Wednesday, 26 May 2021

পদ্ম-পিনাক পাণি

                      আজ বুদ্ধপূর্ণিমা। ভগবান বুদ্ধের পুণ্য আবির্ভাব তিথিতে আজ আকাশের মুখ ভার। দেখা নেই পূর্ণিমার চাঁদের। এমনই এক চাঁদহীন পূর্ণিমা ছিল সেদিন। কোজাগরী পূর্ণিমা। রাতটা কেটেছিল হিমাচল প্রদেশের লাহুল স্পিতি জেলার এক বিখ্যাত জনপদ, উদয়পুরে (উদেপুর নামেও পরিচিত)।  প্রকৃতি যেমন হিমালয়ের অনন্য সম্পদ, ঠিক তেমনই হিমালয়ের পথে পথে এমন কিছু সম্পদের দেখা মেল্‌ যা ভারতের সভ্যতা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় সহনশীলতার সুদৃঢ় বুনিয়াদের নিদর্শন।  প্রত্যন্ত সীমান্ত পাঙ্গি উপত্যকা থেকে ফেরার পথে  উদয়পুর পৌঁছতে প্রায় অন্ধকার হয়ে গেল। হিমালয়ের কোলে কোজাগরী পূর্ণিমার রাত কাটানো যে কোন হিমালয়প্রেমীর কাছে অত্যন্ত লোভনীয়। আমরাও সেই স্বপ্নেই বিভোর ছিলাম। কিন্তু বিধি বাম। উদয়পুর পৌঁছনোর কিছু আগে পথেই নামল তুমুল বৃষ্টি। উদয়পুর থেকে  কেলং যাওয়ার পথে ৯ কিলোমিটার যাওয়ার পর রাস্তা বেঁকে গেল পাহাড়ের একদম শেষ প্রান্তে। বৃষ্টি ভেজা এই রাস্তাটুকু আসতে অনেক সময় লেগে গেল। সেই সঙ্গে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা আর রক্ত জমিয়ে দেওয়া হাওয়া। 

                         গাড়ি থেকে নেমে অল্প কিছুটা রাস্তা হেঁটে  পাহাড়টার একদম শেষ প্রান্তে পৌঁঁছে  গেলাম। খাড়া পাহাড়ের নীচে বয়ে চলেছে চন্দ্রভাগা। বৃষ্টির জন্য সব ধোঁয়া মনে হচ্ছে। একদম শেষ মাথায় দেখতে পাওয়া যাচ্ছে দুধ সাদা মন্দিরের চুড়া - ত্রিলোকীনাথ। এই মন্দির ভারতবর্ষের ধর্মীয় সহনশীলতার ইতিহাস বহন করে। আসল মন্দিরটির অস্তিত্ব বিলুপ্ত। কেউ বলেন এ মন্দির পান্ডবদের  বানানো আবার কেউ বা বলেন কুলুর রাজপরিবার এই মন্দির নির্মাণ করেছেন। তা সে যেই নির্মাণ করুক না কেন এ মন্দিরের আকর্ষণ এর ধর্মীয় গ্রহণ যোগ্যতায়। বৌদ্ধ ধর্মের সাথে হিন্দু ধর্মের চিন্তা ভাবনায় মৌলিক বিভেদ থাকলেও তা যে কখনো সামাজিক গঠনে ভাঙ্গন ধরায়নি, এই মন্দির তার অন্যতম উদাহরণ। কথিত আছে এই মন্দিরের জায়গায় একসময় বৌদ্ধ বিহার ছিল। পরবর্তী সময়ে হিন্দু ধর্মের মানুষ এখানে শিব পূজা শুরু করেন । অন্য একটি মত অনুসারে ত্রিলোকীনাথ আদতে শিব মন্দির যেখানে বৌদ্ধ গুরু পদ্মসম্ভব অষ্টম শতাব্দী তে ভগবান বুদ্ধের আরাধনা শুরু করেন। ইতিহাস যাই বলুক না কেন এখানে হিন্দু ও বৌদ্ধ উভয় ধর্মের মানুষ আসেন। বিগ্রহকে যে জ্ঞানে পূজা করতে তিনি ইচ্ছুক, সেই জ্ঞানেই পূজা করার স্বাধীনতা সমস্ত ভক্তের আছে। 

                        মন্দিরের প্রবেশ পথ বেশ সংকীর্ণ। চাতালে দাঁড়ালে মনে হয় কোন একটি বাড়ির উঠোনে গৃহদেবতার মন্দির। এটি ভারতবর্ষের একমাত্র মন্দির যে মন্দিরের বিগ্রহ বৌদ্ধ লামা এবং হিন্দু পুরোহিত একসাথে পূজো করেন। মন্দিরের চাতালে শিবের বাহন নন্দী র জন্য একটি ছোট্ট একটি চালা করা আছে। পাশে একটি ঘরে রাখা আছে বৌদ্ধ দের Prayer wheel। 

                                                                       ত্রিলোকীনাথ মন্দির

                    মন্দিরের বিগ্রহ বড় বিচিত্র। বিগ্রহটির ছয় হাত,  যা ভগবান বুদ্ধের অবলোকিতেশ্বর রূপ। বিগ্রহের মাথায় শিবের জটা। হাতে জপমালা। শিবের গলায় উপবীত, কোমরে পেঁচানো সাপ। বুদ্ধের  গলায়, কানে, বাহুতে রাজকীয় অলঙ্কার। ধ্যানমগ্ন মহাযোগী মুদ্রায় শিব আর পদ্মপাণি অবলোকিতেশ্বরের সহাবস্থান। শিবের জটার চুড়ায় রয়েছেন অমিতাভ বুদ্ধ - যিনি সীমাহীন আলোর প্রতীক। মন্দির প্রাঙ্গনে ভক্তের দল নিজেদের আরাধ্য দেবতার প্রতি প্রণাম জানান। কেউ বলেন 'ওম মণি পদ্মে ওম', কেউ বলেন 'ওম নমঃ শিবায়ঃ'।  কিন্তু কারো প্রণাম অন্যের প্রণাম কে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে না। এমনই এ মন্দিরের শৃঙ্খলা। বৌদ্ধ লামাই হোন বা হিন্দু পুরোহিত, ভক্তের বিশ্বাসে কোনওরকম প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করেন না।

                 


                                                                     ত্রিলোকীনাথের বিগ্রহ

                             যে রূপেই তিনি বিরাজমান হন না কেন আসলে তিনি ত্রিলোকী নাথ অর্থাৎ ত্রি-লোক বা ত্রিভূবনের নাথ, জগতের রক্ষাকর্তা।   সৃষ্টির প্রতি তাঁর নিরন্তর কৃপাদৃষ্টি। দুই ধর্মের বিশ্বাসের এক অভাবনীয় সংযোগের দেখা মেলে এই ত্রিলোকীনাথ মন্দিরে। এই মন্দিরের পবিত্রতা কৈলাস-মানসসরোবরের সমতুল্য বলে ভক্তরা মনে করেন।  দুটি ভিন্ন ধর্মের আরাধ্য দেবতার এই মেলবন্ধন,  যুগ যুগ ধরে চলে আসা দুই ধর্মের এই সহনশীলতা  বোধহয় শুধুমাত্র ভারতবর্ষেই দেখা যায়। 
                            অবিরাম বৃষ্টিতে ভিজে, ঠান্ডায় প্রায় জমে যাওয়ার পর ত্রিলোকীনাথের এই মোহময় বিগ্রহ দর্শন জীবনের এক পরম প্রাপ্তি। সমগ্র জগতের শান্তিযজ্ঞে নিমগ্ন এই পদ্ম-পিনাক পাণির উদ্দেশ্যে করজোড়ে প্রণাম জানালাম। প্রার্থনা জানালাম - 
বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি
শুষ্ক হৃদয় লয়ে আছে দাঁড়ায়ে
ঊর্ধ মুখে নরনারী

Sunday, 23 May 2021

ভারতের নীলকন্ঠ

              ভারতীয় সনাতন সংস্কৃতিতে নীল রঙ কে নানা ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নীল কখনো পরাক্রমের প্রতীক, কখনো বা সাহসিকতার,  কখনো পৌরুষের। হিন্দু দেবদেবীরা  যারা  উক্ত গুণের অধিকারী, তাদের গায়ের রঙ নীল। তা সে শিব ই হোন বা বিষ্ণু। নীল রঙের ঔজ্জল্যই তার আকর্ষণ। ভারতীয় সংস্কৃতিতে নীল রঙের ব্যবহারেও প্রচুর বৈচিত্র আছে। যেমন রাজস্থানের বিশনয় সম্প্রদায়ের মানুষ নীল রঙের বস্ত্র গায়ে দেন না। এই সম্প্রদায়ের মানুষ প্রকৃতিকে ঈশ্বর রূপে আরাধনা করে। নীল রঙ যেহেতু বিশেষ এক ধরণের গাছ থেকে একসময় তৈরী হত, তাই এই রঙ তৈরী করতে গিয়ে এই নীল গাছ গুলিকে ধ্বংস করা হত। প্রকৃতির এই অপূরণীয় ক্ষতি যাতে না হয়, তাই এই সম্প্রদায়ের মানুষ নীল বস্ত্র বর্জন করেন। বড় বিচিত্র নীলের বিষয়। 

                 নীল কখনো আবার সৌভাগ্যের প্রতীক। বিজয়া দশমীর দিন কোনো ভাবে কেউ যদি নীলকন্ঠ পাখির দেখা পান তাহলে তা পরম সৌভাগ্যের প্রতীক বলে মনে করা হয়। রামায়ণের বর্ণনা অনুযায়ী রাম যেদিন রাবণ বধের উদ্দেশ্যে রওনা হন, সেদিন তিনি নীলকন্ঠ পাখির দেখা পান, আর সেদিন ছিল বিজয়া দশমী। শিবপুরাণে আবার নীলকন্ঠ পাখিকে শিবালয়ের দূত হিসাবে বর্ণনা করা হয়। বিজয়া দশমীর শেষে মা যখন তাঁর সন্তানদের নিয়ে কৈলাসের  উদ্দেশ্যে রওনা হন, সেই খবর কৈলাসপতির কাছে পৌঁছে দেয় এই নীলকন্ঠ পাখি।

                                                               নীলকন্ঠ পাখি (Indian Roller)

                নীল যে শুধুই শুভ বা শুদ্ধতার প্রতীক তা কিন্তু নয়। নীল রঙ বর্জন করার অন্যতম কারণ হিসাবে  মনে করা হয়, নীল হল বিষের রঙ। সমুদ্র মন্থনের সময় এই বিষ পান করে ছিলেন মহাদেব এবং এই বিষের রঙেই তিনি নীলকন্ঠ। যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন নীল রঙের বোধহয় নিজস্ব সহনশীলতা আছে, যা তাকে দেয় অনন্ত বিস্তার, বিপুল গভীরতা। 

                  হিমালয়ের আনাচে কানাচে এমন নীলের দেখা মেলে বহু জায়গায়। এমনই এক নীলের সন্ধানে গিয়েছিলাম ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্য লাদাখ এ। লাদাখ কে বর্ণনা করতে গেলে খুব সহজে পরস্পর বিপরীত দুটি শব্দ বলা যায় - রুক্ষ আর মনোরম। সবুজের অনুপস্থিতিতে মাইলের পর মাইল রুক্ষ পাহাড় কিভাবে প্রাকৃতিক শিল্পকলার সম্ভার সাজিয়ে বসে আছে, তা দেখতেই লাদাখ এ আসা। লাদাখ এর প্রধান শহর লে থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়া যায়। তবে লাদাখ রাজ্যের সিংহ ভাগ যেহেতু সেনাদের দখলে, তাই সাধারণ মানুষের যাওয়ার অনুমতি মেলে খুব অল্প কয়েকটি জায়গায়। লেহ থেকে বেরিয়ে পৃথিবীর সর্বোচ্চ যান চলাচলের উপযুক্ত গিরিখাত, খার-দুং-লা পার হয়ে আমাদের গাড়ি ছুটে চলল সেই নীল গন্তব্যে। পথে যেতে যেতে যে নৈসর্গিক দৃশ্য চাক্ষুষ করলাম তা বর্ণনা করার মত ভাষা আমার ভান্ডারে নেই। রুক্ষ পাহাড়, তার গায়ে তীব্র হাওয়ার ধাক্কায় তৈরী হওয়া বিভিন্ন রকম আকার। কোনটা দুর্গের মত, কোনটা বা সেনাদলের সারি, কোনটা যেন রথের মত, কোনটা আবার আস্ত রাজপ্রাসাদ। কোনও কোনও পাহাড়ের গোড়া থেকে মাথা অবধি রক্তবর্ণ গ্রানাইটের দেওয়াল, কোনওটায় সবুজ, কোনওটায় আবার দুধ সাদা। আমাদের গন্তব্যের কাছাকাছি এসে পড়েছি বলে যখন জানতে পারলাম, তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে বটে কিন্তু এই উচ্চতায় এ সময়ে যথেষ্ট দিনের আলো। পাহাড়ের একটা বাঁক ঘুরতেই আচমকা দেখা দিল ঘন নীল জলরাশি। যেন প্রচুর পরিমাণ নীল রঙ জলে গুলে রেখে দেওয়া হয়েছে। হারিয়ে গেল এক নিমেষে। এই হারিয়ে খোঁজাই হিমালয়ের সবথেকে বড় আকর্ষণ। কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা পৌঁঁছে গেলাম আমাদের নীল গন্তব্যে, ৪৩৫০ মিটার উচ্চতায়, হিমালয়ের কোলে আন্তর্জাতিক সীমাকে গিলে ফেলা বিপুল এক জলের ভান্ডার।  এ ভান্ডারের মাত্র ৪০ শতাংশ ভারতবর্ষের দখলে, বাকি ৬০ শতাংশ চীন তথা চীন অধিকৃত তিব্বতের। 

                    এ জলরাশির রঙ বিভিন্ন সময়ে বদল হয়। ঘন নীল থেকে আকাশী, আকাশী থেকে সবুজ, সবুজ থেকে লালচে গোলাপী। প্রকৃতির নিত্য হোলিখেলা। প্রবল হাওয়ায় জলে ওঠে ছোট্ট ছোট্ট ঢেউ যার নীচে কাঁচের মত পাথরগুলো খুব আস্তে আস্তে গড়িয়ে যেতে থাকে শামুকের মত। এ হ্রদ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণার পর কিছু আশ্চর্য্য তথ্য পাওয়া যায়। এই হ্রদের জল সম্পূর্ণ আবদ্ধ, অন্য কোন জলের স্রোতের সাথে এর কোন সম্পর্ক না থাকায় এই জল মাত্রাতিরিক্ত নোনা। এই হ্রদের জলে প্রচুর খনিজ পদার্থ থাকায় জলের রঙ ঘন নীল। নোনা  হলেও এই হ্রদের জল শীতকালে সম্পুর্ণ বরফ হয়ে যায়। মাত্র কয়েকপ্রকার কবচী জীব ছাড়া এই হ্রদের জলে কোন জীব বাঁচতে পারে না। অর্থাৎ এই হ্রদের নান্দনিক উৎকর্ষ যাই হোক না কেন ব্যবহারিক উৎকর্ষ বিশেষ উল্লেখযোগ্য নয়। যতক্ষণ আলোর শেষ রেখা টুকু পড়তে লাগল চেটেপুটে উপভোগ করলাম এর রংবাহার। 

                       আমরা ঘুরে আসার কিছুদিন পর থেকেই শুরু হয়ে গেল এই সীমান্ত প্রদেশে ভারত-চীন দুই দেশের অধিকার রক্ষার লড়াই। খবরের কাগজে পড়তে লাগলাম সে চেনা জায়গার নাম -  চুশুল। এই বিপুল জলরাশি কে মাঝখানে রেখে দীর্ঘ কয়েকমাস চলতে লাগল প্রাণঘাতী সংঘর্ষ। এখনো 'হয় নাই শেষ'। এ যেন আর এক দফা সমুদ্র মন্থন। প্রকৃতির এমন অমূল্য সম্পদ তাকে কি খড়ির গন্ডি তে বাঁধা যায়! এই বিপুল জলরাশির মধ্যে দাগ কেটে কি আমার তোমার ভাগ করা সম্ভব! কিছুতেই নয়। আর এই অসম্ভব কে সম্ভব করার জন্য দু'দেশের মানুষের দুর্বার প্রচেষ্টা বছরের পর বছর ধরে বাতাসে ছড়ায় বিষ। সেই বিষ নিরন্তর পান করে চলে ব্রহ্মান্ডের এই ক্ষুদ্র অংশ। এই বোধহয় সত্যিকারের হলাহল পান।  নিজের সৃষ্টির একটুকরো অংশের মধ্যে এভাবেই বোধহয় নিজেকে প্রকাশ করেন দেবাদিদেব। প্রকৃতির এই নীল সম্পদ - প্যাঙ্গং সো হয়ে ওঠে ভারতের নীলকন্ঠ।

                

প্যাংগং সো  - এ রঙের বাহার

Friday, 7 May 2021

হাসেন অন্তর্যামী

                   প্রকৃতির নিয়মে বছরের অনেকটা সময় গৃহবন্দী হয়ে অবসর জীবন কাটাতে বাধ্য হন, এমন মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে তো বটেই, ভারতবর্ষেও কিছু কম নয়। এমন কিছু মানুষের সান্নিধ্যে কয়েকদিন কাটাতে গিয়েছিলাম হিমাচল প্রদেশের এক অচেনা প্রান্তে। হিমালয়ের পিরপাঞ্জাল আর জাঁস্কর  শাখার মধ্যবর্তী অঞ্চল পাঙ্গি উপত্যকা নামেই পরিচিত। পাঙ্গি উপত্যকায় প্রধানতঃ হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষের বাস। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ভোট দের আধিক্য থাকায় পাঙ্গি উপত্যকা প্রধানতঃ চারটি ভাটোরী তে বিভক্ত। সেই চারটি ভাটোরির অন্যতম হল সুরাল ভাটোরী। বাঁদিকে পিরপাঞ্জাল আর ডানদিকে জাঁস্কারের মাঝে শান্ত, সবুজ নির্জন জনপদ সুরাল। পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলেছে সুরাল নালা। বছরে চার থেকে পাঁচ মাস জলের স্রোত বয়ে যায় এই উপত্যকায়। বাকি সময় সবকিছু বরফের নীচে, সমস্ত মানুষ গৃহবন্দী।  পাথুরে উপত্যকায় বয়ে চলা সুরাল নালার দুই ধারে উঁচু পাহাড়ের ঢাল। সুরালের উচ্চতা ১০০০০ ফুটের কিছু বেশি। ছোট বড় মিলিয়ে গোটা তিনেক প্রাইমারী এবং ইন্টারস্কুল আছে, যা সুরালের জনসংখ্যার তুলনায় চলনসই। এমনই একটি স্কুলের মাস্টারমশাই পবন সিং নেগি র সাথে আলাপ হল সুরাল গ্রামে। জানতে চাইলাম সুরালের ইতিকথা।

                       সুরাল নালা                  

পাঙ্গি উপত্যকা হিমাচল প্রদেশের প্রান্তিক অংশ এবং জম্মু কাশ্মীর সীমানার সাথে যুক্ত। হিমাচলের বেশ কয়েকটি গিরিবর্ত্ম এই পাঙ্গি উপত্যকা কে বিচ্ছিন্ন করে রাখে বছরের অর্ধেকের বেশি সময়। কিলার  থেকে সাচ পাস (১৪৪৮২ ফুট) পার হয়ে পোঁছতে হয় এই স্বর্গীয় ভুখন্ডে। সাচ পাস থেকে সোজা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গাড়ি যখন নামতে থাকে দুর্বার গতিতে, মনে হয় এ যেন এক অন্যরকম নাগরদোলা। সুরাল, ভারত ভুখন্ডের বহু প্রাচীন জনপদ। কথিত আছে হিমাচলের শাসকবর্গ অপরাধের শাস্তি হিসাবে প্রজাদের এই ভুখন্ডে পাঠিয়ে দিতেন যাতে তারা সহজে আর মূল ভুখন্ডে ফিরতে না পারে। 

                   সে যেভাবেই গড়ে উঠুক, দুটি ভিন্ন ধর্মের মানুষ আবহমান কাল ধরে জীবনধারণ করে চলেছে প্রকৃতির এই ইন্দ্রলোকে। কথা বলতে বলতে পবন নেগি আমাদের নিয়ে এসেছেন একটা উঁচু জায়গায় যেখান থেকে সুরাল নালার সর্পিল গতি দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। পাহাড়ের সমস্ত ঢালে ঘন জঙ্গল। লা্‌ল, হলুদ আর সবুজ রঙে যেন আগুন জ্বলছে। জানতে পারলাম এই বিভিন্ন রঙ আসলে বিভিন্ন বয়সের ভুজ গাছের পাতার। একেবারে কচি পাতা আগুনের মত লাল, মধ্যবয়সী পাতা ঘন সবুজ আর প্রাপ্তবয়স্ক পাতা কাঁচা সোনার মত হলুদ।


                                                                   ভুজ গাছের জঙ্গল

                                ভারতের সনাতন সংস্কৃতিতে ভুজ গাছের ছালের ব্যবহার বহুজনবিদিত। কিন্তু হিমালয়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এই ঐতিহাসিক বৃক্ষের বিপুল সমাহার সম্পর্কে আমার অন্ততঃ কোন ধারণা ছিল না। নেগি সাহেব অতি যত্ন সহকারে আমেদের ঘুরিয়ে দেখাচ্ছেন তাঁর জন্মভূমি। প্রকৃতির সাথে লড়াই করতে করতে লৌহকঠিন ব্যক্তিত্বের অধিকারী প্রত্যেক সুরালবাসী, ঠিক তেমনই তাদের আবেগ। কৌতুহলী আমার মন। প্রশ্ন করে বসি এই সুরাল নালা কোথা থেকে আসছে? নেগি সাহেব বলেন এই নালার উৎস হিমাচল আর জম্মু কাশ্মীরের সীমান্তে অবস্থিত শিবশঙ্কর শৃঙ্গ। এ কেমন শৃঙ্গ? নেগি সাহেব বলেন - "যাও খুদ দেখকে আও ক্যায়সে শঙ্কর ভগবান পাহাড় কী চোটি সে হামে রকসা কর রহে হ্যায়"। ভারী অদ্ভুত তো! নেগি সাহেব আমাদের রাস্তা বাতলে দিলেন, চলতে শুরু করলাম। নেগি সাহেব জয়ধ্বনী দিলেন - জয় শিব শঙ্কর। 

                           সুরাল নালার পাশ দিয়ে পাহাড়ি রাস্তা। অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য। ক্রমশঃ চলতে চলতে অনেক পিছনে ফেলে এসেছি সুরাল গ্রাম। দুধারে অসংখ্য বরফের পাহাড়, পাহাড়ের গা বেয়ে সারি সারি ছোট বড় ঝরনা নেমে এসে মিশে যাচ্ছে সুরাল নালায়। বেশ কয়েক কিলোমিটার হেঁটে ফেলেছি। হঠাৎ দু তিনটে পাহাড়ের মাঝখান থেকে উঁকি মারল আড়াআড়ি ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা আপাদমস্তক বরফে ঢাকা এক শৃঙ্গ। বড় অদ্ভুত তার গড়ন। সামনের দিকটা যেন হাতির শুঁড়ের মত। যত সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি শৃঙ্গের গড়ন বদলে যাচ্ছে। খানিক দুর যাওয়ার পর পুরো প্রশস্ত শৃঙ্গ  দেখতে পেলাম।  যেন প্রকান্ড এক শঙ্খ। যে শঙ্খ বাজানোর ক্ষমতা মহাযোগী মহাদেব ছাড়া আর কারো নেই। কি অদ্ভুত এই শৃঙ্গের রূপ। পরতে পরতে যেন অনুভব করা যায় ত্রিলোকেশ্বরের উপস্থিতি। মনে পড়ে গেল কোন একজনের লেখায় পড়েছিলাম শঙ্খের মত দেখতে বলে এই শৃঙ্গকে পর্বতারোহীরা শিবশঙ্খ শৃঙ্গ নামে চেনেন। কিন্তু সুরাল বাসীর কাছে এই পাহাড়ই শিব শঙ্করের বাসভুমি। বিস্ময়ের আরও কিছু বাকি ছিল।  খানিকটা  এগিয়ে গিয়ে পাহাড়ের চুড়ার দিকে তাকাতেই কানে বেজে উঠল নেগি সাহেবের কথাগুলো। নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছি না। বরফে মোড়া শঙ্খ আকৃতির এই পাহাড়ের মাথায় স্বয়ং শিবশঙ্কর বিরাজমান। তাঁর কৃপাদৃষ্টি সরাসরি সুরাল গ্রামের দিকে। প্রকৃতির এই বিস্ময় নিজে চোখে না দেখলে হয়তো বিশ্বাস করতাম না। ইনিই নেগি সাহেবের শিবশঙ্কর,  যিনি প্রকৃতির উচ্চাসনে বসে অবিরাম রক্ষা করে চলেছেন তাঁর সৃষ্টির প্রতিটি অনুকণা। সকলের নাগালের বাইরে সমস্ত পার্থিব মায়াজাল এড়িয়ে অবিচল, ধ্যানমগ্ন জগদীশ্বর। সৃষ্টির সমস্ত কলহ, বিবাদ, অভিমান, অহংকার সমস্ত কিছুকে যেন প্রাণভরে উপভোগ করছেন সচ্চিদানন্দ।


                                                    

                                                        বরফ ঢাকা শৃঙ্গের চুড়ায় শিবশঙ্কর

                       অদ্ভুতদর্শন এই শৃঙ্গের চুড়ায় আসীন  রজতগিরিনিভম কে দেখে মনে হল, এই পরম ঐশ্বর্য্য অবহেলা করি আমরা।  পার্থিব চাওয়া পাওয়া নিয়ে গড়ে তুলি আত্মপ্রত্যয়ের অসাড় গর্ভগৃহ। সে গর্ভগৃহ ঊজ্জ্বল করে তুলি অহংকারের রোশনাই দিয়ে, সাজিয়ে তুলতে জ্বালাই উচ্চাশার হাজারবাতি।  প্রাপ্তির সেই অন্তঃসারশূণ্য আস্ফালন দেখে অবশ্যই তাঁর করুণা হয়,  হাসেন অন্তর্যামী।