Sunday, 30 August 2020

ত্বং গতি পরমেশ্বরঃ

               সেদিন সকালে বেশ ভালো বৃষ্টি পড়ছিল। ফুল আনতে যাব কি যাব না বুঝতে পারছিলাম না । কেমন যেন মনে হল যাই, আজ সোমবার ফুল ছাড়া পূজো করব! বেরিয়েই পড়লাম। বাজারে বেশ কয়েকজন মহিলা ফুল নিয়ে বসেন তার মধ্যে একজন প্রতি সোমবার সাদা আকন্দফুলের মালা গাঁথেন এক কোণায় বসে। সঙ্গে আরো অনেক কিছু থাকে তার। বাড়ির গাছ থেকে তুলে আনা একটু টগর ফুল, বেশ কয়েক রকম রঙের জবা, কচু শাক, ব্রাহ্মী শাক, কচি নিমপাতা এইরকম আরকি। সবকিছুই বাড়ি থেকে আনা। চেহারায় আর পোশাকে দৈন্যের ছাপ পরতে পরতে কিন্তু মুখে লাখ টাকার হাসি। বর্ষার সকালে আমাকে দেখে সে হাসি আরও চওড়া হয়ে গেল। আমি প্রতি সোমবার সাদা আকন্দ মালার বাঁধা খরিদ্দার। আমার  মনটাও যেন ভাল হয়ে গেল। ইস যদি না আসতাম বেচারির মালাটা বিক্রি করতে অসুবিধে হত হয়তো।  কাছে এগিয়ে দেখলাম মাসির ডানহাতে চওড়া ব্যান্ডেজ আর হাতটা বেশ ফুলে রয়েছে। কিন্তু তাতে মালা গাঁথায় কোন ছেদ পড়েনি। জিজ্ঞাসা করলাম কি হয়েছে মাসি তোমার হাতে! মুখটা দেখে মনে হচ্ছে খুব যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে। বলল - "দেখো না মাসি একটুখানি জায়গা তো, কালকে বাঁশের এই খোঁটা র উপর বঁটি টা রেখেছিলাম, একটা লোক বাজারের ব্যাগ দিয়ে ধাক্কা দিল আর বঁটিটা এসে আমার হাতে পড়ে গেল। ছটা সেলাই পড়েছে। এখন তো তাও কম আরও ফুলে গেছিল হাতটা। সব আকন্দ ফুল গুলোয় রক্ত লেগে গেল।" আমি বললাম তার উপরে মালা গেঁথে যাচ্ছ! মনে মনে ভাবলাম প্রশ্নটা করা ঠিক হল না। সত্যিই তো মালা না গাঁথলে কি আর চলবে বেচারির! আমার সমস্ত ভাবনাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে মাসি উত্তর দিল - "শিবের মালা গাঁথছিলাম বলে তো ছটা সেলাই তে হয়ে গেল। নাহলে তো হাতটাই কেটে পড়ে যেত!" কি বলব বুঝে পেলাম না। মাসির এই উত্তর আমাকে যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেল ভক্তের ভরসার ঠিক কোন জায়গায় ভগবানের বাস -

সদা বসন্তম হৃদয়ারবিন্দে 

 

       সেবার মদমহেশ্বর থেকে ফেরার পথে বৃষ্টির জন্য আঁটকে পড়েছিলাম উখীমঠে। কি খেয়াল হল সন্ধ্যারতি দেখব উখীমঠ মন্দিরে। কেদারনাথের মন্দির যে সময় বন্ধ থাকে, তখন  এই মন্দিরে তাঁর ভোগমূর্তি পূজিত হয়। সন্ধ্যারতি শেষ হয়ে যাওয়ার পর বেরিয়ে দেখলাম বেশ বৃষ্টি হচ্ছে, চারিদিক অন্ধকার। এই অবস্থায় হেঁটে ভারত সেবাশ্রমের যাত্রীনিবাসে ফেরা অসম্ভব। আমার মত আরও বেশ কয়েকজনের অবস্থা দেখে এক সহৃদয় ব্যক্তি আমাদের একটি গাড়ি করে এগিয়ে দিতে রাজি হলেন। চড়ে বসলাম। আমার পাশে বসলেন নীচের দিকের গ্রামের একজন মহিলা। আমার গন্তব্যের দু'একটা বাঁক আগেই তিনি নেমে গেলেন। হাতের টর্চ জ্বালিয়ে দুরন্ত গতিতে মিলিয়ে গেলেন পাহাড়ের ঢালে। পরের বাঁক টা ঘুরেই আমাদের গাড়ি সশব্দে দাঁড়িয়ে পড়ল। হেডলাইট ও নিভিয়ে দিলেন রাকেশ ভাইয়া। জানা গেল সামনে একটা তেন্ডুয়া বসে আছে। তেন্ডুয়া, বাঘ জাতীয় এক হিংস্র প্রাণী যাকে এ অঞ্চলের লোকজন বেশ ভয় পায়। আমাদের কথা বলা, নড়াচড়া সব বন্ধ। প্রায় মিনিট কুড়ি পর সেই তেন্ডুয়া ঠিক সেই জায়গাটা দিয়ে পাহাড়ের ঢালে নেমে গেল, যেখান দিয়ে কিছুক্ষণ আগে ওই মহিলা নেমেছিলেন। রাকেশ ভাইয়া হায় হায় করে উঠলেন - ইয়ে তো গয়া। কি মর্মান্তিক!। একটু আগে যে মহিলা আমার গা ঘেঁষে বসেছিলেন? মনে হচ্ছিল আমার দমটা এক্ষুণি বন্ধ হয়ে যাবে। যাত্রীনিবাসে এসে স্বামীজি কে বললাম। মনে হল উনি মহিলাকে চিনতে পারলেন, কিন্তু কিছু না বলে ঘরে চলে গেলেন। কি যে  কষ্ট কাউকে বোঝাতে পারছিনা। কি করে খবর পাব ওই মহিলার। এ কেমন মহিমা তোমার! তোমার দরবার থেকেই তো ফিরছিলেন! খুব ভোর থেকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি, যদি কোন খবর পাই। বৃষ্টির জন্য রাস্তায় কোন লোক ই নেই। ঘরে চলে গেলাম। কিছুক্ষণ পর স্বামীজী ডেকে পাঠালেন। বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। স্বামীজী কি বলবেন সে তো জানাই আছে। গেলাম। দেখলাম বড় একটা দুধের ক্যান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মহিলা। আমি অনেক কিছু জানতে চেয়ে কিছুই বলতে পারলাম না। স্বামীজীর ইশারায় উনিই দিয়ে দিলেন আমার সব প্রশ্নের উত্তর। "ও তেন্ডূয়া মেরে পিছে ভাগা লেকিন ও যো ভৃংরাজ কা জঙ্গল হ্যায় না, ও পার নহি হো পায়া। রোজ যো চঢ়াতি হুঁ না বাবা কি শর পে।" 

        ভৃঙ্গরাজ, পাহাড়ের ঢালে জন্মানো এক ফুল, যে ফুলের মালা প্রায় দুবছর শুকায় না এবং সমস্ত কেদারক্ষেত্রে কেদারনাথ কে এই মালা পরানো হয়। স্বামীজী আমার দিকে তাকিয়ে বললেন  - 'মা, ডুবলে পুরোটা ডুবতে হয়' ।


 ত্বং গতি পরমেশ্বরঃ

 

 

10 comments:

  1. বিশ্বাস এ মিলায়ে বস্তু. দৈনন্দিন জীবনে পাওয়া বিশ্বাস ও ভক্তি র নিদর্শন

    ReplyDelete
  2. Sotti... bishwas onek sahosh jogai..Onek kichu manusher dwara sombhob hoi sudhu biswas er jore.....Ar enader biswas holo ekkebare innocent and linear....From the heart

    ReplyDelete
  3. Bhasa hariye gelo hothat....ki bolbo bujhte parlam na..gaaye kaNta diye uthlo..sotti to, ei sohoj katha ta amra bhuley jai keno,tai to ato kosto...
    "Duuble,puro ta duub te hoy..."..🙏🙏🙏

    ReplyDelete
  4. সত্যি বাবার উপর ভরসা রাখাই সব...জয় ভোলানাথ🙏🙏🙏

    ReplyDelete
  5. এই বোধ হয় বিশ্বাসের জোর। ভাবা যায় না।

    ReplyDelete
  6. পম্পা চক্রবর্তী30 August 2020 at 20:26

    সহজ সরল এই মানুষগুলির বিশ্বাস দেখলে বিস্ময়ের সীমা থাকে না। জীবন পথে যাত্রার সময় এই বিশ্বাস যাদের পাথেয়, তাঁদের নমস্কার। মনে পড়ে সেই মধুসূদন দাদার ভরসায় অন্ধকারে চলা নিষ্পাপ বালকের গল্প। বাস্তবেও এনারা রয়েছেন, লেখাটি পড়ে মন ভরে গেল। নমস্কার জানাই লেখনিকারকে আর সেই বিশ্বাসময় মানুষগুলিকে, যাদের মধ্যে আছেন.. .
    "চির বন্ধু চির নির্ভর চির শান্তি" ��

    ReplyDelete
  7. Dubsagar e doba etotai kothin je, korte parle mukti ei jibon theke.

    ReplyDelete