Friday, 30 April 2021

শিব ঠাকুরের বিয়ে

                           সংশয়, হতাশা আতঙ্ক সমস্ত কিছুর সাথে আরো একটা নতুন বছর কালের নিয়মে চলে এল। সারা পৃথিবীর সমস্ত জাতি ধর্ম নির্বিশেষে নববর্ষের একটা অন্যরকম গুরুত্ব আছে। প্রত্যেক ধর্মের নিজস্ব ক্যালেন্ডার, বর্ষবরণের আলাদা আলাদা রীতি, আচার অনুষ্ঠান। কিন্তু পৃথিবী জুড়ে সব আনন্দ অনুষ্ঠান আজ যেন কেমন থমকে গেছে। প্রকৃতি তার নিজের ছন্দে চলছে ঠিকই কিন্তু কোথাও যেন সেই ছন্দও ভারসাম্যহীন। প্রকৃতির কঠিন অভিঘাত থেকে বুক দিয়ে আমাদের আগলে রেখেছে যে হিমালয়, তিনিও যেন আজ বার্তা পাঠাচ্ছেন - আমাকে একটু একা থাকতে দাও। 

                       সমস্ত কিছু তে আগল দিয়ে রাখলেও আগল দেওয়া যায়না মায়ের মনে। নববর্ষের দুদিন আগেই নীল ষষ্ঠীর ব্রত। সন্তানের মঙ্গলকামনায় মহাদেবের প্রতি অর্ঘ্য নিবেদন করেন মা। বাইরে বেরোতে না পারায়  মা এবার বাধ্য হয়ে ঘরেই নীলের বাতি জ্বালালেন। আসলে এই দিনটি হর-পার্বতীর বিবাহের দিন। স্বর্গীয় এই বিবাহকে ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টির প্রধান মঞ্চ হিসাবে দেখা হয়। তাই এই দিনে শিবের আরাধনা, ব্রহ্মান্ডের গতি বয়ে নিয়ে যাওয়া সন্তানদের সম্যক মঙ্গল সাধন করে। সন্ধ্যা নামতেই মা শিবের ঘরে বাতি জ্বালালেন। বাতির শিখার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলাম। মনটা চলে গেল কয়েকবছর আগে দেখে আসা শিবঠাকুরের বিয়ের সেই জায়গাটা তে । যে ক্ষেত্রের নাম ত্রিযুগীনারায়ণ।

                             সেবার উখীমঠে দুদিনের বিশ্রাম। আশ্রমে বসে থাকতে মন চায় না। বেরিয়ে পড়লাম আশপাশের কিছু জায়গা দেখতে। উখীমঠ থেকে কালীমঠ হয়ে পৌঁছলাম ত্রিযুগীনারায়ণ। শুনেছিলাম এই ক্ষেত্রে নাকি হর-পার্বতীর বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু তার সাথে নারায়ণের সম্পর্কটা যে ঠিক কি তা জানা ছিল না। ত্রিযুগীনারায়ণের এই মন্দিরের নামেই পার্শ্ববর্তী গ্রামের নাম ত্রিযুগীনারায়ণ। পাহাড়ি ছোট্ট গ্রাম। মন্দিরের চারপাশে ধাপে ধাপে রয়েছে গ্রামবাসীদের চাষের জমি। তার মাঝখানে  অবিকল কেদারনাথের মন্দিরের আদলে তৈরী ত্রিযুগীনারায়ণ মন্দির। 

 


  ত্রিযুগীনারায়ণ মন্দির

                              মন্দিরের গর্ভগৃহে ঢোকার আগেই দোচালার নীচে রয়েছে প্রকান্ড এক যজ্ঞকুন্ড। এই যজ্ঞকুন্ডই হর-পার্বতীর বিয়ের যজ্ঞস্থল বলে চিহ্নিত। এই যজ্ঞকুন্ডের জ্যোতি অখন্ড। যে ভক্ত এই মন্দিরে প্রবেশ করেন, তিনি এই কুন্ডে কাঠ জুগিয়ে আসেন, যার জন্য এই আগুন কখনও নিভে যায় না। মন্দিরে প্রবেশের আগেই দর্শণ হয় ব্রহ্মশিলার। এই ব্রহ্মশিলাই নাকি হর-পার্বতীর বিবাহ স্থল। মন্দিরের গর্ভগৃহে রয়েছে রুপোর বিষ্ণুমূর্তি। মন্দিরের পূজারীজি মন্দিরের আখ্যান বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন এই অখন্ড জ্যোতি হর-পার্বতীর অখন্ড দাম্পত্যের প্রতীক। আর বিগত তিন যুগ ধরে এই অখন্ড দাম্পত্যের সাক্ষী হিসাবে রয়েছেন নারায়ণ। ত্রি যুগ ব্যাপী অধিষ্ঠানের জন্য তিনি ত্রিযুগীনারায়ণ হিসাবে পূজিত হন। সৃষ্টি আর স্থিতির আবহমান মেলবন্ধনের সাক্ষী এই মন্দির। সন্তানের মঙ্গল কামনায় মায়ের জ্বালানো নীলের বাতির মত অবিনশ্বর। 

                           মনের মধ্যে ঝড় তুলেছে হিমালয়ের একা থাকার আর্তি। পৃথিবীতে আজ অস্তিত্বের সংকট। হে ত্রিযুগীনারায়ণ, হিমালয়ে আজ ভক্তের প্রবেশ  অবারিত নয়। তবু এই অখন্ড জ্যোতি যেন ইন্ধনের অভাবে নিভে না যায়। হাজার হাজার মায়ের জ্বালানো নীলের বাতি যেন নিভে না যায় অতিমারীর দমকা হাওয়ায়।  সৃষ্টির প্রতীক হয়ে জ্বলে থাকা এই অখন্ড আগুন ছড়িয়ে পড়ুক শতকোটি ভক্তের বুকে। প্রজ্জ্বলিত হোক জীবনজ্যোতি। হে রজতগিরি তুমি না হয় কিছুদিন সাধনায় মগ্ন থাকো - একা।  কিন্তু দেখো তোমার কোলে খুঁজে পাওয়া দুদন্ড শান্তির আশ্রয় যেন চিরতরে হারিয়ে না ফেলি।

                             

12 comments:

  1. এই আর্তি প্রত্যেক ঘরে ঘরে।

    ReplyDelete
  2. Ektu Shanti pelam jeno....aro likhun..pls..

    ReplyDelete
  3. Ki sundor monon, likhon er matra, asadharan.

    ReplyDelete
  4. Jibonjyoti jeno kono ghore okale na nebhe...ei prarthona Mahadev er chorone... osadharon bornona...������

    Suman

    ReplyDelete
  5. "Koto ojana nare janaile tumi", shabolil bhashaye Pouranik tothyobohul chtto lekhati pore boroi Bhalo laglo. Bretanto guli Porte Porte mone hoy nijei ojante shei sthane pouche gechi, emonii shukhopathyo lekhaguli.

    ReplyDelete
  6. "Koto ojana nare janaile tumi", shabolil bhashaye Pouranik tothyobohul chtto lekhati pore boroi Bhalo laglo. Bretanto guli Porte Porte mone hoy nijei ojante shei sthane pouche gechi, emonii shukhopathyo lekhaguli.

    ReplyDelete
  7. গত এক বছর ধরে আমরা ভয় পেতে পেতে বড্ড ক্লান্ত হয়ে পরেছি। মঙ্গলময় ঈশ্বর এবার তার মঙ্গল করস্পর্শে শান্তি ফিরিয়ে আনুক ঘরে ঘরে। অখণ্ড প্রদীপশিখা প্রজ্জ্বলিত হোক সবার মনে মনে।

    মহুয়া

    ReplyDelete
  8. পম্পা চক্রবর্তী1 May 2021 at 09:38

    এই অভাবনীয় অসহ্য অবস্থায় ত্রিযুগীনারায়ণ ও বিশ্বেশ্বর-অন্নপূর্ণার কাছে সমগ্র মানবজাতির হয়ে প্রনতি জানাই। সৃষ্টির প্রতীক এই অখন্ড জ্যোতির শিখা যেন শত কঠিন পরিস্থিতিতেও নির্বাপিত না হয়, এই প্রার্থনা করি।
    অজানা কত কথা আমরা জানতে পারছি লেখিকার অনবদ্য কথনের মাধ্যমে - নতুন করে সাধুবাদ না জানিয়ে পরবর্তী লেখার অপেক্ষায় রইলাম।

    ReplyDelete
  9. Title ta khub deceptive...Ekrokom mental make up niye porte suru korlam...Lekha chole gelo onyo rokom... Contemporary pandemic er sathey nil shosti ar oi okhondo jyoti r je ei vabe link hobe vabteo parini.....Khub bhalo technique ei vabe puro thinking process ta ke guide korte para...Choto lekha ..kintu mone daag kete dilo..thumbs up to such a thought process and writing skill ...Maumita

    ReplyDelete
  10. অসাধারণ বর্ণনা। প্রাঞ্জল ভাষা। মনে হচ্ছে এইমাত্র ত্রিযুগীনারায়ণ মন্দির চাক্ষুষ করলাম।

    ReplyDelete
  11. ঈশ্বর যেন সকলকে রক্ষা করেন। 🙏🙏

    ReplyDelete
  12. আমি একবার একা গিয়ে ত্রিযুগী তে তিন দিন ছিলাম।
    এখন কেবল জাবর কাটা।

    ReplyDelete