Sunday, 11 April 2021

ধুণ কি গুণ

                অতিমারীর দৌলতে আমাদের অকাল অবসর জীবনে এখনো ছেদ পড়ে নি। গ্রীস্মের দুপুরের ক্লান্তি কাজের মধ্যে তবু কাটানো যায় কিন্তু এই গৃহবন্দী জীবনে দুপুরটা কাটানো যেন এক শাস্তি। বই পড়লে চোখ বন্ধ হয়ে আসে, টিভি খুললে শুধু ঝগড়া আর অশ্রাব্য গালিগালাজ।  বাধ্য হয়ে মাঝে মাঝে একটু গান শুনি। হঠাৎ খোঁঁজ করতে করতে এক বাঙালী সুফি গায়কের সন্ধান পেলাম। তাক লাগিয়ে দেওয়ার মত সুফি গান গায় ছেলেটি। যেমন তার গায়কী তেমনি তার কন্ঠস্বর। প্রচন্ড energy ছেলেটির পরিবেশনায়। বড় ভালো লাগছে। একটার পর একটা শুনছি। অনেক শ্রোতা তাদের মতামত জানিয়েছেন গান শুনে সেগুলোও নেড়েচেড়ে দেখি। একটি কবীরের দোঁহা শুনছিলাম -  নগর পে চোর আয়েগা। বেশ গভীর বাস্তব তত্ত্বের গান। দেখলাম কোন একজন শ্রোতা লিখেছেন গানের একটি শব্দও বুঝতে পারিনি কিন্তু গানটি খুব ভালো লেগেছে। একেই বোধহয় বলে শিল্পকলার মহিমা আর শিল্পীর পারদর্শিতা। কিভাবে যে শ্রোতার হৃদয়ে সুর পৌঁঁছে যায় তা কেউ জানেনা, শুধু সেই সুরের মূর্ছনা শ্রোতাকে যেন আবিষ্ট করে রাখে। 

               ক'দিন ধরে হিমালয়ে যাওয়ার জন্য মনটা যেন ছটফট করছে। মেঘ পিওনের ব্যাগের ভিতর মনটাকে পুরে পাড়ি দিলাম হিমালয়ে। বদ্রীনাথধামের ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের যাত্রীনিবাসে সেবার বেশ কয়েকদিন ছিলাম। প্রচন্ড ঠান্ডা। চারিদিকে বরফের পাহাড় আর তা থেকে ধেয়ে আসা হাড় কাঁপানো ঠান্ডা হাওয়া। যাত্রী  গিজ গিজ করছে। যাত্রীনিবাসে তিল ধারণের জায়গা নেই। একটা করে বাস এসে দাঁড়ায় আর শয়ে শয়ে যাত্রী নামে।  ভারতসেবাশ্রমের সমস্ত যাত্রীনিবাসে একটি মন্দির থাকে সেখানে সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা গুরু মহারাজ প্রণবানন্দ স্বামিজীর নিত্য পূজা আরতি করা হয়। আরতি শেষে যে তীর্থক্ষেত্রের যাত্রীনিবাস, সেই তীর্থক্ষেত্রের বিরাজমান দেবতার জয়ধ্বনি দেওয়া হয়। এমনই রীতি। যেমন কেদার ক্ষেত্রে আরতির শেষে কেদারনাথের জয়ধ্বনি করা হয়, রামেশ্বরমে রামেশ্বর মহাদেবের জয়ধ্বনি হয় এইরকম। ঠিক তেমনই আরতি শেষে এখানে সমস্ত ভক্ত মিলিত কন্ঠে বদ্রীবিশালের জয় জয়কার করেন। এই আশ্রমের মহারাজ খুব সঙ্গীতপ্রেমী। ওনার কন্ঠ যে খুব সুরেলা তা নয়, কিন্তু প্রতিদিন আরতির পর উনি বেশ কয়েক জন যাত্রী, সাধু, মহারাজদের নিয়ে গানের আসর বসান। একদিন দেখলাম গান শুনতে অনেক ছোট ছোট ছেলেমেয়ে এসেছে। মাথার চুল এলোমেলো, এই হাড় কাঁপানো ঠান্ডা আঁটকানোর জন্য পর্য্যাপ্ত শীতবস্ত্রও  তাদের নেই। জামা কাপড় যথেষ্ট মলিন। মহারাজ তাদের ধরে বেঁধে নিয়ে এসে ভজন শোনাচ্ছেন। আর মহারাজের কথা অমান্য করা যায় না, তাই ভালো না লাগলেও চুপ করে বসে আছে তারা।  মহারাজের সাথে পরে কথা বলে জানতে পারলাম, পাহাড়ে রাস্তা বানানোর জন্য যে সমস্ত শ্রমিক তাদের পরিবার নিয়ে এসেছে, এরা তাদেরই ছেলে মেয়ে। পাহাড়ে রাস্তা বানানো যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ কাজ, তাই তত দিন এই ছেলেমেয়ে গুলো যাতে একটা ভালো পরিবেশে থাকতে পারে তাই মহারাজ ওদের আশ্রমেই আশ্রয় দিয়েছেন। খুব ভালো লাগল মহারাজের এই সিদ্ধান্তের কথা শুনে। পরদিন সকাল থেকে মন্দিরে একটা ধুণ বাজতে শুরু করল। বিখ্যাত এক দক্ষিণী শিল্পীর কন্ঠে  অখন্ড নারায়ণ ধুন, অপূর্ব তার সুরের মুর্ছনা।

শ্রীমন নারায়ণ নারায়ণ নারায়ণ

ভজ মন নারায়ণ নারায়ণ নারায়ণ

              আশ্রমের গরম জলের প্লান্টের কাছে মহারাজ একটা বড় বস্তা নিয়ে বসে আছেন। আশ্রমের একটি ছেলেকে বলেছেন বাচ্চাগুলোকে ডেকে নিয়ে আসতে। কিছুক্ষণ পরে এক দঙ্গল বাচ্ছা হই হই করে জড়ো হল।  মহারাজ বস্তাটা খুললেন। বাচ্ছা গুলোর জন্য বেশ কিছু জামাকাপড় দিয়ে গেছে গ্রামের লোকজন। মহারাজ একটি করে বাচ্ছাকে ডাকছেন আর তাদের মাপসই একটি করে জামা দিচ্ছেন। তারা যেন আকাশের চাঁদ পাচ্ছে হাতে। তাদের মুখের  হাসির কোন তুলনা হয় না। এবার মহারাজ ওদের সবাই কে নিয়ে বসেছেন, সারাদিনের রুটিন বোঝাচ্ছেন ওদের। সমস্ত কিছুর পরে বললেন - ইয়ে যো ধুন বজ রাহা হ্যায় উসে হর কাম মে শুননা। 

         সারাদিন সমস্ত গান বাজনা বাদ দিয়ে ওই নারায়ণ ধুণ চলতে লাগল আশ্রমে।  বাচ্ছাগুলো সারাদিন হই হই করে, নিজেদের মধ্যে ঝগড়া কখনো বা খুনুসুটি সব চলতে থাকে, তার সাথে ওই ধু্ণ ও চলতে থাকে। আশ্রমের অন্যান্য সাধু, আবাসিক, যাত্রী  সবাই ওই একঘেয়ে ধুণ শুনতে শুনতে বিরক্ত। মহারাজ নির্বিকার। সকালে ঘুম থেকে উঠেই ওই ধু্ণ চালিয়ে দেন। আরতির সময় টুকু বাদে সারাক্ষণ এই ধুণ চলতে থাকে। সকলের মুখে এক কথা আরে ধু্ণ শোনালেই কি এরা ভাল হয়ে যাবে! মহারাজ ও যেন বিষয়টি চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিয়েছেন। এইভাবে প্রায় দিন তিনেক কেটে গেল। পরিপাটি করে চুল আঁচড়ানো, পরিস্কার জামাকাপড় পরা আর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকা ছাড়া তাদের অভ্যাসের বিশেষ পরিবর্তন আমার চোখে তো পড়ল না। সারা আশ্রমে যেন একটা থমথমে পরিবেশ। মহারাজকে কেউ কিছু বলতেও পারেন না, আবার এই অনাসৃষ্টি যেন সইতেও পারেন না। অখন্ড ধুণ কিন্তু এক মুহুর্তের জন্যও থামে না। মনে মনে ভাবি আমি দু দিনের অতিথি এসবের মধ্যে আর নাই বা জড়ালাম। কিন্তু মহারাজের আত্মবিশ্বাসী চোখ যেন আমাকেও বিশ্বাস করতে বাধ্য করে ধুণ কি গুণ নিশ্চয়ই প্রকাশ পাবে। 

            আমার ফেরার সময় হল। একদম ভোরের বাসে রওনা হব যাতে অন্ততঃ ঋষীকেশ অবধি পৌঁঁছতে পারি। মহারাজ কে প্রণাম করে যাওয়ার অনুমতি চাইলাম। মহারাজ ওই বাচ্ছাগুলোর মধ্যে একটি ছেলেকে ডাকলেন - 'আব্দুল, যাও দিদি কো বাস স্ট্যান্ড ছোড় আও' । আব্দুল এক হ্যাঁচকায় পিঠে তুলে নিয়েছে আমার রুকস্যাক। পায়ে গামবুট মাথায় একটা মস্ত টুপি পরে মাথা নাড়তে নাড়তে চলেছে আমাকে এগিয়ে দিতে। ভালো করে ভোর হয় নি। ঠান্ডায় যেন দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে। চারিদিক নিস্তব্ধ। হঠাৎ একটা চেনা সুর কানে এল। আরে! এত সেই অখন্ড ধুণ। কে গাইছে এই জনহীন পাহাড়ে! খেয়াল করে শুনলাম রুকস্যাক কাঁধে নিয়ে পাহাড়ি এবড়ো খেবড়ো রাস্তায় চলতে চলতে আব্দুল গুন গুন করে গাইছে - ভজ মন নারায়ণ নারায়ণ নারায়ণ। আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। হে বদ্রীবিশাল এই না হলে তোমার মহিমা! মহারাজের প্রতি শ্রদ্ধায় মনটা ভরে উঠল। শুধু আক্ষেপ রয়ে গেল, আমার এই প্রাপ্তি মহারাজের সাথে ভাগ করে নিতে পারলাম না ।

                    জয় বদ্রীবিশাল

11 comments:

  1. অসাধারণ!! 🙏🙏🙏

    ReplyDelete
  2. অপূর্ব 🙏🙏🙏

    মহুয়া

    ReplyDelete
  3. শেষে চমক দিয়ে গেল। বেশ লেখা

    ReplyDelete
  4. প্রতিদিনের মন্দৃত শব্দ কোথায় যে আবদ্ধ হয়ে যায়

    ReplyDelete
  5. Sotti i opurbo dhun ki gun... osadharon songeet moner ojantei moner opor gobhir chhap fele jay...����
    Suman

    ReplyDelete
  6. সুরের মূর্ছনা...ভারী সুন্দর

    ReplyDelete
  7. পম্পা চক্রবর্তী12 April 2021 at 09:14

    পরমাত্মার সুরের বাঁধনে এই নিষ্পাপ শিশুদের মনকে বাঁধতে পেরেছেন মহারাজ। ধুণ কি গুণ এভাবেই কি সুন্দরভাবে প্রতিভাত হয়েছে! অসাধারণ একটি লেখা পেলাম অনেক দিন পর। মন ভালো হয়ে গেল।

    ReplyDelete
  8. Om bhur bhuva swaha....Eita jokhon oirokom okhondo dhun er moto cholte thake tokhon prothome bhalo lagey tarpor ek gheye porey abar nijei gun gun kora...amar experience.....bachagulor bhitore surta dhuke geche...Se abdul hok ba jei hok
    Moumita

    ReplyDelete
  9. নারায়ন,নারায়ন৷ জয় গোবিন্দ হরে,
    নারায়ন নারায়ন জয় গোপাল হরে.…...

    ReplyDelete
  10. ধুনের কি গুণ জানি না.....আকাশবাতাস দিকদিগন্ত প্লাবিত করে মানব থেকে মানবন্তরে তার অসীম অনন্ত প্রতিধ্বনি......যেন নিতান্ত সমতল থেকেও শোনা যায়

    ReplyDelete