Tuesday, 5 May 2020

অমাবস্যার আলো

                           অমাবস্যা বললেই মনে ভেসে ওঠে চাঁদহীন রাত আর নিকশ কালো অন্ধকারের ছবি। অমাবস্যা মানেই ক্ষয়ে যেতে যেতে চাঁদের হারিয়ে যাওয়া। কিন্তু এর ব্যতিক্রম ও ঘটে। অমাবস্যার রাতও আলোয় ঝলমল করতে পারে। না কৃত্রিম বৈদ্যুতিক বাতি বা আতস বাজি নয়। প্রকৃতি তার আলোকভান্ডারের অন্য রত্ন দিয়ে মিটিয়ে দেয় চাঁদের অভাব। নাই বা থাকল চাঁদের হাসি, আলোকের ঝর্ণাধারা যে প্রবহমান। অবিশাস্য হলেও সত্যি। 
           
                       আমি রয়েছি তপোবনে। ১৪৬৪০ ফুট উচ্চতায়, বেশ কয়েকটি হিমবাহে ঘেরা অমর গঙ্গা নদীর ধারায় স্নাত এই তপোবন। অমরগঙ্গা বয়ে চলেছে দূর্নিবার গতিতে আর জলের সেই চলার আওয়াজ ই এই উপত্যকার একমাত্র শব্দ।সমস্ত উপত্যকা যেন নির্জনতার চারণক্ষেত্র। পায়ে পায়ে চলতে চলতে এসে দাঁড়িয়েছি সেই মহামহিমের শ্রীচরণতলে। শিবলিঙ তুষারশৃঙ্গ। এই শৃঙ্গ যেন মহাযোগীর প্রতিমূর্তি। ধ্যানমগ্ন, অধোবদন, নির্মোহ। পাহাড়ের ঢালটা এমন ভাবে এই শৃঙ্গের সঙ্গে আছে যেন ইষ্টদেবের কোলে পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে দেবতার ভক্ত। এই উপত্যকা মহাযোগী মহাদেবের তপস্যাক্ষেত্র। এ্ত অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য দেখতে পাওয়া পরমগুরুর আশীর্বাদ। 
                              রাত্রিবাসের ব্যবস্থা এক সাধুবাবার কুটিরে।এই সাধুবাবা রামের ভক্ত। পর্যটকদের সেবা করা পরম পূণ্যের কাজ বলে মনে করেন। নিজের ইষ্টদেবকে নিজের কন্ঠ উৎসর্গ করেছেন। দীর্ঘ আঠারো বছর কথা বলেন না। দুপুরের খাওয়ার আয়োজন এনার কুটিরে। বেশ কয়েকজন সীমান্তরক্ষীও প্রতিদিন এই সাধুবাবার আতিথ্য গ্রহণ করেন।খেতে খেতে কথা হচ্ছিল তাদের সাথে।পাহাড়ে যাওয়ার নির্ঘন্ট তৈরীর আগে পূর্ণিমার ব্যাপারটা সর্বদা মাথায় রাখা হয়। কিন্তু সময়ের ফেরে এমন রজতগিরি পরিবেষ্টিত পূণ্যভূমিতে কাটাতে হবে অমাবস্যার রাত। এই আফশোষের কথা বলছিলাম। ওদের মধ্যে একজন আমাকে বললেন পূর্ণিমার হিমালয় তো সবাই দেখে। অমাবস্যার হিমালয়  - কিসমত মে হোনা চাহিয়ে।বড় অদ্ভুত লাগল ওনার কথা।কুটির থেকে চলে যাওয়ার আগে আমাকে বলে গেলেন - কাল মিলেঙ্গে, কিসমত কা খেল জরুর দেখনা। মানে বুঝলাম না তার কথার । শুধু এটুকু বুঝলাম হিমালয়ের প্রতিমুহূর্তে অনিশয়তা। কিসমত সত্যিই কি খেলা দেখাবে কেউ জানে না। 
                            পাহাড়ে সূর্যাস্ত বেশ দেরীতে হয়, আর তার পরেই এক মুহুর্তে নেমে আসে ঘন আঁধার। আজ অমাবস্যা। মনখারাপ করা অন্ধকারে ডুবে গেল চারিদিক। অতঃপর স্লিপিং ব্যাগে প্রবেশ। সূর্য্য ডোবার সাথে সাথেই মালুম হতে লাগল হিমবাহ ক্ষেত্রে রাত্রিবাসের মহিমা। ক্রমশঃ যেন রক্ত হিম হয়ে আসছে। চোখ বোজার তো প্রশ্নই ওঠে না। আমার পাশে যে দূরদ্বীপবাসিনী আছেন উনি বেশ কিছুদিন এখানে থাকার সুবাদে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। আমি নিদ্রাহীন। কফিনবন্দী মৃতদেহে প্রাণ ঢেলে দিলে যা হয়, ঠিক সেই অনুভুতি হয় স্লিপিং ব্যাগে। রাত গড়িয়ে কত হল কে জানে। পাথরের ওই ঘরটা থেকে একটু বাইরে এলাম। বালতি তে রাখা জল ও জমে বরফ হয়ে গেছে। কি মনে হল আর একটু এগোলাম। নিজের অগোচরে চোখ গিয়েছে আকাশে। বেমালুম ভুলে গিয়েছি ঠান্ডা, অক্সিজেন কম, কোল্যাপ্স করে যাওয়ার সম্ভাবনা সমস্ত কিছু। কি দেখছি আমি! সমস্ত আকাশটাতে এক বিন্দু খালি জায়গা নেই।ছোটবড় হাজার হাজার তারা একটার সঙ্গে আর একটা যেন আঠা দিয়ে আঁটকানো। সমস্ত আকাশটা যেন অত্যন্ত ঘন বুনটের মিহি একটা জাল। যতদূর দৃষ্টি চলে কোথাও এতটুকু ফাঁক নেই। পৃথিবীর আকাশে এত তারা আছে? আর একটু এগিয়ে গেলাম শিবলিঙ এর দিকে। বিস্ময়ের আরো কিছু বাকি ছিল। এবার দেখলাম অসম্ভব  ঊজ্জ্বল কিছু তারা, যাদের রশ্মি আক্ষরিক অর্থে মাটিতে নেমে আসছে যেন জোরালো টর্চ এর আলো। এমন ঘন কালো আকাশ তো শুধু অমাবস্যাতেই দেখা যায়। তার উপর এই হাজার তারার আলোর খেলা! আর সেই খেলা দেখতে পাওয়া! এতো সত্যিই কিসমত কা খেল। এবার চোখ রাখলাম মহাযোগীর দিকে। এই গহন রাতে আপন আলোকভান্ডারের শত শত রত্নের ছটায় উদ্ভাসিত। অন্ধকারের উৎস থেকে উৎসারিত আলোয় সুসজ্জিত, স্বমহিমায় যোগনিদ্রায় মগ্ন, সমাহিত। প্রণাম জানালাম-

                                                      ধ্যায় নিত্যম রজতগিরিনিভম মহেশম




                    আচমকা কে যেন আমার পিঠে হাত রেখেছে। তাকিয়ে দেখলাম দূরদ্বীপবাসিনী । খুব নীচু স্বরে বলল - you will shrink. সম্বিত ফিরে পেলাম। মনে মনে ভাবলাম কিসমতের যে খেল আমি দেখলাম এরপর shrink করে গেলে কিছু যায় আসে না। বাকি রাতটা কেমন ঘোরের মধ্যে কেটে গেল। ঘোর অমাবস্যার রাতে এমন আলোর রোশনাই দেখার বিরল অভিজ্ঞতা কজনের ভাগ্যে হয়। পরমেশ্বরের কি নিপুণ পরিচালনা! গভীর শ্রদ্ধায় মনটা গেয়ে উঠল -
                                                           সব আলো তার কেমন করে
                                                           পড়ে আমার মুখের পরে
                                                          তুমি আপনি থাকো  আলোর পিছনে
                                                         এত আলো জ্বালিয়েছ এই গগনে
                                                         কি উৎসবের লগনে
                                                           




6 comments:

  1. Pampa Chakraborty6 May 2020 at 10:47

    'আজি যত তারা তব আকাশে, সবে মোর প্রাণ ভরি প্রকাশে। নিখিল তোমার এসেছে ছুটিয়া, মোর মাঝে আজি পড়েছে টুটিয়া হে'। অমাবস্যার অন্ধকারে তারকাখচিত আকাশের হিমালয়! তার মাঝে মানুষ, কতটুকু এক সত্তা...অপূর্ব এই লেখাটি পড়ে মনে শিহরণ জাগে। কিসমতওয়ালা তো য়ো ভি হ্যয় যো অ্যয়সা কহানি পঢ় সকে।

    ReplyDelete
  2. Hariye gelam jeno amio...keno jani na..sara gaaye kaNta diye uthlo...sob ondhokar e ki aalor utso?? Proshno theke jay mon e....

    ReplyDelete
  3. আবার মুগ্ধ হলাম। এই ধরনের অভিজ্ঞতা অবর্ণনীয়, কিন্তু আপনি খুব সুন্দর ভাবে পেরেছেন। পাহাড়ের টান যে কি, তা আমি জানি। খুব ইচ্ছে করছে কোথাও চলে যেতে।

    ReplyDelete
  4. Ki sundor barnona...anirbachoniyo...advut chobi veshe uthlo chokher samne

    ReplyDelete
  5. Mesmerised by the description. Ekdom mone holo kono planetarium er bhitore bosey akash dekhchi. Clear sky full of stars. Canopy of stars. Darun experience.

    ReplyDelete
  6. তারায় তারায় দীপ্তশিখার অগ্নি জ্বলে....
    কী অসামান্য বর্ণনা।কী গভীর আধ্যাত্মিক অনুভূতি।হিমালয় পর্যটক ও লেখিকাকে অভিনন্দন।

    ReplyDelete