Sunday, 23 May 2021

ভারতের নীলকন্ঠ

              ভারতীয় সনাতন সংস্কৃতিতে নীল রঙ কে নানা ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নীল কখনো পরাক্রমের প্রতীক, কখনো বা সাহসিকতার,  কখনো পৌরুষের। হিন্দু দেবদেবীরা  যারা  উক্ত গুণের অধিকারী, তাদের গায়ের রঙ নীল। তা সে শিব ই হোন বা বিষ্ণু। নীল রঙের ঔজ্জল্যই তার আকর্ষণ। ভারতীয় সংস্কৃতিতে নীল রঙের ব্যবহারেও প্রচুর বৈচিত্র আছে। যেমন রাজস্থানের বিশনয় সম্প্রদায়ের মানুষ নীল রঙের বস্ত্র গায়ে দেন না। এই সম্প্রদায়ের মানুষ প্রকৃতিকে ঈশ্বর রূপে আরাধনা করে। নীল রঙ যেহেতু বিশেষ এক ধরণের গাছ থেকে একসময় তৈরী হত, তাই এই রঙ তৈরী করতে গিয়ে এই নীল গাছ গুলিকে ধ্বংস করা হত। প্রকৃতির এই অপূরণীয় ক্ষতি যাতে না হয়, তাই এই সম্প্রদায়ের মানুষ নীল বস্ত্র বর্জন করেন। বড় বিচিত্র নীলের বিষয়। 

                 নীল কখনো আবার সৌভাগ্যের প্রতীক। বিজয়া দশমীর দিন কোনো ভাবে কেউ যদি নীলকন্ঠ পাখির দেখা পান তাহলে তা পরম সৌভাগ্যের প্রতীক বলে মনে করা হয়। রামায়ণের বর্ণনা অনুযায়ী রাম যেদিন রাবণ বধের উদ্দেশ্যে রওনা হন, সেদিন তিনি নীলকন্ঠ পাখির দেখা পান, আর সেদিন ছিল বিজয়া দশমী। শিবপুরাণে আবার নীলকন্ঠ পাখিকে শিবালয়ের দূত হিসাবে বর্ণনা করা হয়। বিজয়া দশমীর শেষে মা যখন তাঁর সন্তানদের নিয়ে কৈলাসের  উদ্দেশ্যে রওনা হন, সেই খবর কৈলাসপতির কাছে পৌঁছে দেয় এই নীলকন্ঠ পাখি।

                                                               নীলকন্ঠ পাখি (Indian Roller)

                নীল যে শুধুই শুভ বা শুদ্ধতার প্রতীক তা কিন্তু নয়। নীল রঙ বর্জন করার অন্যতম কারণ হিসাবে  মনে করা হয়, নীল হল বিষের রঙ। সমুদ্র মন্থনের সময় এই বিষ পান করে ছিলেন মহাদেব এবং এই বিষের রঙেই তিনি নীলকন্ঠ। যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন নীল রঙের বোধহয় নিজস্ব সহনশীলতা আছে, যা তাকে দেয় অনন্ত বিস্তার, বিপুল গভীরতা। 

                  হিমালয়ের আনাচে কানাচে এমন নীলের দেখা মেলে বহু জায়গায়। এমনই এক নীলের সন্ধানে গিয়েছিলাম ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্য লাদাখ এ। লাদাখ কে বর্ণনা করতে গেলে খুব সহজে পরস্পর বিপরীত দুটি শব্দ বলা যায় - রুক্ষ আর মনোরম। সবুজের অনুপস্থিতিতে মাইলের পর মাইল রুক্ষ পাহাড় কিভাবে প্রাকৃতিক শিল্পকলার সম্ভার সাজিয়ে বসে আছে, তা দেখতেই লাদাখ এ আসা। লাদাখ এর প্রধান শহর লে থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়া যায়। তবে লাদাখ রাজ্যের সিংহ ভাগ যেহেতু সেনাদের দখলে, তাই সাধারণ মানুষের যাওয়ার অনুমতি মেলে খুব অল্প কয়েকটি জায়গায়। লেহ থেকে বেরিয়ে পৃথিবীর সর্বোচ্চ যান চলাচলের উপযুক্ত গিরিখাত, খার-দুং-লা পার হয়ে আমাদের গাড়ি ছুটে চলল সেই নীল গন্তব্যে। পথে যেতে যেতে যে নৈসর্গিক দৃশ্য চাক্ষুষ করলাম তা বর্ণনা করার মত ভাষা আমার ভান্ডারে নেই। রুক্ষ পাহাড়, তার গায়ে তীব্র হাওয়ার ধাক্কায় তৈরী হওয়া বিভিন্ন রকম আকার। কোনটা দুর্গের মত, কোনটা বা সেনাদলের সারি, কোনটা যেন রথের মত, কোনটা আবার আস্ত রাজপ্রাসাদ। কোনও কোনও পাহাড়ের গোড়া থেকে মাথা অবধি রক্তবর্ণ গ্রানাইটের দেওয়াল, কোনওটায় সবুজ, কোনওটায় আবার দুধ সাদা। আমাদের গন্তব্যের কাছাকাছি এসে পড়েছি বলে যখন জানতে পারলাম, তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে বটে কিন্তু এই উচ্চতায় এ সময়ে যথেষ্ট দিনের আলো। পাহাড়ের একটা বাঁক ঘুরতেই আচমকা দেখা দিল ঘন নীল জলরাশি। যেন প্রচুর পরিমাণ নীল রঙ জলে গুলে রেখে দেওয়া হয়েছে। হারিয়ে গেল এক নিমেষে। এই হারিয়ে খোঁজাই হিমালয়ের সবথেকে বড় আকর্ষণ। কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা পৌঁঁছে গেলাম আমাদের নীল গন্তব্যে, ৪৩৫০ মিটার উচ্চতায়, হিমালয়ের কোলে আন্তর্জাতিক সীমাকে গিলে ফেলা বিপুল এক জলের ভান্ডার।  এ ভান্ডারের মাত্র ৪০ শতাংশ ভারতবর্ষের দখলে, বাকি ৬০ শতাংশ চীন তথা চীন অধিকৃত তিব্বতের। 

                    এ জলরাশির রঙ বিভিন্ন সময়ে বদল হয়। ঘন নীল থেকে আকাশী, আকাশী থেকে সবুজ, সবুজ থেকে লালচে গোলাপী। প্রকৃতির নিত্য হোলিখেলা। প্রবল হাওয়ায় জলে ওঠে ছোট্ট ছোট্ট ঢেউ যার নীচে কাঁচের মত পাথরগুলো খুব আস্তে আস্তে গড়িয়ে যেতে থাকে শামুকের মত। এ হ্রদ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণার পর কিছু আশ্চর্য্য তথ্য পাওয়া যায়। এই হ্রদের জল সম্পূর্ণ আবদ্ধ, অন্য কোন জলের স্রোতের সাথে এর কোন সম্পর্ক না থাকায় এই জল মাত্রাতিরিক্ত নোনা। এই হ্রদের জলে প্রচুর খনিজ পদার্থ থাকায় জলের রঙ ঘন নীল। নোনা  হলেও এই হ্রদের জল শীতকালে সম্পুর্ণ বরফ হয়ে যায়। মাত্র কয়েকপ্রকার কবচী জীব ছাড়া এই হ্রদের জলে কোন জীব বাঁচতে পারে না। অর্থাৎ এই হ্রদের নান্দনিক উৎকর্ষ যাই হোক না কেন ব্যবহারিক উৎকর্ষ বিশেষ উল্লেখযোগ্য নয়। যতক্ষণ আলোর শেষ রেখা টুকু পড়তে লাগল চেটেপুটে উপভোগ করলাম এর রংবাহার। 

                       আমরা ঘুরে আসার কিছুদিন পর থেকেই শুরু হয়ে গেল এই সীমান্ত প্রদেশে ভারত-চীন দুই দেশের অধিকার রক্ষার লড়াই। খবরের কাগজে পড়তে লাগলাম সে চেনা জায়গার নাম -  চুশুল। এই বিপুল জলরাশি কে মাঝখানে রেখে দীর্ঘ কয়েকমাস চলতে লাগল প্রাণঘাতী সংঘর্ষ। এখনো 'হয় নাই শেষ'। এ যেন আর এক দফা সমুদ্র মন্থন। প্রকৃতির এমন অমূল্য সম্পদ তাকে কি খড়ির গন্ডি তে বাঁধা যায়! এই বিপুল জলরাশির মধ্যে দাগ কেটে কি আমার তোমার ভাগ করা সম্ভব! কিছুতেই নয়। আর এই অসম্ভব কে সম্ভব করার জন্য দু'দেশের মানুষের দুর্বার প্রচেষ্টা বছরের পর বছর ধরে বাতাসে ছড়ায় বিষ। সেই বিষ নিরন্তর পান করে চলে ব্রহ্মান্ডের এই ক্ষুদ্র অংশ। এই বোধহয় সত্যিকারের হলাহল পান।  নিজের সৃষ্টির একটুকরো অংশের মধ্যে এভাবেই বোধহয় নিজেকে প্রকাশ করেন দেবাদিদেব। প্রকৃতির এই নীল সম্পদ - প্যাঙ্গং সো হয়ে ওঠে ভারতের নীলকন্ঠ।

                

প্যাংগং সো  - এ রঙের বাহার

10 comments:

  1. পম্পা চক্রবর্তী24 May 2021 at 00:38

    প্রাকৃতিক সৃষ্টি র ওপর জোর করে রাজনৈতিক সীমা টেনে বিবদমান দুই জাতির‌ হানাহানির বিষে‌ জর্জরিত এই জায়গার র বর্ণনা‌ দেওয়া যায় কবি প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতায় একটু পরিবর্তন করে.....
    ‌"নীল শুধু নীল
    সবুজের ছোঁয়া কিনা তা বুঝি না
    ফিকে গাঢ় হরেক রকম
    কমবেশি নীল
    তাই নিয়ে শূণ্যের আনমনা হাসির সামিল
    প্যাঙ্গন সো।"
    অসাধারণ উপলব্ধিকে নিয়ে অপূর্ব লেখা।‌ পড়ে ই পাঠকমনে‌‌ মানস ভ্রমনের আনন্দময় অনুভুতির ছোঁয়া লাগে।

    ReplyDelete
  2. Nilkontho jeno manusher kormokando theke nirgoto gorol pan kore sristi r modhye ta prokash korechhen. Rupak er madhyome osadharon bornona.🙏🙏🙏
    Suman

    ReplyDelete
  3. Shrishti, sthiti, binash shob-r moddhei royeche neel-r sparsho.... neel akasher nichey neel hrod-r jol-ke biswa sansar-a ekmatro manush-e bodhoy paarey ei bhabey bhaag kortey....shob binash-r mulei royeche manusher sharthoporota...

    Mohua

    ReplyDelete
  4. পুরাণ আর প্রকৃতি একেবারে দারুনভাবে মিশেগেছে এই লেখায়। আর ছবিগুলি দেখে সত্যিই প্রান ভরে গেল। মনে হচ্ছে কেড যেন অসীম ধৈর্য্য নিয়ে এঁকেছে।

    ReplyDelete
  5. Asadharon Barnana...hariye gelam nil digonte🙏🙏

    ReplyDelete
  6. Ki sundor jaiga..Ar reality , myth shob miley mishey ekta full circle jeno lekha tar modhye ese gelo....koto jaigai jaini ar jete parbo o kina ke janey...Maumita

    ReplyDelete
  7. Darun laglo pore. Nil ronger je ato tatporjo seta amar ebhabe Jana chilo na. Indo China juddor majhe poree prakriti te koto kosto pache,ta upolobdhi korlam. Chobigulo osombhob sundoor. Khub bhalo laglo apnar ei lekhata.

    ReplyDelete