Friday, 8 May 2020

তথাগতের বিচার


                                  সারা পৃথিবী এখন এক সীমাহীন অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। হাজার হাজার মানুষ হারিয়েছে তার কাজ। অনেকেই আশায় আছে এই পরিস্থিতি কয়েক দিনের মধ্যে কেটে যাবে আবার সবাই যে যার কাজ ফিরে পাবেন। গুছিয়ে নেবেন এলোমেলো হয়ে যাওয়া জীবনটা। কিন্তু সবাই কি পারবেন? না। এমন অনেক মানুষ আছেন যারা সারা বছরের প্রয়োজনীয় অর্থ উপার্জন করেন মাত্র তিন থেকে চার মাস সময়ের মধ্যে। কারণ বছরের বাকি সময় তাদের পেশার ছুটি। তারা কি পারবেন গুছিয়ে নিতে?  ইতিহাসের পাতায় নাম খোদাই হলে মানুষের বড় রোমাঞ্চ জাগে। আর  রোমাঞ্চের এই নেশা কেই পেশা করে বেঁচে থাকে বেশ কিছু মানুষ।  এমনই একদল মানুষকে আমরা চিনি শেরপা হিসেবে। 

                             শেরপা - ভারত এবং নেপালের পর্বতারোহণের প্রধান কান্ডারী। যারা দুঃসাহসিক অভিযানের মধ্য দিয়ে একের পর এক শৃঙ্গ জয় করেন তারা জানেন এই জয়ের আসল কারিগর কারা। ১৯০৯ সাল থেকে পর্বতারোহীদের মালবহনের মধ্য দিয়ে এই জগতে এদের প্রবেশ। প্রধানতঃ high-altitude porter হিসেবেই এদের পরিচিতি। পর্বতারোহীদের অভিজ্ঞতার দস্তাবেজ থেকে জানা যায় এই high-altitude porter রা নিজেদের শরীরের ওজনের দ্বিগুণ ওজন বহন করার ক্ষমতা রাখেন। আর তাই পর্বতারোহীদের মালপত্র বহনের কাজে এদের নিযুক্ত করা হয়। আরো কয়েক টি দলের মানুষ এই কাজে নিযুক্ত হলেও ১৯৩৩ সালের পর থেকে এই পেশায় একছত্র অধিকার কায়েম করেন শেরপারা। ১৯৫৩ সালের পর থেকে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেয় এই মালবাহকের দল। তেনজিং নোরগে বিশ্ব বিখ্যাত শেরপা, পর্বতারোহণ কে আগামী প্রজন্মের কাছে খুলে দিয়ে যান পেশা হিসেবে। আর আজ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভারত এবং নেপালের বিভিন্ন শৃঙ্গ জয়ের উদ্দেশ্যে যে সমস্ত অভিযাত্রী দল আসেন তাদের অভিযানের প্রধান স্তম্ভ হল এই শেরপারা। অভিযাত্রীরা যে পথে যাবেন, পর্বতের পাদদেশ থেকে শৃঙ্গ পর্য্যন্ত সেই পথ কে প্রশস্ত করেন এই শেরপারা। পর্বতারোহী দের ভাষায় যাকে route opening বলা হয়। প্রতিটি অভিযান শুরু হয় এই route opening দিয়ে যা অভিযাত্রীরা করেন না করে শেরপারা। শেরপাদের তৈরী করে দেওয়া রাস্তার একচুল বাইরে গেলে অভিযাত্রীদের সফলতার সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। পর্বতারোহণের জন্য যে সমস্ত উপকরণ লাগে সেগুলির প্রচুর ওজন। সে সমস্ত উপকরণ, তাঁবু, অক্সিজেন, খাবার দাবার এই সমস্ত কিছু বয়ে নিয়ে যান শেরপারা। দূর্গম পর্বতে ২৫০০০ ফিট বা তারও বেশী উচ্চতায়, এই বিপুল ওজন বহন করা এবং অকল্পনীয় প্রতিকুল আবহাওয়ার মধ্য দিয়ে, প্রতি পদে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, কঠিন চড়াই অতিক্রম করে অভিযাত্রী দের সহযোগিতা করে্ন এই শেরপারা। বছরে যে ক'মাস অভিযান চলে ততদিন ফুরসত নেই এই শেরপাদের। সব থেকে বেশী অভিযাত্রী আসেন মাঊন্ট এভারেস্ট জয়ের উদ্দেশ্যে।  এক এক জন শেরপা এক একটা season এ তিন থেকে চারবার এভারেষ্ট শৃঙ্গে পৌঁছে যান অভিযাত্রী দের নিয়ে। এটাই এদের পেশা। আর নিজেদের জীবন বাজি রেখে এই ক'মাসে এরা যা রোজগার করেন সেই দিয়েই পরিবরের সকলকে নিয়ে বেঁচে থাকতে হয় গোটা বছর। আবার পরের season এর অপেক্ষায়, আবার চরম অনিশ্চয়তার পথের অপেক্ষায়। এ বছর এদের কি হবে? সারা বিশ্বজুড়ে সমস্ত দেশের সরকার এবছর পর্বত অভিযান নিষিদ্ধ করেছে। এবার আর open হয়নি route। নিঠুর নিয়তি এদের গ্রাসাচ্ছাদনের একমাত্র route  এ টেনে দিয়েছে পূর্ণচ্ছেদ। এরা কি পারবে অগোছালো জীবনটাকে আবার গুছিয়ে নিতে? হয়তো পারবে। পারতে তো হবেই। তারা যে বেড়াতে যাওয়ার মত করে পাহাড়ে চড়তে জানে।


                কারা এই শেরপা। পৃথিবী জুড়ে শেরপারা যেভাবেই পরিচিত হোক না কেন আসলে শেরপা হল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, অত্যন্ত শান্তিপ্রিয়, তিব্বত থেকে ভারতে এবং নেপালে ছড়িয়ে পড়া একটি জনজাতি, যারা Tibeto-Burman language group এর সদস্য হলেও আজও দেবনাগরী হরফে লেখেন। এ হরফ তাদের নিজের দেওয়া পরিচয় সাম্বোটা নামে পরিচিত। এই শেরপা জনজাতীর মানুষ ধর্মনিষ্ঠ, অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং সবল। ১০০০০ ফিট উচ্চতার উপরে এরা থাকতে অভ্যস্ত এবং এদের প্রধান পেশা হল high altitude farming। আদতে শেরপা জনজাতির মানুষ পর্বতারোহণের ঘোর বিরোধী এবং এরা বিশ্বাস করেন পর্বত হল ভগবানের শান্তিনিবাস যেখানে পা রাখলে তাঁর শান্তিভঙ্গ করা হয়। পর্বতারোহী শেরপাদের সঙ্গে সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের উপর নির্ভরশীল শেরপা জনজাতির মানুষদের যথেষ্ট বিরোধ আছে। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় এভারেষ্ট জয় করার জন্য সারা বিশ্ব যখন তেনজিং নোরগে কে সম্মানিত করেন, তখন তাঁকে তাঁর নিজের জনগোষ্ঠী থেকে কার্যত বিতাড়িত করা হয়। ভগবানের শান্তিনিবাসের শান্তি অন্তত এক বছর বহাল থাকবে এই ভেবে খুশী এই উচ্চপর্বতের কৃষকবৃন্দ। ভগবানের ধ্যানমন্দির কলুষিত করার অভিযান বন্ধ হওয়াকে তাঁরা ভগবানের নির্দেশ হিসেবেই গ্রহণ করেন। 
                    দুটি পরস্পরবিরোধী মূল্যবোধ আর দুটি ভিন্ন পেশায় নি্যুক্ত একই জনজাতির মানুষদের মধ্যে আবহমান কাল ধরে এ বিরোধ চলে আসছে, আগামী দিনেও চলতে থাকবে। পর্বতারোহী শেরপা দের হয়তো খুঁজে নিতে হবে নতুন পথ কারণ পর্বত অভিযানের প্রশস্ত পথ হয়ত আর খুব বেশিদিন ভগবান বুদ্ধের শান্তিভঙ্গ করতে পারবে না।


                                      এভারেষ্টের চূড়ায় হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই ঘোষিত হবে স্থায়ী লকডাউন। পৃথিবীর উচ্চতম শৃঙ্গের অস্তিত্ব রক্ষায় তথাগত হয়তো সেই ফরমান জারি করবেন যাতে লেখা থাকবে শেরপা জনজাতির মনের কথা। আজ বুদ্ধপূর্ণিমার গোলাকার চাঁদের দিকে তাকিয়ে প্রার্থণা করছেন পর্বতারোহী আর তার ঘোর বিরোধী শেরপারা । ভক্তের ডাকে সাড়া দিয়ে নিজের শান্তিনিবাস খুলে রাখবেন নাকি তাঁর সৃষ্টির বিপন্ন অস্তিত্বকে রক্ষার তাগিদে বেছে নেবেন চিরশান্তির পথ - তা একান্তই তথাগতের বিচারাধীন
















5 comments:

  1. খুব তথ্যসম্বৃদ্ধ আর আকর্ষণীয় লেখা। শেরপা দের প্রতি আলাদা করে শ্রদ্ধা বেড়ে গেল, আশা করি পর্বতারোহী শেরপা গোষ্ঠী নিজেদের অসীম সাহস আর ক্ষমতা বলে জীবিকা নির্বাহের বিকল্প পথ খুঁজে নেবে।

    ReplyDelete
  2. Koto ki janlam...riddho holam..sotti e to, emon koto manush er bhobishyot aj proshner mukhe...Iswar Korunamoy...Nischoi poth dekhaben..🙏🙏🙏

    ReplyDelete
  3. Pampa Chakraborty8 May 2020 at 16:19

    এই মূল্যবোধ আছে বলেই শেরপারা অন্যান্য জনজাতির থেকে আলাদা। ধর্মীয় বিশ্বাস এখানে প্রকৃতি ও পরিবেশের রক্ষা কবচ।
    অপর দিকে উপার্জনের জন্য শেরপাদের বিশেষ দক্ষতা তাদের আর্থিক দিকে সাহায্য করে, এ কথাও গুরুত্বপূর্ণ।
    তথ্য সমৃদ্ধ সুন্দর এই লেখাটি পড়ে পাঠকমনে তাই প্রশ্ন জাগে.. . তাহলে?
    ধর্মবিশ্বাসী বনাম পর্বতারোহী শেরপাদের মধ্যে এ এক অদ্ভুত প্যারাডক্স। মনে মনে দুই পক্ষের জন্যই্ সমর্থন জাগে। এক্ষেত্রে পর্বত আরোহণ পটু শেরপাদের বিকল্প পথে উপার্জনের কথা ভাবতে হবে সকলে মিলে।

    ReplyDelete
  4. অনেক নতুন কথা জানা গেল। এভারেস্টের লাইন পড়ার ছবি রীতিমত চিন্তার। যারা প্রতিকুল প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে জিতে যান, তাঁরা নিশ্চয় প্রতিকুল পরিস্থিতির সঙ্গেও লড়াইয়ে জিতে যাবে।

    ReplyDelete