Tuesday, 22 September 2020

অজানা ভারতবর্ষ

                             বাজারে গেলেই আজকাল আলু নিয়ে নিত্যনতুন আলোচনা শুনতে পাই। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় কোন ভাবেই যার বাদ পড়ার কোন অবকাশ নেই, সে যেন এখন সোনার সাথে পাল্লা দিতে চায়। আজ আবার এক নতুন চিত্র দেখলাম।  বাছাই পর্বের পর যে সমস্ত আলু খরিদ্দারের থলিতে স্থান পায় না, তাদের সযত্নে ভরা হচ্ছে অন্য একটি বস্তায়। এ আলু নাকি সিদ্ধ হয়ে চলে যাবে খাবারের দোকানে। অর্থাৎ পছন্দ না হওয়ায় যাকে বাতিল করা হল, তাকেই সাজিয়ে গুজিয়ে পরিবেশন করা হবে আর নিজের অজান্তেই বাতিল করা আলুর সিদ্ধ করার দাম চোকাবেন কোন এক ক্রেতা। এই তো আমাদের চেনা ভারতবর্ষ।
                            হিমালয়ের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে ভারতবর্ষের অনেক অজানা কাহিনী, অচেনা মানুষ। পৃথিবীর অন্য প্রান্তে বছরে  ছ'মাস দিন আর রাত এর মধ্যে বেঁচে থাকা মানুষের খবর আমরা সবাই রাখি কিন্তু বছরে ছমাসের ও বেশি সময় দেশের অন্যপ্রান্ত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকা অন্য এক ভারতবর্ষের কথা আমাদের অনেকেরই অজানা। সাচ পাস হিমাচল প্রদেশের অন্যতম একটি পাস যা এই অজানা ভারতবর্ষকে মূল ভুখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। সাচ পাস বছরের অনেকটা সময় বরফে ঢাকা থাকে, ফলে বন্ধ হয়ে যায় সমস্ত চলাচলের পথ। অজ্ঞাতবাসে যায় এক নির্জন উপত্যকা পাঙ্গি। ইতিহাস বলে রাজদরবারে শাস্তিপ্রাপ্ত হিমাচলীদের এই নির্জন উপত্যকায় নির্বাসন দেওয়া হত। তাদেরই বংশধররা আজ এই উপত্যকার অধিবাসী। 
                                   পাঙ্গি উপত্যকার অনেক আকর্ষণ আছে যার অন্যতম হল এর নির্জনতা। পাহাড়ের ঢাল বরাবর আগুন ঝরানো ভুজ গাছ গুলো জানিয়ে দেয় কত প্রাচীন  এই ভূখন্ড। এই উপত্যকায় পাহাড়ের বৃত্তের মধ্যে একটুকরো প্রাণের স্পন্দন - সুরাল। মাত্র কয়েকঘর মানুষ নিয়ে তৈরী ছোট্ট জনপদ। আমরা রাত্রিবাস করব সরকারি বাংলোয় যেখানে পৌঁছানোর কোন নির্দিষ্ট রাস্তা নেই। একজন কেয়ারটেকার রাতে খিচুড়ি বলে একটু হলুদ দেওয়া ভাত রেঁধে দিল 
 সঙ্গে একটা আলু বিহীন তরকারি।  পাহাড়ে আলু মহার্ঘ। 


 
সুরাল

                                   আমাদের পরবর্তী গন্তব্য হুডান। হুডানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বর্ণনা করার মত ভাষা আমার সংগ্রহে নেই। হুডানের পাহাড়ে বিভিন্ন বয়সের ভুজ গাছ গুলোর রঙ দেখলে মনে হয়, খেলার ছলে কোন শিশু তার ছবি আঁকার সমস্ত রঙ ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। এই রঙবাহারী প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা মানুষগুলোর প্রত্যেকের  বুকের মধ্যে লুকিয়ে আছে আস্ত হিমালয়। প্রতিটি বাড়ির মানুষ যেন আমার পরম আত্মীয়। অতিথি আক্ষরিক অর্থেই ওদের কাছে নারায়ণ। গ্রামের মেঠো রাস্তা দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে জানা গেল তাদের সুখ দুঃখের নানা কাহিনী যার অধিকাংশই কঠিন জীবন সংগ্রামের আবেগ মাখানো বিবরণ। 
 
 

 হু্ডান
 
 
                               আর কয়েকদিনের মধ্যেই নির্বাসনে যাবে পাঙ্গি। প্রত্যেক পরিবারে চলছে আগামী কয়েক মাসের রসদ সঞ্চয়ের চুড়ান্ত প্রস্তুতি। একটি বাড়ির সামনের একচিলতে জমিতে ফলানো আলু মাটি খুঁড়ে তুলছেন এক বৃদ্ধা। পাহাড়ি হিমেল হাওয়াতেও শরীর ঘামে ভেজা। কৌতুহলী চোখে দাঁড়িয়ে আমরা। হঠাৎ একটা ছোট বস্তায় ভরতে লাগলেন সদ্য মাটি থেকে তোলা আলু। তা প্রায় কেজি দেড়েক তো হবেই, বেশিও হতে পারে। তারপর সেই বস্তা টা নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন আমাদের দিকে - লে যাইয়ে। এই মহার্ঘ ফসল অবলীলাক্রমে আমাদের নিয়ে যেতে বলছেন! আমরা নিজেদের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিনা। উনি নাছোড়বান্দা। ওনার এই আতিথেয়তা যে আমাদের স্বপ্নের অতীত। আমাদের শহুরে মন, দেনা পাওনার নিরিখে দুনিয়া দেখতে অভ্যস্ত। কেবল মনে হচ্ছে এতটা আলুর তো অনেক দাম হবে! কিন্তু এই বৃদ্ধার উদার হৃদয়ে সে দামের তো কোন স্থানই নেই। তাঁকে টাকা পয়সার কথা বলাটাও তো আমাদের পক্ষে অসম্ভব। আমাদের এক সহযাত্রীর পকেটে ছিল একটি দশ টাকার কয়েন। তখন সবে বের হয়েছে, এই ভুখন্ডে  অবশ্যই মহাজাগতিক। নতুন জিনিস বলে সেই বৃদ্ধাকে সেই কয়েন দিতে পেরে আমাদের দেনা পাওনার হিসাব যেন একটু চুকল। চার দেওয়ালের মধ্যে জীবন কাটিয়ে আমাদের চিন্তার পাখি পাখা মেলে না। আমরা কি করে পাব এই অনন্ত আকাশের হদিশ! বেশ কয়েকদিন ধরে আমাদের সাথে গাড়িতে চলতে লাগল সেই আলুর বস্তা এবং সেই সঙ্গে সেই বৃদ্ধার প্রসঙ্গ।  পৃথিবীর বুকে দেখা একটুকরো স্বর্গের মত গ্রামের স্বর্গীয়, আত্মবিস্মৃত একজন গ্রামবাসীর প্রসঙ্গ। সমস্ত পাঙ্গি উপত্যকা ঘুরে আমরা পৌঁছলাম মানালি। এবার আলুগুলোর একটা ব্যবস্থা না করলে সেই বৃদ্ধার প্রতি চরম অশ্রদ্ধা দেখানো হয়। অবশেষে অনুরোধ করা হল হোটেলের মালিককে, আলুগুলো সিদ্ধ করে দেওয়ার জন্য। গরম আলু সিদ্ধ থেকে বেরোন ধোঁয়া যেন মনে করিয়ে দিল নির্মল সেই হাসি - লে যাইয়ে। নরম আলু তে যেন তাঁর স্নেহের পরশ।  
              আমাদের বেড়ানো শেষ। হোটেলের বিলে দেখলাম আলু সিদ্ধ করার জন্য একশো টাকা মূল্য ধার্য হয়েছে। একটুও অবাক হলাম না। সমস্ত ছোট ছোট বিষয় কে লাভ আর লোকসানের ছাঁচে ফেলে বৈভবের পুতুল গড়ার এই রঙ্গমঞ্চ আমাদের সকলের চেনা। চেনা নেই সেই একখণ্ড পৃথিবীকে, যেখানে অমানসিক পরিশ্রম করে পাথুরে মাটি ফাটিয়ে ফলানো ফসল অবলীলাক্রমে অতিথিকে উপহার দেওয়া যায়। জানা নেই সেই মানুষ গুলোর প্রতিদিনের সংগ্রামের কথা। সে সংগ্রামের বিরূদ্ধে অনুযোগ করার কোন উপায় বা বাসনা কোনটাই তাদের নেই। বছরের একটা লম্বা সময়ে প্রকৃতি যাদের নির্বাসন দেয়, তাদের হৃদয়ের দরজা খোলা থাকে বৈভবের দুনিয়া থেকে লাভ লোকসানের অংক কষে আসা তথাকথিত উন্নত অতিথিদের জন্য। বসুধৈব কুটুম্বকম - এর সঠিক প্রয়োগ হয় এই বিচ্ছিন্ন ভুখন্ডে। এ এক অচেনা পৃথিবী, অজানা ভারতবর্ষ।


 
 

                               

8 comments:

  1. অতুলনীয় বর্ণণা ম‍্যাম🙏🙏

    ReplyDelete
  2. Ahhaa....boddo bhalo laglo...🙂

    ReplyDelete
  3. পম্পা চক্রবর্তী23 September 2020 at 15:54

    হিমালয়ের বুকের এই মানুষগুলির অন্তরের ব্যাপ্তি ও তেমনি বিশাল। তাঁরা মূল ভূখণ্ডের অগণিত মানুষের হৃদয়ের হিসেবে সঙ্কীর্ণতা কে কল্পনা ই করতে পারেন না। দেবভূমি তে স্বর্গের কাছে থেকে তাঁরা যেন দেবত্বে উপনীত হয়েছেন। তাই তাঁরা প্রণম্য। অনবদ্য এই লেখা পড়ে অন্তর শ্রদ্ধায় ভরে গেল। লেখিকা কে অসংখ্য সাধুবাদ জানাই।

    ReplyDelete
  4. Himalay theke koto kichhui na janar...shekhar.. osadharon.

    ReplyDelete
  5. নিজ পরিশ্রম এ লব্ধ ফসল অনায়াসে ভাগ করে নেওয়া যায়. যে পরিশ্রম করেসে জানে আবার পরিশ্রম করলে আবার উপলব্ধ হবে. বিনা পরিশ্রম এ উপলব্ধ জিনিস আগলাতে আমরা বড় ব্যস্ত. এক যথার্থ নৃতত্ত্ববিদ এর কাছ থেকে মানবজাতির এই মনসতাত্বিক দিক টা সুন্দর ভাবে উন্মোচন করার জন্য, লেখিকা কে সাধুবাদ জানাই. কুর্নিশ

    ReplyDelete
  6. This comment has been removed by the author.

    ReplyDelete
  7. Chamatkar manush sei sange lekha o chhobi...sei briddha r chhobi dekhte paarle khub bhalo laagto..

    ReplyDelete
  8. Aloo khub priya sabji..dewa neoya, ei je dualism, etake materialistic sense e na nilei valo. dualism ache bolei creation theme thake ni, ar thakbeo na. Manush valobashar kanwal. tai ektu valobaslei habe...

    ReplyDelete