এক বান্ধবীর ছেলে ছোটবেলায় খুব গভীর এক প্রশ্ন করেছিল। ' মা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দুর্গা ঠাকুরের কে হয়?' ছোট্ট বাচ্ছার ছেলেমানুষি মনে করে আমরা খুব হাসাহাসি করলেও পরে অনেক ভেবে দেখেছি বিশ্বের দরবারে দুর্গা ঠাকুর আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছাড়া বাঙ্গালীর আর কোন গ্রহণযোগ্য পরিচয় নেই। তাই দুর্গা ঠাকুর আমাদের মনের ঠাকুর আর রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রাণের ঠাকুর। এর মত চিরকালীন সম্পর্ক সত্যিই বোধহয় আর কিছু নেই।
বাবার কাছে গল্প শুনেছি আমার ঠাকুরদামশাই এর বাড়ি ছিল জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির ঠিক পাশে। ছোটবেলায় বাবার সাথে গিয়ে একবার দেখেও এসেছিলাম বাড়িটা। মনে মনে বেশ গর্ব হয়েছিল এটা ভেবে যে আমার পূর্বপুরুষরা ঠাকুরবাড়ির প্রতিবেশী ছিলেন। পারিবারিক গল্প কথায় এও শুনেছি আমার বাবার জন্মের সময় ইডেন হস্পিটালে যে শয্যায় আমার ঠাকুমা শ্রীমতি বিমলা সুন্দরী দেবী ছিলেন, সেটি ঠাকুরবাড়ির কোন এক ব্যক্তির দেওয়া gift bed। কেমন যেন একটা অদ্ভুত ভালোলাগা অনুভব করেছি এসব গল্প শুনে। আমার বাবার ঠাকুমা শ্রীমতি সিন্ধুবালা দেবী বাড়ির ছাদ ডিঙিয়ে ঠাকুরবাড়ির অন্দরে যেতেন। ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে মহিলাদের তাস খেলার সঙ্গী ছিলেন তিনি। শুনে মনে হয়েছে আহা কি ভাগ্যবান এনারা। ঠাকুরবাড়ির অন্দরে যাদের অবাধ যাতায়াত, ঠাকুর পরিবারের মানুষজনের সাথে যাদের নিত্য ওঠাবসা তাঁরা তো ইহলোকেই স্বর্গসুখ পেয়েছেন। সত্যিকারের 'ঠাকুর দেখা" মানুষ।
এরকম 'ঠাকুর দেখা' মানুষ আমাদের পরিবারে অনেকে ছিলেন। আমার ঠাকুরদামশাই নাটক, যাত্রাপালা, কবিগান ইত্যাদি সূত্রে ঠাকুরবাড়ির পাড়ার লোক হিসাবে বিশেষ মান্যতা পেতেন। আমার জ্যাঠামশাইরা ঠাকুরবাড়ির খুদে সদস্যদের সাথে খেলাধুলা করে বড় হয়েছেন। তাঁদের বয়স অল্প হলেও তাদের "ঠাকুর দেখা" র গল্প আমরা অনেক শুনেছি। ঠাকুরবাড়ির উঠোনে খেলতে গিয়ে তাঁরা বহুবার 'রবিঠাকুর' কে দেখেছেন। তাঁদের কাছে বিস্ময়ের কিছু ছিল না কারণ তিনি তো পাড়ার দাদু । ওনাদের মুখে শুনেছি একজন মানুষের কথা যাঁর একমুখ সাধুর মত দাড়ি। লম্বা ঝুলের জামা পড়ে গা এলিয়ে রোদে পিঠ দিয়ে বসে থাকা পাশের বাড়ির দাদু। বিস্ফারিত চোখে ভাবতে বসেছি আমরা - আহা এমন যদি আমরা দেখতে পেতাম। কখনো বা ওনাদের বলেছি এসো তোমাদের একটু ছুঁয়ে নিই। 'ঠাকুর দেখা' র পূণ্যফলের কিছুটা যদি পেতে পারি। আজ একে একে এই সব 'ঠাকুর দেখা" মানুষরা অনেকেই চলে গেছেন ঠাকুর হয়ে। আমার পরিবারে এই দলের একমাত্র জীবিত সদস্য আমার বড় পিসি। শান্তি বাউনী - এই নামে বড়পিসি বেশি পরিচিত। এখন বড়পিসিই একমাত্র সদস্য যিনি রবিঠাকুরের সাথে কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন। পাড়ার সব সইরা মিলে ঠাকুরবাড়ির বাগানে নিত্য যাওয়া আসা, সাজি ভরে নিয়ে আসা ঠাকুরবাড়ির ফুল, আর সেই সঙ্গে ঠাকুরের সাথে কথা বলা। ছোট্ট এই সখীর দলকে রবিঠাকুর সাবধান করে বলতে্ন, ' দেখো যেন গাছের ডাল না ভাঙ্গে' । এই গল্প ছোট থেকে কতবার শুনেছি তার হিসাব নেই। কিন্তু আর কতদিন। অশীতিপর আমার বড়পিসির চোখ দিয়ে আমাদের এই 'ঠাকুর দেখা' র বিজয়া কালের নিয়মে কবে যে এসে পড়বে জানিনা। কিন্তু আমাদের মধ্যে কোথাও বোধহয় লুকিয়ে থাকবে এইসব গল্প শোনার অনাবিল আনন্দ আর সেইসমস্ত ভাগ্যবান মানুষদের সান্নিধ্য সুখ যারা দুর্গাঠাকুর ও দেখেছেন আবার রবিঠাকুর ও দেখেছেন।
Pronam Janai🙏🙏
ReplyDeleteIntangible heritage র উত্তরাধিকারী হিসাবে, লেখিকা ও সমভাবে ভাগ্যবতী. তোমার দ্বারে কেন আসি ভুলেই যে যাই, কতই যে পাই
ReplyDeleteস্মৃতিচারন বেশ লাগল
ReplyDeleteSundar smriticharon o 'thakur' dekha.
ReplyDeleteShanti bauni r mukhe e golpoti amra o chotobela theke bohubar shunechi aar mone mone jeno sotti robi thakur ke dekhechi....
ReplyDeleteKintu aaj ei shundor smriticharon ti tule dhorar jonyo tomake oshonkyo dhonyobaad o bhalobasha.....
Didar kache shona golpogulo eto shundor kore tumi sajiye dhorecho ta obhutopurbo! Sarthok amader Didar chokh diye Thakur dekha... Etei amra dhonyo.. onek bhalobasha nio Somamasi
ReplyDeleteমনের ঠাকুর আর প্রানের ঠাকুর.. দুয়ের দেখা পাওয়া, অসীম সৌভাগ্য! পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারা এইভাবেই যেন পরম যোগ্য উত্তরসূরীদের মাধ্যমে নিত্য বহমান থাকে। লেখা পড়ে মন ভরে গেল।
ReplyDeleteKi sundor smriticharon.eishob purono din er manushder khub privileged mone hoi kintu onader kache otai chilo shabhabik
ReplyDeleteRelate korte parle, emotions gulo o jeno vetor theke chagar diye othe. Sarir er lom gulo ki kore je ullombo vabe dariye jay r ki je janate chai, aj obdhi bujhtei parlam na.
ReplyDeleteBes laglo..amra hoito ei sob experience kichui paini r kono golpo o sunini..
ReplyDeleteThank you all
ReplyDeleteKhub bhalo laglo
ReplyDelete