Friday, 7 May 2021

হাসেন অন্তর্যামী

                   প্রকৃতির নিয়মে বছরের অনেকটা সময় গৃহবন্দী হয়ে অবসর জীবন কাটাতে বাধ্য হন, এমন মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে তো বটেই, ভারতবর্ষেও কিছু কম নয়। এমন কিছু মানুষের সান্নিধ্যে কয়েকদিন কাটাতে গিয়েছিলাম হিমাচল প্রদেশের এক অচেনা প্রান্তে। হিমালয়ের পিরপাঞ্জাল আর জাঁস্কর  শাখার মধ্যবর্তী অঞ্চল পাঙ্গি উপত্যকা নামেই পরিচিত। পাঙ্গি উপত্যকায় প্রধানতঃ হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষের বাস। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ভোট দের আধিক্য থাকায় পাঙ্গি উপত্যকা প্রধানতঃ চারটি ভাটোরী তে বিভক্ত। সেই চারটি ভাটোরির অন্যতম হল সুরাল ভাটোরী। বাঁদিকে পিরপাঞ্জাল আর ডানদিকে জাঁস্কারের মাঝে শান্ত, সবুজ নির্জন জনপদ সুরাল। পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলেছে সুরাল নালা। বছরে চার থেকে পাঁচ মাস জলের স্রোত বয়ে যায় এই উপত্যকায়। বাকি সময় সবকিছু বরফের নীচে, সমস্ত মানুষ গৃহবন্দী।  পাথুরে উপত্যকায় বয়ে চলা সুরাল নালার দুই ধারে উঁচু পাহাড়ের ঢাল। সুরালের উচ্চতা ১০০০০ ফুটের কিছু বেশি। ছোট বড় মিলিয়ে গোটা তিনেক প্রাইমারী এবং ইন্টারস্কুল আছে, যা সুরালের জনসংখ্যার তুলনায় চলনসই। এমনই একটি স্কুলের মাস্টারমশাই পবন সিং নেগি র সাথে আলাপ হল সুরাল গ্রামে। জানতে চাইলাম সুরালের ইতিকথা।

                       সুরাল নালা                  

পাঙ্গি উপত্যকা হিমাচল প্রদেশের প্রান্তিক অংশ এবং জম্মু কাশ্মীর সীমানার সাথে যুক্ত। হিমাচলের বেশ কয়েকটি গিরিবর্ত্ম এই পাঙ্গি উপত্যকা কে বিচ্ছিন্ন করে রাখে বছরের অর্ধেকের বেশি সময়। কিলার  থেকে সাচ পাস (১৪৪৮২ ফুট) পার হয়ে পোঁছতে হয় এই স্বর্গীয় ভুখন্ডে। সাচ পাস থেকে সোজা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গাড়ি যখন নামতে থাকে দুর্বার গতিতে, মনে হয় এ যেন এক অন্যরকম নাগরদোলা। সুরাল, ভারত ভুখন্ডের বহু প্রাচীন জনপদ। কথিত আছে হিমাচলের শাসকবর্গ অপরাধের শাস্তি হিসাবে প্রজাদের এই ভুখন্ডে পাঠিয়ে দিতেন যাতে তারা সহজে আর মূল ভুখন্ডে ফিরতে না পারে। 

                   সে যেভাবেই গড়ে উঠুক, দুটি ভিন্ন ধর্মের মানুষ আবহমান কাল ধরে জীবনধারণ করে চলেছে প্রকৃতির এই ইন্দ্রলোকে। কথা বলতে বলতে পবন নেগি আমাদের নিয়ে এসেছেন একটা উঁচু জায়গায় যেখান থেকে সুরাল নালার সর্পিল গতি দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। পাহাড়ের সমস্ত ঢালে ঘন জঙ্গল। লা্‌ল, হলুদ আর সবুজ রঙে যেন আগুন জ্বলছে। জানতে পারলাম এই বিভিন্ন রঙ আসলে বিভিন্ন বয়সের ভুজ গাছের পাতার। একেবারে কচি পাতা আগুনের মত লাল, মধ্যবয়সী পাতা ঘন সবুজ আর প্রাপ্তবয়স্ক পাতা কাঁচা সোনার মত হলুদ।


                                                                   ভুজ গাছের জঙ্গল

                                ভারতের সনাতন সংস্কৃতিতে ভুজ গাছের ছালের ব্যবহার বহুজনবিদিত। কিন্তু হিমালয়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এই ঐতিহাসিক বৃক্ষের বিপুল সমাহার সম্পর্কে আমার অন্ততঃ কোন ধারণা ছিল না। নেগি সাহেব অতি যত্ন সহকারে আমেদের ঘুরিয়ে দেখাচ্ছেন তাঁর জন্মভূমি। প্রকৃতির সাথে লড়াই করতে করতে লৌহকঠিন ব্যক্তিত্বের অধিকারী প্রত্যেক সুরালবাসী, ঠিক তেমনই তাদের আবেগ। কৌতুহলী আমার মন। প্রশ্ন করে বসি এই সুরাল নালা কোথা থেকে আসছে? নেগি সাহেব বলেন এই নালার উৎস হিমাচল আর জম্মু কাশ্মীরের সীমান্তে অবস্থিত শিবশঙ্কর শৃঙ্গ। এ কেমন শৃঙ্গ? নেগি সাহেব বলেন - "যাও খুদ দেখকে আও ক্যায়সে শঙ্কর ভগবান পাহাড় কী চোটি সে হামে রকসা কর রহে হ্যায়"। ভারী অদ্ভুত তো! নেগি সাহেব আমাদের রাস্তা বাতলে দিলেন, চলতে শুরু করলাম। নেগি সাহেব জয়ধ্বনী দিলেন - জয় শিব শঙ্কর। 

                           সুরাল নালার পাশ দিয়ে পাহাড়ি রাস্তা। অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য। ক্রমশঃ চলতে চলতে অনেক পিছনে ফেলে এসেছি সুরাল গ্রাম। দুধারে অসংখ্য বরফের পাহাড়, পাহাড়ের গা বেয়ে সারি সারি ছোট বড় ঝরনা নেমে এসে মিশে যাচ্ছে সুরাল নালায়। বেশ কয়েক কিলোমিটার হেঁটে ফেলেছি। হঠাৎ দু তিনটে পাহাড়ের মাঝখান থেকে উঁকি মারল আড়াআড়ি ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা আপাদমস্তক বরফে ঢাকা এক শৃঙ্গ। বড় অদ্ভুত তার গড়ন। সামনের দিকটা যেন হাতির শুঁড়ের মত। যত সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি শৃঙ্গের গড়ন বদলে যাচ্ছে। খানিক দুর যাওয়ার পর পুরো প্রশস্ত শৃঙ্গ  দেখতে পেলাম।  যেন প্রকান্ড এক শঙ্খ। যে শঙ্খ বাজানোর ক্ষমতা মহাযোগী মহাদেব ছাড়া আর কারো নেই। কি অদ্ভুত এই শৃঙ্গের রূপ। পরতে পরতে যেন অনুভব করা যায় ত্রিলোকেশ্বরের উপস্থিতি। মনে পড়ে গেল কোন একজনের লেখায় পড়েছিলাম শঙ্খের মত দেখতে বলে এই শৃঙ্গকে পর্বতারোহীরা শিবশঙ্খ শৃঙ্গ নামে চেনেন। কিন্তু সুরাল বাসীর কাছে এই পাহাড়ই শিব শঙ্করের বাসভুমি। বিস্ময়ের আরও কিছু বাকি ছিল।  খানিকটা  এগিয়ে গিয়ে পাহাড়ের চুড়ার দিকে তাকাতেই কানে বেজে উঠল নেগি সাহেবের কথাগুলো। নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছি না। বরফে মোড়া শঙ্খ আকৃতির এই পাহাড়ের মাথায় স্বয়ং শিবশঙ্কর বিরাজমান। তাঁর কৃপাদৃষ্টি সরাসরি সুরাল গ্রামের দিকে। প্রকৃতির এই বিস্ময় নিজে চোখে না দেখলে হয়তো বিশ্বাস করতাম না। ইনিই নেগি সাহেবের শিবশঙ্কর,  যিনি প্রকৃতির উচ্চাসনে বসে অবিরাম রক্ষা করে চলেছেন তাঁর সৃষ্টির প্রতিটি অনুকণা। সকলের নাগালের বাইরে সমস্ত পার্থিব মায়াজাল এড়িয়ে অবিচল, ধ্যানমগ্ন জগদীশ্বর। সৃষ্টির সমস্ত কলহ, বিবাদ, অভিমান, অহংকার সমস্ত কিছুকে যেন প্রাণভরে উপভোগ করছেন সচ্চিদানন্দ।


                                                    

                                                        বরফ ঢাকা শৃঙ্গের চুড়ায় শিবশঙ্কর

                       অদ্ভুতদর্শন এই শৃঙ্গের চুড়ায় আসীন  রজতগিরিনিভম কে দেখে মনে হল, এই পরম ঐশ্বর্য্য অবহেলা করি আমরা।  পার্থিব চাওয়া পাওয়া নিয়ে গড়ে তুলি আত্মপ্রত্যয়ের অসাড় গর্ভগৃহ। সে গর্ভগৃহ ঊজ্জ্বল করে তুলি অহংকারের রোশনাই দিয়ে, সাজিয়ে তুলতে জ্বালাই উচ্চাশার হাজারবাতি।  প্রাপ্তির সেই অন্তঃসারশূণ্য আস্ফালন দেখে অবশ্যই তাঁর করুণা হয়,  হাসেন অন্তর্যামী।

6 comments:

  1. Shivashambhu tar sristi k rokkha karun ei prarthona...noisorgik soundorjer osadharon bornona...🙏🙏🙏

    Suman

    ReplyDelete
  2. Sarir er lomkupgulo khule giye ek advut anubhuti hochche ja vyakto kora sambhab noy. 👍

    ReplyDelete
  3. সৃষ্টি কর্তা বিভিন্ন রূপ যখন প্রকৃতির সাথে অঙ্গাঙ্গিক ভাবে মিশে প্রতিফলিত ও পরিলক্ষিত হয়, তখন মানসিক ভাবে অন্য এক আনন্দ উপলব্ধ হয়

    ReplyDelete
  4. পম্পা চক্রবর্তী8 May 2021 at 09:51

    শিবশঙ্কর শৃঙ্গের এই আশ্চর্য রূপ বর্ণনা পড়ে মনে হলো, সৃষ্টির রক্ষাকর্তা পরম শক্তিমান দেবাদিদেবের কথা দৈনন্দিনতার মাঝে আমরা সর্বদা ভুলেই থাকি।
    আজকের পৃথিবীর এই চরম বিপদের মধ্যে তাঁকে স্মরণ করি, মার্জনা চাই আমাদের অসার অর্থহীন ঔদ্ধত্যের জন্য। প্রকৃতির উচ্চাসনে আসীন ধ্যানমগ্ন অন্তর্যামী জগদীশ্বরের কাছে কিছুই যে অজানা নেই।

    ReplyDelete
  5. Jay shiva Shambhu🙏🙏🙏

    ReplyDelete
  6. পড়ে মন খারাপ হয়ে যায়। আর কি কখনো কবে,এমন ভ্রমন হবে?

    ReplyDelete