রাস্তার মোড়ে একটা জটলা। বেশ কিছু লোকজন কোন নিয়ম নিষেধের তোয়াক্কা না করে জড়িয়ে পড়েছে বাগবিতণ্ডায়। কি কারণে যে গোলমাল বেঁধেছে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, তবে কেউ কেউ বলছেন নিতান্ত সাধারণ কারণেই দুজনের মধ্যে হাতাহাতির যোগাড়। পাশের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন সৌম্য দর্শণ এক প্রৌঢ়। কিছুক্ষন কথাবার্তা বলে শান্ত করতে চাইলেন সবাইকে। উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় চলছে। কে কি বলতে চাইছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। এর মধ্যে ওই ভদ্রলোক জলদগম্ভীর স্বরে আর একজনের কাঁধে হাত রেখে বললেন - পরাশর ছেড়ে দাও, যা হবার তো হয়ে গেছে। পরাশর বাবু শান্ত হলেন। কি হবার ছিল, কি হয়েছে কিছুই বুঝতে পারলাম না। ভিড় পাতলা হয়ে গেল, সবাই চলেও গেল। পরাশর বাবুও ঐ প্রৌঢ় ভদ্রলোককে প্রণাম করে চলে গেলেন। পরাশর বাবু কে দেখে মনে হল যার সাথে তাঁর গোল বেঁধেছিল তাকে তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন।
কিরকম যেন অদ্ভুত লাগল। এখনকার দিনে মধ্যবয়সী কোন লোকের নাম পরাশর - কেমন যেন একটা ব্যাপার। আবোল তাবোল কিসব ভাবতে ভাবতে মনে হল পরাশর নামটার সাথে ক্ষমা র সংযোগের ইতিহাস সুপ্রাচীন। সনাতন ভারতবর্ষের সামাজিক পরিকাঠামোর অনেকটাই রামায়ণ মহাভারত এর বিভিম্ন কাহিনী দ্বারা প্রভাবিত। মহাভারত রচনার পটভুমি স্বয়ং ত্রিলোকেশ্বরের নির্দেশে তৈরী হয় আর সেই পটভুমিতে মহামুনী পরাশর বিশেষ স্থান অধিকার করেন । মহামুনী পরাশর খুব অল্প বয়সে তাঁর পিতা শক্তি মুনী কে হারান। এবং তিনি জানতেন বিশ্বামিত্র মুনীর নিযুক্ত কোন এক রাক্ষসের আক্রমণে তাঁর পিতা নিহত হন। এই রাক্ষসকুলকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য তিনি বদ্ধ পরিকর হন। মহামুনীর মহাক্রোধে সমস্ত সৃষ্টি যখন তার ভারসাম্য হারাতে চলেছে, তখন তাঁর পিতামহ তথা গুরু মহর্ষি বশিষ্ঠ তাঁকে শান্ত করেন। তাঁকে বোঝান তাঁর পিতার মৃত্যু পূর্বনির্ধারিত। পরাশর মুনী কে বুঝিয়ে বলেন স্বয়ং ত্রিলোকেশ্বর তাঁর জন্য যে কর্ম নির্ধারণ করেছেন, অনাবশ্যক ক্রোধ তাঁর সেই কর্মকে বিনাশ করবে। এই রাক্ষসকুলকে ক্ষমা করার মধ্য দিয়েই তাঁর প্রজ্ঞার বিকাশসাধন সম্ভব। পিতামহের এই নির্দেশ পরাশর মুনীর জীবনদর্শনকে সম্পুর্ণ বদলে দেয় , পরবর্তী তে তিনি ঋষির জীবন যাপন করেন । জীবনের বেশ কিছু সময় তিনি হিমালয়ের বিভিন্ন প্রান্তে সাধনা করেন এবং অবশেষে ত্রিলোকেশ্বরের কৃপায় মোক্ষলাভ করেন। মহামুনী পরাশরের সমস্ত সাধনক্ষেত্রই অত্যন্ত পুণ্যভূমি হিসাবে চিহ্নিত এবং আজও সেই সমস্ত জায়গায় মহামুনী পূর্ণ মর্যাদায় পূজিত হন।
এমনই এক সাধনক্ষেত্র দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। বর্তমানে এই সাধনক্ষেত্র পরাশর ঝিল নামে পরিচিত। হিমাচল প্রদেশের মান্ডি শহর থেকে ৪৯ কিমি উত্তরে আজও এই সাধনক্ষেত্র দৃশ্যমান। চারিদিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা উপবৃত্তাকার এক সরোবর, যার ৭ শতাংশ জুড়ে রয়েছে ঘাস আর পানাজাতীয় উদ্ভিদ দিয়ে তৈরী একটি দ্বীপ। এই দ্বীপটি এক জায়গায় স্থির নয়। সরোবরের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময় একে অবস্থান করতে দেখা যায়।
কথিত আছে মহামুনী পরাশর এই সরোবরের প্রান্তে দীর্ঘদিন তপস্যা করেছেন। আজও এই সরোবরের পাশে প্যাগোডা আকৃতির মন্দিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের দ্বারা নিত্য পূজিত হন মহামুনী পরাশর। এ সরোবরের সৃষ্টি নিয়ে অনেক প্রচলিত কাহিনী আছে। তার সত্যতা যাই হোক না কেন এই সাধনক্ষেত্র স্বমহিমায় উজ্জ্বল। সরোবর টির সমস্ত প্রান্ত উঁচু পাহাড় দিয়ে ঘেরা। প্রকৃতি যেন মহামুনীর সমস্ত সাধন মহিমা কে দুহাতে আগলে রেখেছেন। ত্রিলোকেশ্বরের মানসপুত্র এই মহামুনী। তাই তাঁর সাধনক্ষেত্রের তিনিই রক্ষাকর্তা। এই সরোবর রহস্যে ঘেরা। আজও কেউ জানে না এই সরোবরের গভীরতা কত। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, কোন এক সময়ে সুদীর্ঘ মহীরুহ কে এই সরোবরের মধ্যে ডুবে যেতে দেখা গিয়েছে। মহামুনী পরাশর স্বয়ং মহাসমুদ্র। তাঁর প্রজ্ঞা, তাঁর সাধন মহিমার গভীরতার পরিমাপ করা সাধারণ মানুষের কল্পনার অতীত। তবে এই সরোবরের প্রাকৃতিক মাধুর্যে ভারতবর্ষের সনাতন সংস্কৃতির গভীরতার আভাস মেলে। ক্ষমা পরম ধর্ম - এই মূল্যবোধের উপর দাঁড়িয়ে থাকা আর্যাবর্তের সনাতন ঐতিহ্য আবহমান কাল ধরে লালন করে চলেছে এক আত্মনির্ভর মানবসভ্যতাকে যার নাম - ভারতবর্ষ।
মহামুনি পরাশর এর নাম আমাদের পরিচিত, তাঁর কাহিনী জেনে খুব ভালো লাগলো।
ReplyDeleteক্ষমা সত্যিই পরম ধর্ম, এই সনাতন ভারতীয় ঐতিহ্য যুগযুগান্ত ধরে মেনে আসা হয়ে আসছে। ক্ষমা আমাদের অন্তরাত্মাকে শান্তিজলে স্নিগ্ধ করে, পরাশর মুনিও এই ভাবে মোক্ষ লাভ করেন।
ভারতবর্ষের এই নীতির জন্যই হয়তো লোভাতুর শক, হুন, পাঠান, মোগলরা আক্রমণ করে লুঠ করতে এসেও সমাজের মূল স্রোতে মিশে গেছে। এই সভ্যতা তাদের ক্ষমা করে আপন করে নিয়েছে।
তাই আজ আসমুদ্র হিমাচল দেখা যায় 'বৈচিত্র্যের মধ্যে একতা'। পরাশরের মত কত সাধকের ত্মত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া এই ঐতিহ্যের আলো আমরা যেন আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারি।
Bharatbarsho ke ebhabei chintey hobey... etai taar prokrito ruup o sattwa ja supraachin kaal theke aaj o bahoman..
ReplyDeleteEta khub priya sanda 'ami' r kache.
ReplyDelete