আজ বুদ্ধপূর্ণিমা। ভগবান বুদ্ধের পুণ্য আবির্ভাব তিথিতে আজ আকাশের মুখ ভার। দেখা নেই পূর্ণিমার চাঁদের। এমনই এক চাঁদহীন পূর্ণিমা ছিল সেদিন। কোজাগরী পূর্ণিমা। রাতটা কেটেছিল হিমাচল প্রদেশের লাহুল স্পিতি জেলার এক বিখ্যাত জনপদ, উদয়পুরে (উদেপুর নামেও পরিচিত)। প্রকৃতি যেমন হিমালয়ের অনন্য সম্পদ, ঠিক তেমনই হিমালয়ের পথে পথে এমন কিছু সম্পদের দেখা মেল্ যা ভারতের সভ্যতা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় সহনশীলতার সুদৃঢ় বুনিয়াদের নিদর্শন। প্রত্যন্ত সীমান্ত পাঙ্গি উপত্যকা থেকে ফেরার পথে উদয়পুর পৌঁছতে প্রায় অন্ধকার হয়ে গেল। হিমালয়ের কোলে কোজাগরী পূর্ণিমার রাত কাটানো যে কোন হিমালয়প্রেমীর কাছে অত্যন্ত লোভনীয়। আমরাও সেই স্বপ্নেই বিভোর ছিলাম। কিন্তু বিধি বাম। উদয়পুর পৌঁছনোর কিছু আগে পথেই নামল তুমুল বৃষ্টি। উদয়পুর থেকে কেলং যাওয়ার পথে ৯ কিলোমিটার যাওয়ার পর রাস্তা বেঁকে গেল পাহাড়ের একদম শেষ প্রান্তে। বৃষ্টি ভেজা এই রাস্তাটুকু আসতে অনেক সময় লেগে গেল। সেই সঙ্গে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা আর রক্ত জমিয়ে দেওয়া হাওয়া।
গাড়ি থেকে নেমে অল্প কিছুটা রাস্তা হেঁটে পাহাড়টার একদম শেষ প্রান্তে পৌঁঁছে গেলাম। খাড়া পাহাড়ের নীচে বয়ে চলেছে চন্দ্রভাগা। বৃষ্টির জন্য সব ধোঁয়া মনে হচ্ছে। একদম শেষ মাথায় দেখতে পাওয়া যাচ্ছে দুধ সাদা মন্দিরের চুড়া - ত্রিলোকীনাথ। এই মন্দির ভারতবর্ষের ধর্মীয় সহনশীলতার ইতিহাস বহন করে। আসল মন্দিরটির অস্তিত্ব বিলুপ্ত। কেউ বলেন এ মন্দির পান্ডবদের বানানো আবার কেউ বা বলেন কুলুর রাজপরিবার এই মন্দির নির্মাণ করেছেন। তা সে যেই নির্মাণ করুক না কেন এ মন্দিরের আকর্ষণ এর ধর্মীয় গ্রহণ যোগ্যতায়। বৌদ্ধ ধর্মের সাথে হিন্দু ধর্মের চিন্তা ভাবনায় মৌলিক বিভেদ থাকলেও তা যে কখনো সামাজিক গঠনে ভাঙ্গন ধরায়নি, এই মন্দির তার অন্যতম উদাহরণ। কথিত আছে এই মন্দিরের জায়গায় একসময় বৌদ্ধ বিহার ছিল। পরবর্তী সময়ে হিন্দু ধর্মের মানুষ এখানে শিব পূজা শুরু করেন । অন্য একটি মত অনুসারে ত্রিলোকীনাথ আদতে শিব মন্দির যেখানে বৌদ্ধ গুরু পদ্মসম্ভব অষ্টম শতাব্দী তে ভগবান বুদ্ধের আরাধনা শুরু করেন। ইতিহাস যাই বলুক না কেন এখানে হিন্দু ও বৌদ্ধ উভয় ধর্মের মানুষ আসেন। বিগ্রহকে যে জ্ঞানে পূজা করতে তিনি ইচ্ছুক, সেই জ্ঞানেই পূজা করার স্বাধীনতা সমস্ত ভক্তের আছে।
মন্দিরের প্রবেশ পথ বেশ সংকীর্ণ। চাতালে দাঁড়ালে মনে হয় কোন একটি বাড়ির উঠোনে গৃহদেবতার মন্দির। এটি ভারতবর্ষের একমাত্র মন্দির যে মন্দিরের বিগ্রহ বৌদ্ধ লামা এবং হিন্দু পুরোহিত একসাথে পূজো করেন। মন্দিরের চাতালে শিবের বাহন নন্দী র জন্য একটি ছোট্ট একটি চালা করা আছে। পাশে একটি ঘরে রাখা আছে বৌদ্ধ দের Prayer wheel।
ত্রিলোকীনাথ মন্দির মন্দিরের বিগ্রহ বড় বিচিত্র। বিগ্রহটির ছয় হাত, যা ভগবান বুদ্ধের অবলোকিতেশ্বর রূপ। বিগ্রহের মাথায় শিবের জটা। হাতে জপমালা। শিবের গলায় উপবীত, কোমরে পেঁচানো সাপ। বুদ্ধের গলায়, কানে, বাহুতে রাজকীয় অলঙ্কার। ধ্যানমগ্ন মহাযোগী মুদ্রায় শিব আর পদ্মপাণি অবলোকিতেশ্বরের সহাবস্থান। শিবের জটার চুড়ায় রয়েছেন অমিতাভ বুদ্ধ - যিনি সীমাহীন আলোর প্রতীক। মন্দির প্রাঙ্গনে ভক্তের দল নিজেদের আরাধ্য দেবতার প্রতি প্রণাম জানান। কেউ বলেন 'ওম মণি পদ্মে ওম', কেউ বলেন 'ওম নমঃ শিবায়ঃ'। কিন্তু কারো প্রণাম অন্যের প্রণাম কে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে না। এমনই এ মন্দিরের শৃঙ্খলা। বৌদ্ধ লামাই হোন বা হিন্দু পুরোহিত, ভক্তের বিশ্বাসে কোনওরকম প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করেন না।

হৃদয় বিমল হোক,
ReplyDeleteপ্রাণ সবল হোক,
বিঘ্ন দাও অপসারি।
মহুআ 🙏
বৌদ্ধ ধর্ম যে হিন্দু সমাজে ভাঙন ধরে নি তার প্রতিফলন আমরা বর্তমান সমাজ এ ও দেখি। বুদ্ধের বানীর সার্থক প্রতীক এই মন্দির
ReplyDeleteDhormiyo sahanshilta bharater sanskriti r ek ujjal dik...ei mandir jeno tar i protik...🙏🙏🙏
ReplyDeleteSuman
যুগ যুগান্ত ধরে চলে আসা দুই ধর্মের এই সহনশীলতা ঐতিহ্যগতভাবে ভারতবর্ষের মানুষের অমূল্য উত্তরাধিকার।
ReplyDeleteনমস্কার জানাই পদ্মপিনাকপাণি ত্রিলোকীনাথকে।
খুব ভাল হয়েছে লেখা,মনে রেখ আমিও ছিলাম.....
ReplyDeleteতা কি করে ভুলব!
DeleteEmon lekha mon ke shanto kore ei oshanto samay. Osadharon.
ReplyDeleteShampa
পদ্মপিনাকপাণি ত্রিলোকীনাথ এর বিগ্রহ দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলাম। ধর্ম সহনশীল হলে যে কত সুন্দর ভাবে ঈশ্বরের উপাসনা করা যায়, এই মন্দির তার প্রমান। খুব ভাল লাগল লেখা টা। আর একটা কথা না বলে পারছি না - দুর্গম পাহাড়ি পথে বৃষ্টি কি আপনার চিরসঙ্গী ?
ReplyDeleteহিমালয়ের পথে আবহাওয়ার নিরাপত্তা নেই। চিরসঙ্গী না হলেও সফর সঙ্গী তো বটেই
DeleteApurba Trilokeenath Bigroho...shato koti pranam janai🙏🙏🙏
ReplyDeleteEkei bole boichitrer modhye oikyo.Madam, apnar jhulite ar na jani ki ache... .
ReplyDelete"ভারতবর্ষের ধর্মীয় সহনশীলতার" এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। হিমালয়ের এসব অজানা ঠিকানার খরব জেনে খুব ভালো লাগলো। খুব সুন্দর বর্ণনা।
ReplyDeleteEi religious tolerance ki paharei shombhob? Somotoley keno pai na!!
ReplyDeleteTrilokinath er bigroho ki shanto ki opurbo...Buddhist influence
khub easily bojha jai..Apni koto unique shob jaigai gechen!!👌