এখন পাহাড়ে বসন্ত। হিমালয়ের আনাচে কানাচে এখন ফুলের মেলা। এই মেলা দেখতে প্রত্যেক বছর হিমালয়ের সমস্ত উপত্যকায় ভিড় জমান পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজার হাজার মানুষ। প্রকৃতির এই হোলীর রঙ ঘুচিয়ে দেয় সমস্ত বিভেদের প্রাচীর। পাহাড়ী বসন্তের অমোঘ আকর্ষণে আসা পৃথিবীর সমস্ত মানুষ ভুলে যায় কি তার জাতি, কি তার ধর্ম, কি তার পরিচয়।এই সময় পাহাড়ে সব মানুষের মনের একটাই রঙ, প্রকৃতির রঙ। পাহাড় চুড়ার পিছন থেকে ওঠা সূর্য্যের, সিঁদুরের মত লাল রঙ, পূবের আকাশে বর্ণালীর রঙ, পাহাড়ের ঢালে গালিচা বিছিয়ে রাখা ছোট বড় নানা রকম ফুলের রঙের বাহার, শুধু রঙ আর রং।এক ফুলের সঙ্গে আর এক ফুলের রংমিলান্তি খেলা।
এ বছর পরিস্থিতিটা একটু অন্যরকম। পাহাড়ে এবার বসন্তের রঙ আরো উজ্জ্বল। রাস্তার ধারে ফুটে থাকা ফুলগুলো এবছর গাড়ীর ধুলোয় মলিন হয় নি।ছবিতে নিজেকে সুন্দর দেখাতে মাথায় দেওয়ার জন্য এক গোছা ফুল ছিঁড়ে নিতে কেউ আসছে না। বাচ্চার কান্না ভোলাতে আত্মাহুতি দিতে হচ্ছে না এবার পাহাড়ের ফুলগুলোকে। ভ্রমরের গান খুব মন দিয়ে শোনার সুযোগ এসেছে এবার। এ যেন এক অন্য বসন্ত। পাহাড় ও বোধহয় ভুলতে বসেছিল এমন বসন্তের কথা। বহুদিন পরে এক ফুলের সঙ্গে অন্য ফুল, এক নদীর সঙ্গে অন্য নদী, এক পাহাড়ের সঙ্গে অন্য পাহাড়ের সুখ দুঃখের কথা বলার সুযোগ মিলেছে নিভৃতে, নির্জনে।
কিন্তু সেই মানুষগুলো ! যারা সারা বছর সমস্ত দুঃখের দিনে নিজেকে সান্ত্বনা দেয়, বসন্ত এলে সুখ আসবে, সে মানুষগুলো! কেমন আছে তারা? পাহাড়ের ছোট ছোট গ্রাম গুলোতে হোমস্টে এখন খুব প্রচলিত। দেশ বিদেশ থেকে আসা পর্যটকদের কাছে হোমস্টে এখন খুব আকর্ষণীয়। গ্রামের মানুষগুলো তাদের সারাবছরের রসদ সংগ্রহের জন্য এখন হোমস্টে পরিষেবায় যথেষ্ট আগ্রহী। কিছু রোজগার আর পর্যটকের সুবিধার্থে হাসিমুখে সাজিয়ে রাখে নিজেদের ঘর। হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের পরেও পর্যটকের পরিষেবার কোন কিছুতে যেন ত্রুটি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখে অজস্র পরিবার। বিশেষতঃ পরিবারের মেয়েরা। তারা কি আজ ভালো আছে!
দার্জিলিং জেলার লামাহাটা গ্রামের এমনই একটি পরিবারের সাথে আমার দীর্ঘ দিনের পরিচয়। ২০১২ সালে কালিম্পং যাবার পথে সুদৃশ্য লামাহাটা দেখে মুগ্ধ হয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়েছিলেন এক মমতাময়ী জননায়িকা। ছবির মত সুন্দর গ্রাম দেখে স্বপ্নের এই সওদাগর স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন এই গ্রামের মানুষগুলোকে। লামাহাটা হবে রাজ্যের অন্যতম ইকোট্যুরিজম স্পট। সঙ্গে থাকা পারিষদদের হুকুম করেছিলেন - বিষয়টা দেখে নিতে।তারা কি দেখেছেন সে আজ ইতিহাস। কিন্তু এই গ্রামের মানুষগুলো দেখেছে কিভাবে একটা সুখের স্বপ্ন ছারখার হয়ে যায়। এই পরিবারটাও জননায়িকার 'সামান্য ক্ষতির' অংশীদার। দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সুত্রে আমি দেখেছি এই পরিবারটার ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই। দুটি মাত্র ঘর নিয়ে যাত্রা শুরু এই হোমস্টে র। তার একটা পুরো টিনের তৈরী অপরটার টিনের চাল। কিন্তু কি পরম আন্তরিকতা। যতদিন এদের সঙ্গে থেকেছি নিজেকে মনে হয়েছে এদের পরিবারের একজন। রান্নাঘর থেকে ঠাকুর ঘর, ফুলের বাগান থেকে সব্জী বাগান কোথাও যেতে কখনো এতটুকু ইতস্ততঃ বোধ করিনি। তিল তিল করে গড়ে উঠতে দেখলাম এই হোমস্টে। এখন রাস্তার উপর সাজানো গোছানো বেশ কয়েকটা ঘর, সঙ্গে একটা দোকান। শেষবার যখন গিয়েছিলাম খুব ভাল লেগেছিল এটা ভেবে যে লড়াই টা এরা জিতে গেল।কিন্তু আজ! কেন জানিনা কদিন ধরে বারবার মনে হচ্ছে পরিবারটার কথা। স্নেহশীলা মা, তার স্বামী, মেয়ে, জামাই, শ্বশুর, শাশুড়ি, নাতি, নাতনী নিয়ে ভরপুর সংসার। যে সংসারে অর্থের অভাব থাকলেও কারো মুখে কখনো হাসির অভাব দেখিনি।
ফোনে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না যে কোন কারণেই হোক। তবু আমার দৃঢ় বিশ্বাস ওরা ভালো আছে। পাহাড়ের সমস্ত 'নেই' এর সঙ্গে লড়াই করে এই পরিবার। সারাদিন চড়াই উতরাই ভেঙ্গে করে চলা জীবনযুদ্ধের সৈনিক তারা, তাদের ফুসফুসে বাসা বাঁধা কোন ভাইরাসের কম্ম নয়। আমি জানি তোমরা সবাই ভালো আছ। এবার পর্যটকের আনাগোনা নেই তাই হয়তো পড়েছ চুড়ান্ত অর্থকষ্টে। হয়তো বা খাবার দাবার, রেশন কিছুই মিলছে না প্রয়োজন মতো, হয়তো বা দুধের শিশুটার পর্য্যাপ্ত দুধ ও ্ যোগাড় করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ছে। তবু বলি বন্ধু হেরে যেও না, এর থেকে অনেক কঠিন লড়াই লড়েছ তোমরা, ধৈর্য্য ধরো, তোমাদের জীবনে আবার বসন্ত আসুক।

Khub sundar laglo...sotti e, ei kothin samay nischoi kete jabe...abar bosonto asbe 🙂
ReplyDeleteঅসম্ভব ভালো লেখা হয়েছে۔ এবং নিজে না গেলেও পুরো চিত্রটা ফুটে উঠলো۔ যাবার অপেখ্যায় রইলাম۔۔۔ 👌👌👌👌👌
ReplyDeleteমনে হচ্ছে সব ছেড়ে একছুটে ওখানে চলে যাই। পড়তে পড়তে মনেহল পরিবারটি আমাদেরই - ক্ষনিকের জন্য লেখাটা দারুন এক ভালোলাগার অনুভূতি তৈরি করল যা অনেকদিন মনে থাকবে।
ReplyDeleteখুব ভালো লাগলো ওদের সাথে পরিচয় হয়ে....প্রার্থনা করি ওরা ভালো থাক....প্রতিবারের মতো আবারও চিত্রটা ফুটে উঠল।খুব সুন্দর লেখা ম্যাম্।
ReplyDeleteএ এক অদ্ভুত পরিপূর্ণতা
Deleteসেই লামাহাটা..... আমিও ছিলাম....
ReplyDeleteএকটু পাহাড় আর আলো হাঁসি গান আমি তোমাকে দিলাম.....
কত বার ভেবেছি ওখানে গিয়ে এমন সুন্দর পরিবারের সাথে একটু্ থাকব, অবসর পেলেই। অবসর মিলল কিন্তু তাও সেই যাওয়া আর হলনা। লামাহাটা, কবে ডাকবে্ আমায়?
ReplyDeleteমন থেকে চাইলে নিশ্চয়ই ডাক আসবে।
ReplyDeleteমন ছুঁয়ে গেল লেখাটা, এই ধরনের homestay তে থাকার অভিজ্ঞতা বেশ কয়েক বার হয়েছে, সত্যি বলতে কখনো ভাবিনি এই ভাবে
ReplyDeleteEmon aantorikota prokriti o manusher sathe ..emon aantorik lekha toh hobei...aaro lekhar apekshay roilam..
ReplyDeleteLamahatta amar boro priyo jayga... lekha-ta mon chuye gelo...
ReplyDelete