!”
“না। মন খারাপ করে দেওয়া মিলন। যেন দৈত্যাকার কালো একটা সাপ নির্বিচারে গিলে ফেলছে সুন্দর, ঝলমলে, উচ্ছ্বল, নীলাভ সাদা, অতি পবিত্র এক তরুণীকে।”
“এ মা তাহলে কি বেড়ানোটাই মাটি হয়ে গেল!” - ঘাড় ঘুরিয়ে জানতে চায় বাঁশপাতিটা।
“আবার তুই বাজে বকছিস! বলছি না তানকে বলতে দে! বলোতো তান, তারপর কি কি দেখলে?”
“আমাদের গাড়িটা ছুটে চলতে লাগল তীর্থন নদীকে সাথে নিয়ে। যত উপরের দিকে উঠছি তত যেন মোহময়ী লাগছে তীর্থনকে। তবে খুব বেশিক্ষণ নয়। কিছুটা রাস্তা যাওয়ার পরই আমরা আলাদা হয়ে গেলাম নদীটার থেকে। তীর্থন উপত্যকার কয়েকটা ছোট ছোট গ্রাম পেরিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম। ক্রমশঃ কমে যেতে লাগল ঘরবাড়ির সংখ্যা আর হাতছানি দিতে লাগল চিরপাইন আর ঝাউ এর জঙ্গল।”
জঙ্গল শুরু হতেই তান তাকালো ছুটির মুখের দিকে। খুশীতে ঝকঝক করছে ওর মুখটা । জঙ্গল ছুটির খুব পছন্দ। তা সে পাহাড়েই হোক বা সমতলে। এক পশলা বৃষ্টি হয়ে যাওয়ার পর পাহাড়ি রাস্তার পাশের গাছগুলোতে আর এক বিন্দু ধুলো নেই। প্রত্যেকে মেলে ধরেছে তাদের নিজস্ব রঙের বাহার। কত রকমের সবুজ। গাঢ়, একটু ফিকে, কোনটা লালচে সবুজ, কোন গাছে লাল কচি পাতা, কোনওটায় আবার খয়েরি হয়ে যাওয়া পাতা, ঝরে পড়ার অপেক্ষায়। দূরে গ্রামের বাড়িগুলো ঝুলনের মত সাজানো। সদ্য সন্তান হারানো আপেল গাছ গুলো কেমন যেন দুঃখী হয়ে আছে। মাঝে মাঝে কয়েকটা গাছ দাঁড়িয়ে আছে কলাবৌ এর মত ঘোমটা দিয়ে। আপাদ মস্তক নেট দিয়ে ঢাকা সে গাছগুলো। তান ছুটিকে বলে - এ গাছগুলোয় বোধহয় এখনো আপেল আছে তাই না!। মাথা নাড়ে ছুটি। চিরপাইন ছেড়ে ধীরে ধীরে আরও ঘন জঙ্গলের দিকে এগিয়ে চলে দুজনে।
"তা তোমরা গাড়ি করে কোথায় গেলে!"
"অট টানেল পার হয়ে আমাদের গাড়ি ধরল ন্যাশানাল হাইওয়ে ৩০৫। এই রাস্তার স্থানীয় নাম আনি-বাঞ্জার-অট মার্গ। চলতে চলতে আমরা পেরিয়ে গেলাম বেশ কয়েকটা জনপদ। তীর্থন নদীকে পার করলাম বার তিনেক। সে একবার আমাদের ডান দিকে থাকে তো আবার চলে যায় বাঁদিকে। এই করতে করতে একসময় নদী ছেড়ে আমাদের রাস্তা উঠে গেল উপরের দিকে। নদীটা ক্রমশ: সরু হতে হতে অনেক নীচে নেমে যাচ্ছে। একসময় হারিয়ে গেল আমাদের চলার পথ থেকে। একটা মাঝারি মাপের বাজার এলো। হাতে গোনা কয়েকটি দোকান। এটা নাকি এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বাজার- বাঞ্জার। বাঞ্জার আসলে পুষ্পভদ্রা নদীর উপত্যকা।”
“ও বাবা আবার নদী!”
“ হ্যাঁ! ওখানে তো প্রতি বাঁকে পাহাড় নদীর সঙ্গে লুকোচুরি খেলে। তবে এই পুষ্পভদ্রা নদী কোথা থেকে চলা শুরু করেছে তা জানা গেল না। বাঞ্জার উপত্যকা দিয়ে চলতে চলতে সে নাকি কোন পাহাড়ের ভাঁজে মিশে গিয়েছে তীর্থন নদীর সাথে।”
‘দেখেছিস কেমন সুন্দর! একটা নদী আর একটা নদীর সাথে মিলেমিশে চলে! আর তোরা? খালি ঝগড়া করে মরিস, খাবার নিয়ে, বাসা নিয়ে আরও সব কি কি নিয়ে।”
“ইসস!” ঝাঁঝিয়ে উঠল বাঁশপাতিটা। “শুধু আমরাই ঝগড়া করি তাই না! তোমরা করোনা?”
“ওই দেখো আবার ঝগড়া করে। আরে গল্পটা শোনোই না মন দিয়ে।”
কোথা থেকে উড়ে এসে বসল আর একটা ফিঙে - “বাহ বেশ জমিয়ে গল্প হচ্ছে দেখি! তা আজ কি আর ঘরে ফেরা হবে না?”
“তান কি সুন্দর পাহাড়ের গল্প বলছে দেখো। তোমারও খুব ভালো লাগবে শোনোই না। ঘরে তো ফিরবই। চলোনা একটু তানের সাথে ঘুরে আসি!”
আরও একজন শ্রোতা বাড়ল তানের গল্পের। তান বলছে বাঞ্জারের কথা। হিমাচল প্রদেশের কুলু জেলার ছয়টি তহসিলের একটি হল এই বাঞ্জার। এটি হিমাচলের সেরাজ অঞ্চলের একটি অংশ, যার বিস্তৃতি জালোরি পাস থেকে জাঞ্ঝেলির শিখরি দেবী পর্যন্ত। কুল্লাভি ভাষার একটি উপভাষা হল সেরাজি। এই ভাষায় কথা বলার জন্য বাঞ্জার উপত্যকার অধিবাসীরাও সেরাজি হিমাচলী নামেই পরিচিত। সমস্ত বাঞ্জার উপত্যকায় অরণ্যের অভাবনীয় বৈচিত্র। নীচের দিকে খোশমেজাজী চিরপাইন, মধ্যভাগে রাসভারি দেওদার, সেডার, উচ্চভাগে উদ্বাহু ফার, রোডোডেনড্রনের সারি। তহসিলের ৪৫টি গ্রাম, বাজার দোকান, রসদ সংগ্রহ, যাতায়াত সবকিছুর জন্য এই বাঞ্জারের উপরই নির্ভরশীল।
নতুন শ্রোতা আক্ষেপ করে - “আমি তো অনেকটা শুনতে পাইনি, এবার শুনি। তা সেখান থেকে কোথায় গেলে তোমরা?”
“বাঞ্জার ছাড়াতে ছাড়াতেই আবার বৃষ্টি নামল। আমরা যাব শোজা (Shoja)। বাঞ্জার উপত্যকার উপরের দিকের স্বল্পপরিচিত একটি গ্রাম। বাঞ্জার বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় পনের কিলোমিটার। ঘন দেওদারের জঙ্গলে বৃষ্টির আওয়াজ শুনে মনে হচ্ছিল প্রকৃতি যেন খুব নীচু সপ্তকে মৃদঙ্গ বাজাচ্ছে। বৃষ্টির জন্য এত বড় জঙ্গলে তোমাদের কোন বন্ধুর গান শোনাই গেল না।”
“তান, একটু থেমে যাও। ওই মাছরাঙাটাকেও ডেকে নিই।”
মিষ্টি সুরে শিস দিতে লাগল ফিঙে। তীরের বেগে উড়ে এলো মাছরাঙাটা। কি অসাধারণ সমঝোতা। দেখে অবাক হয়ে গেল তান। যা হোক তানের গল্পের আসর দারুণ জমে উঠেছে।
“জঙ্গল ক্রমশঃ ঘন হচ্ছে। সরলরেখার মত দাঁড়িয়ে থাকা দেওদার গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে মেঘ যেন আইস বাইস খেলছে। এ গাছ থেকে ও গাছ পালিয়ে বেড়াচ্ছে আর বলছে - রাখো দেখি ধরে আমায়! কিছুক্ষণ চলার পর দেখা হল পুষ্পভদ্রার সঙ্গে”।
“ওই যে আর একটা নদী?”
“হ্যাঁ, তীর্থনের উপনদী। এসে পৌঁছলাম জিভি নামের এক জনপদে। জিভিতে পুষ্পভদ্রার দেখা মেলে বলে অনেকেই এ নদীকে জিভি নদী বলেই চেনে। আসলে এটা একটা বড়সড় পাহাড়ি ঝর্ণার মত। কিন্তু বৃষ্টির জলে ফেঁপে ফুলে সে বেশ স্বাস্থ্যবতী হয়েছে। ছোটবড় বোল্ডারে ধাক্কা মারতে মারতে সশব্দে নেমে আসছে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। ছোট ছোট বাঁকের মুখে সাদা ফেনার মত ঘুরপাক খেয়ে আবার ধরছে নীচে নামার পাথুরে রাস্তা। অসংখ্য দেওদারের সারি নদীটাকে ঘিরে রয়েছে অত্যন্ত রক্ষণশীল অভিভাবকের মত। গাছের ফাঁক দিয়ে একবার দেখা দিয়েই আচমকা হারিয়ে যাচ্ছে পুষ্পভদ্রা।”
“বাহ বেশ মজার ব্যাপার কি বলো!”
“জঙ্গলের পথ ধরে ঘন সবুজের মধ্যে আমাদের সাদা গাড়িটা যেন পালকের মত এগিয়ে চলেছে। চলে এসেছি প্রায় পাঁচ কিলোমিটার মত। মাইলস্টোন জানিয়ে দিল আমরা পোঁছে গেছি শোজা (Shoja) । বৃষ্টিতে ভিজে চারিদিক স্যাঁতস্যাঁত করছে। হাড় হিম করা ঠান্ডায় দুজনে নামলাম গাড়ি থেকে। আমাদের থাকার জায়গা - ফিরগুন হোমস্টে। আমাদের দেখে ছুটে এল কর্মচারী রাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝলাম ও আসলে রাম নয়, হাঁদারাম।”
খক খক আওয়াজ করে তানের গল্পের শ্রোতারা বুঝিয়ে দিল এই হাঁদারাম ব্যাপারটায় তারা বেশ মজা পেয়েছে।
“হোমস্টে টা ছুটির একদম পছন্দ হয়নি জানো। ওর মলিন মুখটা দেখে আমারও খুব রাগ হচ্ছিল নিজের উপর। কিন্তু কি করব! এই ইন্টারনেটের চক্করে পড়ে। অনেক করে বোঝালাম একটু কষ্ট করে নাও। অবুঝ তো একেবারেই নয়, মানিয়ে নিল সবটাই। ততক্ষণে বৃষ্টি থেমে গিয়ে সামনের পাহাড়ে দেওদারের মাথায় উঠেছে সোনালী রোদের মুকুট। তার একটু ঝলক পড়েছে ছুটির মুখেও। আমারও মনটা একটু হালকা হল বটে।”
"ওই ঠান্ডাতে কি করলে তোমরা? শরীর ফুলিয়ে বসে রইলে?"
"ধুস! আমাদের কি আর তোমাদের মত পালকের কম্বল আছে? আমাদের শরীর গরম করতে কম্বলের মধ্যে ঢুকতে হয়। হোমস্টেটার ঘরগুলো অতটা ভালো না হলেও খুব সুন্দর একটা খাওয়ার জায়গা ছিল। কাঁচের জানলাটার সামনে দাঁড়ালে মনে হত শূণ্যে ভেসে আছি। যতদূর দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের সারি, একটার সাথে একটা হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছে। কতযুগের বন্ধন ওদের! কত শতাব্দীর সখ্যতা।"
"ওখানে আমাদের বন্ধুরা আছে নিশ্চয়ই?"
"আছে তো! আকাশটা পরিষ্কার হতেই একে একে বেরিয়ে উড়ে বেড়াতে লাগল এ গাছ থেকে ও গাছে। সানবার্ড, শালিক, আর ছাতারে পাখির মত অনেক পাখি। কেউ ঠান্ডায় সারা শরীর ফুলিয়ে বসে আছে গাছের মগডালে, কেউ আবার এ ডাল থেকে সে ডালে উড়ে বেড়িয়ে গা গরম করে নিচ্ছে। সন্ধ্যা হওয়ার সময় এগিয়ে আসতেই সব জড়ো হতে লাগল গাছে গাছে। সামনের পাহাড়টার পিছনে সূর্য্য ধীরে ধীরে ঢলে পড়ল। আকাশে ছড়িয়ে থাকা ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘগুলো স্নান করতে লাগল ডুবন্ত সূর্য্য থেকে বেরিয়ে আসা রঙের আবীরে। কোনওটা খরগোসের মত, কোনওটা বা কুমীর, আবার কোনওটা দেখতে ছুটন্ত ঘোড়ার মত। ব্যস ঝুপ করে নেমে গেল অন্ধকার। পাহাড়ের কাজকম্মের দিন শেষ।"
"পাহাড়ে কেন আমাদেরও তো তাই। সন্ধ্যে হলেই বাসায় ঢুকে গুটিসুটি মেরে বসে থাকো আবার সকাল না হওয়া অবধি।"
মাছরাঙাটা হঠাৎ যেন ঘাড়ের ব্যায়াম করছে। চোখের নিমেষে উড়ে গিয়ে বসল জলাটার ধারে। ওর বোধহয় আর গল্প শুনতে ভালো লাগছে না।
"কি হল মাছরাঙার? ভাল্লাগছে না বুঝি!"
"আরে না না, শুধু গল্প শুনলে কি পেট ভরবে? ও নিশ্চয়ই জলায় কিছু খাবার দেখতে পেয়েছে। তুমি বল তারপর কি হোল?"
"ভোর না হতেই ঘুম ভেঙে গেছে। ঘরের বাইরে বসেছি দুজনে গরম ধোঁয়া ওঠা চা নিয়ে। উল্টোদিকের পাহাড়টা রোদের ছোঁয়া পেয়ে আড়মোড়া ভাঙছে। একটু একটু করে দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের কোলে ঘুমিয়ে থাকা জিভি। চলে যাওয়ার আগে ঘননীল আকাশে সাদা চাঁদটা যেন শুভেচ্ছা জানিয়ে যায় - ভালো কাটুক দিনটা। আজ আমরা যাব জালোরি পাস। ঠিক সাড়ে নটায় দুধসাদা অল্টো নিয়ে উপস্থিত ইচ্ছুভাই। ছোটখাটো চেহারা, মুখে হালকা হাসি। যা বলা হয়, তাতেই বলে - কোই বাত নহী। মাত্র পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা । হুস করে পৌঁছে গেলাম জালোরি পাস। বাঞ্জার উপত্যকা আর আনি উপত্যকার মধ্যের সংযোগক্ষেত্র এই জালোরি পাস। ১০২৮০ ফুট উচ্চতায় যেখানে আমাদের গাড়ি থামল রাস্তার সেই মোড়েই রয়েছে মহাকালী মন্দির। কিন্তু এই মন্দিরটা ঠিক হিমাচলের মন্দিরের মত নয়। তবে এই অঞ্চলের মানুষের কাছে অবশ্যই পুণ্যক্ষেত্র।
এখান থেকে দেখতে যাব সিরোলসার লেক। পাঁচ কিলোমিটার মত পায়ে হাঁটা পথ। গাড়ি থেকে নেমেই মনটা যেমন আনন্দে মেতে উঠল, তেমনি আবার খারাপও লাগতে শুরু করল।”
আবার উড়ে এসেছে মাছরাঙাটা। সঙ্গে এসেছে বেশ কয়েকটা দোয়েলও। সমস্ত ইলেক্ট্রিকের তারটা জুড়ে যেন জরুরী সভা বসেছে হরেকরকম পাখির।
“খারাপ লাগার আবার কি হোল?”
“ছুটিকে এখানে একা রেখে যেতে হবে। স্থানীয় লোকজন বলছে যেতে আসতে প্রায় চার সাড়ে চার ঘন্টা লাগবে। কি করবে এতক্ষণ একা একা। ছুটি কিন্তু ভীষণ উত্তেজিত। নিজের ছোট্ট স্যাকটায় আমাকে গুছিয়ে দিয়েছে বিস্কুট, জল। বারবার সাবধান করছে যতটা পারা যাবে আমি যেন ততটাই যাই। গাড়ি থেকে নেমেই এত তড়িঘড়ি হাঁটতে শুরু করলাম টাকার ব্যাগটা রয়ে গেল ছুটির কাছে। ক’টা লজেন্স কিনব, সেটাও গেলাম ভুলে। একটু হাঁটার পর মনে হল ভালোই হয়েছে অন্ততঃ লজেন্সের কাগজ ফেলে এই অসাধারণ পথটাকে নোঙরা করার কোন দায় আমার থাকবে না। কিন্তু এই লজেন্সের কাগজ আমার যে কি উপকার করল তা কি বলব।”
“তুমি লজেন্সই খেলে না তাও কাগজ তোমার উপকার করল! সে আবার কেমন কথা?” মুখ ঝামটা দিয়ে উঠল মাছরাঙাটা।
“আরে বাবা শোনোই না। মহাকালী মন্দিরের ঠিক পাশ দিয়ে চলে গিয়েছে হাঁটার পথ। কয়েকটা বাঁক ঘুরতেই রাস্তাটা ক্রমশঃ উঁচু হতে লাগল। হারিয়ে গেল নীচের দোকানপাট। শুরুতে একটা দুটো স্থানীয় লোকের দেখা মিলছিল, তারপর তাদেরও আর দেখা পাওয়া গেল না। ক্রমশঃ রাস্তাটা চলেছে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। কখনও একটু এবড়ো খেবড়ো, কখনো জঙ্গলের মেঠো পথ। কোথাও কোন জনপ্রাণী নেই, জঙ্গলের মধ্যে ঝাউ, বার্চ, আরও নানারকম গাছের সাথে কথা বলতে বলতে আমি এগিয়ে চলেছি একা, একেবারে একা।”
“একেবারে একা? তোমার ভয় করছিল না?” একচোখ বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করল দোয়েল।
“কিসের ভয়? এত সুন্দর প্রকৃতি একেবারে নিজের মত করে দেখতে পাওয়া এতো দারুণ ব্যাপার। নিস্তব্ধ হিমালয়ের জঙ্গল। মাঝে মাঝে ভেসে আসছে কিছু পাখির ডাক, আর ছোটছোট জলধারার কলকল আওয়াজ। আর গাছ থেকে খসে যাওয়া পাতার স্তুপের উপর দিয়ে হেঁটে চলেছি আমি। কানে আসছে নিজের চলার শব্দ। গাছগুলো ক্রমশঃ ছোট হয়ে আসছে। এ জঙ্গলে দেওদার পাইনের দেখা মেলে না। কোথাও কোন বোর্ড নেই। ঠিক পথে চলছি কিনা, কতদূর এলাম, কতদূর যেতেই বা হবে কিছুই বোঝার কোনও উপায় নেই। একেবারে যাকে বলে হারা উদ্দেশ্যে পথ চলা। চলতে চলতে কোথাও রাস্তায় বোল্ডার পেতে সিঁড়ির ধাপ করে রাখা হয়েছে।
মনে হয় বোধহয় এই কটা ধাপ উঠলেই সিঁড়ি ভাঙার শেষ। কিছুদূর ওঠার পর রাস্তা যায় বেঁকে, বদলে যায় জঙ্গলের রূপ। হঠাৎ গাছের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারে বরফের চাদরে ঢাকা ধৌলাধার পর্বতমালার একটা টুকরো। বাদামী মেঠো রাস্তা, তার পাশে ঘন সবুজ জঙ্গল, ফাঁকে ফাঁকে দুধসাদা বরফের পাহাড়চুড়া আর তার মাথায় ঘননীল আকাশ। সবটা মিলিয়ে যেন ক্যালেন্ডারের একটা পাতা। চোখ জোড়ানো সৌন্দর্য।”
"সে না হয় হল। তা এর মধ্যে লজেন্স কোথা থেকে এল বললে না তো!"
"আরে বলছি তো একটু অপেক্ষা কর। রাস্তার এমন অসাধারণ শোভা দেখতে দেখতে আমি তো এগিয়ে চলেছি। মাঝে মাঝে কয়েকটা ছোট ছোট অস্থায়ী ক্যাম্প চোখে পড়ছে। চেয়ার টেবিল সবই সাজানো আছে, কিন্তু কোন মানুষ নেই। ঝাউ গাছের ছায়ায় ছোট ছোট বিশ্রাম নেওয়ার জায়গা করে রাখা আছে। পাহাড়ি পথ চলার এ এক আনন্দ। চড়তে চড়তে যখন ক্লান্ত লাগে, দুদন্ড ছায়ায় বসলেই আবার চাঙ্গা। এরকম ভাবে বেশ কয়েকটা ক্যাম্প ছেড়ে আসার পর এলো ৩৬০ ডিগ্রী নামের একটা বেশ বড় ক্যাম্প। ঠিক এই ক্যাম্পটার সামনে এসেই চলার রাস্তা টা দুভাগ হয়ে গেছে। একটা চলে গেছে নীচের দিকে, অন্যটা উপরের দিকে। কোনটা যে গন্ত্যব্যে পৌঁছনোর সঠিক রাস্তা তা বোঝার কোন উপায় নেই, জিগ্যেস করার জন্য পথে আর একটি মনিষ্যিও নেই। পুরো ধাঁধায় পড়ে গেলাম। এইরকম নির্জন জঙ্গলে পথা হারালে দুর্গতির সীমা থাকবে না। কি যে করি!"
"ব্যস গেলে তো হারিয়ে! সব গল্প খতম।"
"অত সোজা নাকি। এতটা রাস্তা এগিয়ে গিয়ে ফিরে আসা যায়! রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করলাম। দেখলাম নীচের দিকে যে রাস্তাটা চলে গেছে সেটাতে পাতা ছাড়া আর কিছু পড়ে নেই। বুঝলাম ওটা স্থানীয় গ্রামবাসীর গ্রামে যাওয়ার রাস্তা। অন্য রাস্তাতে লজেন্সের কাগজ, চুইংগামের খোল, প্লাস্টিকের বোতল এ সব ছড়িয়ে আছে। বুঝলাম পাহাড়ে চড়তে আসা হিরোর দল এই পথ দিয়েই গেছে লেকের দিকে। যেতে যেতে নির্বিচারে নোংরা করে গেছে রাস্তাটাকে। এ পথিক তো আর ফিরে আসবে না! এই ভাবে লজেন্সের কাগজ আমাকে এ যাত্রা হারিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে দিল।"
"তুমি হয়তো বেঁচে গেলে, কিন্তু আমাদের বন্ধুদের কত বিপদ বলো। খাবার ভেবে এইসব ছাইভস্ম খেয়ে ফেললে বেচারা বেঘোরে প্রাণ হারাবে।"- মন খারাপ করে বলে উঠল দোয়েলটা।
"একদম ঠিক কথা বলেছ। কিন্তু কে আর এই সত্যি টা বুঝছে বলো! চলতে চলতে আমি বেশ অনেকটা উঠে এসেছি। প্রায় ঘন্টা দেড়েক ধরে একনাগাড়ে হেঁটে চলেছি। কখনো চড়াই, কখনো উতরাই। এতক্ষণে একজন ভদ্রলোককে নেমে আসতে দেখলাম। জিগ্যেস করলাম আর কত পথ বাকি। উনি বললেন আর মিনিট কুড়ি লাগবে। ধড়ে প্রাণ এলো। আমি তাহলে গন্তব্যের প্রায় কাছাকাছি। শেষ ক্যাম্পটাতে দুজন স্থানীয় মানুষের দেখা মিলল। তাঁরা দেখিয়ে দিলেন লেকের পথ। পথের বাঁকে এসে রাস্তা টা সোজা নেমে গেছে ঢাল হয়ে। একটা নালা পার হয়ে আবার উঠতে হল অপর পারে। এরপরেই একটা মাঠের মত গোল জায়গা। বেশ কয়েকটি দোকান পাট রয়েছে সেখানে। তার মধ্যে এক দোকানের দোকানী পার্বতী ভার্মা। আমাকে জানিয়ে দিলেন পৌঁছেই গিয়েছি আমি। ঠিক যেখানে মাঠটা শেষ হল, সেখান থেকেই নেমে গিয়েছে বেশ কয়েকটা সিঁড়ি। কয়েকধাপ নামার পরেই দেখতে পেলাম লম্বা গাছের সারি দিয়ে ঘেরা লেকটা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বেশ অনেকটা নষ্ট করে দিয়েছে মানুষের তৈরী সবুজ রঙের বেড়া। কিন্তু স্থির সবুজ জলে চারিদিকের গাছের ছায়া বেশ মোহময়ী করে তুলেছে ১০৪৯৬ ফুট উচ্চতায় ধ্যানস্থ প্রকৃতির এই একখন্ড জলরাশিকে।"
তানের সমস্ত শ্রোতার দল মুগ্ধ হয়ে শুনছে প্রকৃতির কোণায় লুকিয়ে থাকা এই রোমাঞ্চকর জায়গার কথা। "লেকটির ঠিক বাঁ পাশে একটু উঁচুতে রয়েছে একটি মন্দির। হিমাচল প্রদেশের মন্দিরের মত কাঠের কাজ এই মন্দিরে না থাকলেও এই মন্দিরের প্রাচীনত্ব সম্পর্কে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। এই মন্দিরে পূজিত হন বুড়ি নাগিন। অবয়বের নিরিখে তিনি কালীরই রূপ। কিন্তু এই বুড়ি নাগিনকে ঘিরে রয়েছে বিচিত্র লোকগাথা। তার কয়েকটি মুখে মুখে চলে আসছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। সমগ্র হিমাচল প্রদেশে নাগদেবতার আরাধনা হয় বিভিন্ন মন্দিরে। এই লোকগাথা সেই প্রাদেশিক সংস্কৃতির একটি অঙ্গবিশেষ।
কেউ বলেন বুড়ি নাগিন কোন এক সময় জঙ্গলের পথে চলতে চলতে পৌঁছে যান এই অঞ্চলে। তাঁর কাঁধে ছিল অনেক বাসনপত্র। তিনি যখন এই অঞ্চলে পৌঁছোন, তখন সেখানে একদল বালিকা খেলা করছিল। বুড়ি নাগিন এই অঞ্চলে বাস করবেন বলে মনস্থ করেন। কিন্তু ওই বালিকার দল তাদের জায়গা ছাড়তে নারাজ। অবশেষে স্থির হল দুপক্ষকেই খেলায় অংশ নিতে হবে। যে পক্ষ জিতবে সেই পক্ষের দখলে যাবে এই অঞ্চল। বালিকাদের ধারণা ছিল বুড়ি নাগিনের বয়স হয়েছে, খেলায় জেতা তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে না। কিন্তু তাদের সমস্ত ধারণা ভুল প্রমাণ করে খেলায় জিতে অঞ্চলের দখল নেন বুড়ি নাগিন। কাঁধ থেকে নামিয়ে রাখেন বাসনপত্র। আর সেই বাসনপত্রের ভারে পাথুরে মাটি বসে গিয়ে তৈরী হয় আজকের সিরোলসর লেক। বিশ্বাস অবিশ্বাসের কথা আলাদা, কিন্তু এ ধরণের লোকগাথা আর প্রকৃতি সাধনার এইরকম হাজারো উদাহরণ ছড়িয়ে আছে আমাদের দেশের আনাচে কানাচে।
অন্য একটি প্রচলিত লোকগাথা বলে বুড়ি নাগিন আসলে শেষনাগ, কমরুনাগ, ঘুন্ডানাগ, মাহুনাগ অর্থাৎ হিমাচলে উপাসিত সমস্ত নাগদেবতার মা। এই সিরোলসর লেকের জলের নীচে রয়েছে তাঁর স্ব্বর্ণখচিত প্রাসাদ। এই পাহাড়ের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে কোন এক ব্রাহ্মণ এই হ্রদের কাছে এসে পড়েন এবং এর জলে ডুবে যান। সেই সময় বুড়ি নাগিন তাকে বাঁচান এবং নিজের প্রাসাদে নিয়ে গিয়ে রাখেন। বেশ কিছুদিন পর ব্রাহ্মণ নিজের পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে বুড়ি নাগিন তাকে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেন একটা শর্তে। ব্রাহ্মণ কোন অবস্থাতেই কাউকে বুড়ি নাগিনের কথা বলতে পারবেন না। ব্রাহ্মণ রাজি হন। পরিবারের লোকেরা ব্রাহ্মণের জীবিত থাকার আশা তো প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন, স্বাভাবিক ভাবেই তাঁকে ফিরে পেয়ে তাদের আনন্দ আর ধরে না। বেশ কিছুদিন পরে পরিবারের সদস্যরা জানতে চায় তাঁর বেঁচে ফেরার কাহিনী। অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই তাদের নিরস্ত করতে পারেননা ব্রাহ্মণ। অবশেষে নাছোড়বান্দা পরিবারের সকলকে বলে ফেলেন বুড়ি নাগিনের কথা। আর এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই ব্রাহ্মণের মৃত্যু হয়। বুড়ি নাগিন অত্যন্ত সম্ভ্রমের সঙ্গে পূজিত হন এই সিরোলসর অঞ্চলে। পার্শ্ববর্তী খান্নাগ গ্রামের সমস্ত বাসিন্দা এই হ্রদকে অত্যন্ত পবিত্র বলে মানেন এবং এই হ্রদের জলের রোগ নিবারণ ক্ষমতা আছে বলেও বিশ্বাস করেন। বুড়ি নাগিন ভক্তদের সমস্ত মনোবাসনা পূর্ণ করেন এমনটাই স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস"।
বাঁশপাতির খুব কৌতুহল। "তুমি পুজো করলে ওই মন্দিরে?"
"না। দূর থেকে শ্রদ্ধা জানালাম। শিবশম্ভুর কাছে নিবেদন জানালাম তিনি যেন স্বমহিমায় এই পবিত্র ক্ষেত্রকে সুরক্ষিত রাখেন। কয়েকটা ছবি তুলে ফেরার রাস্তা ধরলাম। ছুটিটা কতক্ষণ একা একা বসে আছে। দুশ্চিন্তা করছে হয়তো। ফেরার রাস্তাটা চলতে একটু বেশি সময় লাগছে। বেশ কয়েকবার বসলাম। গলাও শুকিয়ে যাচ্ছে বারবার। পা চালিয়ে নামার চেষ্টা করছি। আকাশের মুখটা কেমন ভার। এখানে যদি বৃষ্টি নামে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভেজা ছাড়া কিছু করার নেই। আমি যখন নামছি তখন বেশ কয়েকদল যাত্রী উপরে উঠছে। কয়েকটি বাচ্চা লাফাতে লাফাতে চলেছে। পাহাড়ের প্রতি কেমন তাচ্ছিল্যের মনোভাব। বেশ অনেকটা পথ নেমে এসেছি জালোরি পাসের দিকে। এবার মনটা ছুটির জন্য ছটফট করছে। কি জানি কি করল এতটা সময়। একেবারে এসেই পড়েছি। কোন দিকে না তাকিয়ে সোজা যাব মন্দিরের কাছে যেখানে ছুটিকে ছেড়ে এসেছিলাম। হঠাৎ কে যেন ডেকে উঠল - এইই! দেখি বেশ খানিকটা এগিয়ে এসে একটা দোকানে বসে আছে ছুটি। শনশন ঠান্ডা হাওয়া বইছে। আহা! এই ঠান্ডায় বসে থাকতে বেচারার কত কষ্টই না হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতির এমন মনোরম শোভা খুব কাছ থেকে দেখার লোভ কি সামলানো যায়! তাই গাড়িতে না বসে প্রকৃতির কোলেই এতটা সময় কাটিয়ে দিয়েছে ছুটি। আর থেকে থেকে তাকিয়েছে সেই পথটার দিকে যেখান দিয়ে আমি ফিরে আসব।"
"ছুটি কি ভালো বন্ধু গো তোমার! কেমন অপেক্ষা করে বসেছিল তোমার জন্য!"
"হ্যাঁ। ঠিক যেমন তোমার মিনসে তোমার জন্য বাসায় বসে থাকে।"
"উঁহ। ছাই থাকে। যাকগে বলো তারপর ফিরে এলে?"
"ওই দোকানের ভদ্রলোক খন্নাগের বাসিন্দা। হিমাচলী সুপুরুষ। লম্বা কোট পরে সামলাচ্ছেন ওই হাওয়ার মুখে সাজানো দোকান। পরম যত্নে আমাদের খাওয়ালেন হিমাচলের খাবার সিড্ডু, সঙ্গে গরম গাওয়া ঘি এর টাকনা, বেশ লাগল খেতে। কয়েক মিটার হেঁটেই আমরা পৌঁছে গেলাম গাড়ির গাছে। ইচ্ছুভাই অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। একটা স্থানীয় দোকানে ঢুকে খাব ঠিক করলাম আমরা। আসল উদ্দেশ্য স্থানীয় মানুষের সাথে একটু কথাবার্তা বলা। কিন্তু আকাশটা ক্রমশ: ভারী হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি নামবে। আমরা শোজায় ফেরার রাস্তা ধরলাম"।
"কি ভালো! ফিরে এসে টেনে ঘুম দিলে বলো?"
"ঘুম কি গো। ঘরে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। তুমুল বৃষ্টিতে চারিদিক সাদা। অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে সমস্ত পাহাড়, জঙ্গল, রাস্তা। জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম সাদা সাবুদানার মত বরফ ভর্তি হয়ে গিয়েছে সামনের বাগানটায়। কি যে সুন্দর দেখাচ্ছে চারদিকটা। হঠাৎ একটা আলোর ঝলকানি দেখতে পেলাম। কান ফাটানো আওয়াজ করে বাজ পড়ল। ব্যস মুহুর্তের মধ্যে চারিদিক অন্ধকার। পাহাড়ে বিদ্যুৎবিভ্রাট মানে সে যে কবে ঠিক হবে তা কেউ জানে না। হাঁদারামকে বলা হল মোমবাতি আনতে সে গেল তো গেলই। অন্ধকারে ভুতের মত বসে আছি আমি আর ছুটি। বেশ লাগছিল দুজনে ঠান্ডায় গুটিসুটি মেরে বসে থাকতে। চারদিক ঘুরঘুট্টি অন্ধকার, মাঝে মাঝে এক একটা গাড়ির হেডলাইট দেখা যাচ্ছে আর মনে হচ্ছে এই বুঝি কারেন্ট এল। রাতের খাবারের সাথে প্রায় মোমবাতি এল। অন্ধকারে কি যে খেলাম কিছুই বোঝা গেল না। শুধু এটা বোঝা যাচ্ছিল যে বৃষ্টি থেমেছে। নীচে জিভির বাড়ির আলোগুলো তারার মত চকমক করছে, যেন ব্যঙ্গ করছে আমাদের ওই অন্ধকার শোজাকে।"
"এই তোরা সবাই মিলে এখানে কিসের মিটিং করছিস রে! আবার কার কি সমস্যা হল?"
হইচই করতে করতে একদল ছাতারে উড়ে এল। এক মুহুর্তে শান্ত সভা হয়ে উঠল হট্টমেলা।
ফিঙে যথেষ্ট বিরক্ত- "তোরা যেখানেই যাবি গোল বাঁধাবি। শোন না চুপ করে তান কেমন অন্য এক দুনিয়ার গল্প বলছে। একদম অন্যরকম সব কিছু। বলো না তান"
"ঘুম ভাঙতেই চারিদিকে আলো ঝলমলে একটা মিষ্টি সকাল। চা এর সন্ধানে বেরোন হল রাস্তায়। এক মহিলার মনোহারি দোকানের পাশেই ছোট্ট খাওয়ার জায়গা। চা অর্ডার করে ঢুকলাম। সামনে আদিগন্ত পাহাড় রোদের রোশনাইতে ঝলমল করছে। যতদূর দেখা যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। আর আকাশের যে সীমানায় গিয়ে দৃষ্টি আটকে যায় সেখানে দু'হাত ছড়িয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ধৌলাধার পর্বতশ্রেণী।
ছুটি বলল ওই বাড়িটায় আর থাকব না। এই বাড়িটায় থাকলে কেমন হয়? যেমন ভাবা তেমন কাজ। দশ মিনিটের মধ্যে ব্যাগপত্র গুছিয়ে আমরা বদলে নিলাম আমাদের ঠিকানা। ফিরগুণ থেকে কিরণ হোমস্টে। গোপী ঠাকুর আর তার স্ত্রী অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে চালায় এই হোমস্টে। যেমন ঝকঝকে পরিষ্কার ঘর, তেমনি ঘর থেকে দেখা পাহাড়ের অনবদ্য দৃশ্য। ছুটির খুশি আর ধরে না। সারাটা দিন কাঠের বাড়িটার বারান্দায় বসে তাকিয়ে রইলাম পাহাড়গুলোর দিকে। কিছুক্ষণ বাদে বাদেই বদলে যাচ্ছে পাহাড়গুলোর রঙ, নীচের দিকের একটা বাড়িতে কি যেন অনুষ্ঠান হচ্ছে। পায়ে পায়ে নেমে যাচ্ছে গ্রামের লোকজন। কিন্তু কোন শোরগোল নেই, এতটুকু বিঘ্নিত হয় না পাহাড়ের শান্তি। একটা গাড়ি নিয়ে আমরা গেলাম জিভি ঘুরতে। গোটা পথটা দেওদারের ঘন জঙ্গল। দিনের বেলাতেও প্রায় অন্ধকার। চারিদিকে কেমন যেন রহস্যের গন্ধ। আমাদের গাড়ির শব্দ ছাড়া আর কোন আওয়াজ নেই কোথাও। জোরে কথা বলতেও যেন খারাপ লাগে। মনে হয় প্রকৃতির উপর অবিচার করছি। মাত্র কিলোমটার ছয়েক। পৌঁছে গেলাম জিভি ঝর্নায়। গাড়ি থেকে নেমেই দেখা হয়ে গেল লম্বা লেজওয়ালা এক ম্যাগপাই এর সঙ্গে। কি তার রূপ।
ছুটি বলল ওই বাড়িটায় আর থাকব না। এই বাড়িটায় থাকলে কেমন হয়? যেমন ভাবা তেমন কাজ। দশ মিনিটের মধ্যে ব্যাগপত্র গুছিয়ে আমরা বদলে নিলাম আমাদের ঠিকানা। ফিরগুণ থেকে কিরণ হোমস্টে। গোপী ঠাকুর আর তার স্ত্রী অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে চালায় এই হোমস্টে। যেমন ঝকঝকে পরিষ্কার ঘর, তেমনি ঘর থেকে দেখা পাহাড়ের অনবদ্য দৃশ্য। ছুটির খুশি আর ধরে না। সারাটা দিন কাঠের বাড়িটার বারান্দায় বসে তাকিয়ে রইলাম পাহাড়গুলোর দিকে। কিছুক্ষণ বাদে বাদেই বদলে যাচ্ছে পাহাড়গুলোর রঙ, নীচের দিকের একটা বাড়িতে কি যেন অনুষ্ঠান হচ্ছে। পায়ে পায়ে নেমে যাচ্ছে গ্রামের লোকজন। কিন্তু কোন শোরগোল নেই, এতটুকু বিঘ্নিত হয় না পাহাড়ের শান্তি। একটা গাড়ি নিয়ে আমরা গেলাম জিভি ঘুরতে। গোটা পথটা দেওদারের ঘন জঙ্গল। দিনের বেলাতেও প্রায় অন্ধকার। চারিদিকে কেমন যেন রহস্যের গন্ধ। আমাদের গাড়ির শব্দ ছাড়া আর কোন আওয়াজ নেই কোথাও। জোরে কথা বলতেও যেন খারাপ লাগে। মনে হয় প্রকৃতির উপর অবিচার করছি। মাত্র কিলোমটার ছয়েক। পৌঁছে গেলাম জিভি ঝর্নায়। গাড়ি থেকে নেমেই দেখা হয়ে গেল লম্বা লেজওয়ালা এক ম্যাগপাই এর সঙ্গে। কি তার রূপ।
ঝর্ণার স্রোতটাকে পাথর দিয়ে বেঁধে কিছুটা কৃত্রিম করে ফেললেও ঝর্ণা পর্যন্ত পৌঁছানোর রাস্তাটা এতটুকু হারায়নি তার নিজস্বতা। স্যাঁতস্যাঁতে পাথরের গায়ে ফার্ণের আলপনা। কত যে বিচিত্র তার ধরণ। প্রকৃতির নিখুঁত চিত্রকলা। কয়েক পা হেঁটেই পৌঁছে গেলাম জিভি ঝর্ণা। কিছু সময় মোহিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম ওই অবিরাম পড়তে থাকা জলধারার দিকে। যেন ধ্যানমগন মহাযোগীর মাথায় প্রকৃতির অনন্ত বর্ষণ। ছুটির আনন্দ আর বাঁধ মানে না। আপনমনে গেয়ে ওঠে - হাঁ রে রে রে রে রে আমায় ছেড়ে দে রে দে রে। ছুটির অসামান্য সুরেলা কন্ঠ আর ঝর্ণার কলতান দু’য়ে মিলে এক মহাজাগতিক পরিবেশের সাক্ষী হয়ে রইলাম আমি।
“তুমি গান গাইলে না?”
“ধুর কি যে বলো! ছুটি গান গাইলে আমি গান গাইবার চেষ্টাই করি না। আমি শুধু অনুভব করলাম কত সৌভাগ্য আমার।
শোজা থেকে জিভির দূরত্ব কম হলেও উচ্চতার ফারাক প্রায় তিনহাজার ফুট। ফলে দুটি জায়গার প্রাকৃতিক দৃশ্যের বিস্তর ফারাক। জিভির বুক চিরেই বয়ে চলেছে পুষ্পভদ্রা। ঘন জঙ্গলের মধ্যে পাহাড়ের কোলে সাজানো গোছানো সুন্দর গ্রাম জিভি। অতিথিদের জন্য সাজানো আছে হাজারো পসরা। স্থানীয় ফল থেকে তৈরী বিভিন্ন স্বাদের ওয়াইন সাজিয়ে বসে আছে একের পর এক দোকানী। নিজের ছোট দোকানে একমনে সোয়েটার বুনে চলেছে রোমা ভার্মা। মুখের মিষ্টি হাসি আর আন্তরিক আলিঙ্গন শহুরে কেতাদুরস্ত উচ্চশিক্ষিত সেলসগার্লের থেকে অনেক বেশি আকর্ষণীয়। মনের কোণায় কোথায় যেন দাগ কেটে যায়, মনে হয় ক্যামেরায় বন্দি করে রাখি মেয়েটাকে।
“শুধু ছবি তুললে! কিছু কিনলে না ওর কাছ থেকে?” ঝাঁঝিয়ে উঠল এক ছাতারে
“কিনলাম তো। ছুটির জ্বালায় না কিনে পালানোর জো আছে! কিনেই পরেও ফেললাম সোয়েটারখানা। বরফে ঢেকে যাওয়ার সময় হল গ্রামটার। তোড়জোড় চলছে বেশ কিছুদিনের বেঁচে থাকার রসদ গুছিয়ে রাখার। ছবির মত সুন্দর গ্রাম আর শিশুর মত সরল মানুষগুলোর সাথে বেশ কিছু সময় কাটিয়ে ফিরে এলাম শোজায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝুপ করে নামল অন্ধকার। রীতিমতো বুকের পাটা নিয়ে সারা সন্ধ্যেটা ছুটির সাথে অন্ত্যাক্ষরী খেলে কাটিয়ে দিলাম। রাতে যখন নীচে নামলাম কৃষ্ণপক্ষের আকাশে চাঁদ একটু নরম হয়েছে। আকাশে ঝকঝক করছে একদল তারা। একদিকে ধ্রুবতারা আর একদিকে সন্ধ্যাতারা যেন পরস্পরের দিকে তাকিয়ে আছে চিরবিরহী যুগলের মত। দুজনের মধ্যে দূরত্ব লক্ষ যোজন কিন্তু কেউ কারো থেকে চোখ ফেরায় না। ভোর না হতেই ঘুম ভেঙেছে। কত আর ঘুমোব? ধৌলাধারের আকাশে শুরু হয়েছে হোলিখেলা। প্রথমে হালকা লাল, তারপর সোনালি, তারপর গোলাপী আর সবশেষে সত্যিকারের নীল আকাশ। যে নীলের কোন তুলনা হয় না। একেবারে নিষ্কলঙ্ক, নির্মল, অভ্রনীল। সমস্ত পর্বতশ্রেনী যেন আড়মোড়া ভাঙছে তার মায়ের আদরের স্পর্শ নিয়ে।”
“ভোরের আলোয় আমরাও এরকমভাবেই জাগি। কিন্তু আমাদের জাগা এত যত্ন করে কেউ দেখেনা। যাক গে বলো তোমার কথা।”
“আমাদের বেড়ানো শেষ। রাতে অট থেকে ধরব দিল্লী ফেরার বাস। কিন্তু গোটা দিনটা চেটেপুটে নেব তীর্থন নদীর আনন্দ। গাড়ি ধরে সোজা তীর্থন উপত্যকা। কি অপূর্ব চঞ্চলা নদী এই তীর্থন। নদীখাতের দুধারে ঘন সবুজ পাহাড় আর তার বুকে স্থানীয় মানুষের ধাপ চাষ। আর মাঝে মাঝেই কলাবৌ এর মত ঢাকা দেওয়া গাছগুলো। নদীর স্রোতটা যেন তালে তালে ছুটে চলেছে পাথরে ধাক্কা খেতে খেতে - ছম ছম ছম। ধারে ধারে নয়নাভিরাম হোমস্টে আর কাফে। কোথাও রোদ পড়ে চকচক করছে নীল জলের ধারা আর একটু ছায়া পেলেই রঙ বদলে তার মুখ ভার।
ফলের দোকানে দেখা মিলল এক অশীতিপর আপ্পীর। আমাদের হামলে পড়ে আপেল কেনা দেখে এগিয়ে এলেন। হাতে তুলে নিলেন বড় টমাটোর মত দেখতে একটা ফল। নাম একটা বললেন, ভাঙাচোরা উচ্চারণে মনে হল জোবানি। বললেন এ অঞ্চলে আপেলের থেকে বেশি এর ফলন আর খেতে নাকি আপেলের যেয়ে ঢের ভালো। শুধুমাত্র এই বয়স্ক মানুষটার অনুরোধ রাখতেই কিনে ফেললাম দুখানা। একটা কাফের পাশ দিয়ে নদী পর্যন্ত চলে এসেছি দুজনে। তীর্থনের কাঁচের মত জলের নীচে দেখা যাচ্ছে ছোটবড় হাজারো নুড়ি যারা না জানি কত যুগ ধরে ধন্য হয়ে আসছে এই পবিত্র জলধারার পূণ্য স্পর্শসুখে।
একদম সামনে এসে দেখা মিলল একটা ঘোমটা পড়া গাছের। ওমা এ তো আপেল নয়! এ যে অন্য ফল। ওই জোবানি। না আসলে এই ফলকে ওরা বলে জাপানী ফল। পারসিমোন - জাপানের জাতীয় ফল। সম্প্রতি হিমাচলের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এই ফলের চাষ হয় রমরমিয়ে। পরিপক্ক ফলকে তোমাদের হাত থেকে বাঁচাতে অমন ঘোমটা পরিয়ে রাখা হয়।”
“ কি জ্বালা বল! শুধু তোমরা খাবে! আমরা খাবো না! এ কিন্তু ভারি অন্যায়।”
“অন্যায় তো বটেই। অর্থ আর বৈভবের পিছনে ছুটতে ছুটতে এমন হাজারো অন্যায় নিরন্তর করে চলেছে মানুষ। আর পরম সহনশীল প্রকৃতি সহ্য করে যাচ্ছে সমস্ত অন্যায়। অপেক্ষা করছে সহ্যের সীমা ছাড়ানোর। প্রকৃতি নিরন্তর নিজেকে নি:শেষ করে তার সন্তানদের হাতে তুলে দিচ্ছে স্বাচ্ছন্দের পসরা। প্রত্যন্ত পাহাড়ের মানুষ এখন আবহাওয়ার খবর নেওয়ার জন্য ইন্টারনেটে চোখ রাখে। পাহাড়ের বিদ্যুৎবিভ্রাট এখন আর একদিনের বেশি স্থায়ী হয় না। বাতিস্তম্ভের আলোয় এখন তারারা মুখ লুকায়। অশীতিপর আপ্পি এখন দেশের ফসল ছেড়ে বিদেশের ফলের তরফদারি করেন। কিন্তু তবু কোন অমোঘ টানে একটু কাজের ফাঁক পেলেই আমরা ছুটে যাই একটু নির্জনতার সন্ধানে, প্রকৃতির ঘনসবুজ গালিচায় দুদন্ড জিরিয়ে নিতে আর তোমরা তাকিয়ে থাকো আমাদের বন্ধ জানলাগুলোর দিকে।"

বাহ্.....গল্প দিয়ে হিমাচলের এক জনবিরল উপত্যকার পর্বত-অরণ্যের পবিত্র ছবি এঁকে দিলে। যেখানে পথ চলাতেই আনন্দ। আর তাতে ভারি শ্রুতিমধুর আবহ রচনা করলো
ReplyDeleteফিঙে আর বাঁশপাতিরা।
কিন্তু পাখিদের যে ডানা থাকে।তারা বাসা ছেড়ে দূর আকাশে উড়ে যেতে ভয় পায় নাকি? তোমার ঘরকুনো পাখিগুলোকে বলো শুধু গপ্প শুনলে চলবে না।একটু অভিযাত্রী হতেও হবে।
Golpo bolar arale Himalay er kole osadharon prakritik soundorjo chhobir moto fute uthechhe. Sthaniyo lokogatha, jonoshruti, bibhinno nodi o lake er mahatyo sotyi i somriddho kore. Onek dhonyobad.🙏🙏🙏
ReplyDeleteSuman
Asambhob sundar monomugdhokar bernonar shobhajatra. Chhobi r moto samne dekhlam o poth chollam.
ReplyDelete