লকডাউনের জ্বালায় সকালের রুটিন টা বদলে গেছে। কতদিন দেখা হয় না সেই মানুষগুলোর সাথে যাদের কাছে রোজ ফুল কিনতাম, টুকটাক একটু আনাজপাতি। সবাই এখন যে যার ঘরে বন্দী। কি জানি কতদিন পরে আবার সকালের সেই সময় টা ফিরে আসবে আগের মত করে! যাই হোক এখন পরিস্থিতির ফেরে সব লোকজন বদলাতে হয়েছে। নতুন ফুলের দিদি, নতুন সব্জীর দোকান, আরো কত কি নতুন। বেশ কিছুদিন তো ফুলের কোন দেখা মিলছিল না। কয়েকদিন হল একজন ফুল নিয়ে বসছেন বাড়ির কাছেই। তার পাশেই তার স্বামী ভ্যানে করে সব্জী বিক্রি করেন তাই এক ঢিলে দুই পাখি বধ হয়ে যায় আর কি।দুজনে বেশ তালমিল করে বেচাকেনা করে। আর ভ্যান টার উপর একটা মোবাইল রাখা আছে যেটাতে সারাক্ষণ বিভিন্ন রকমের ভজন চলতে থাকে। ভারী অদ্ভুত লাগে দু'জন কে দেখলে। উল্টো দিকে যে ছেলেটা আগে ইস্ত্রী করত সে এখন ফলের দোকান খুলেছে। খরিদ্দার না থাকলে সেও যোগ দেয় ভজন গানের আসরে। এত উদ্বেগ, আশঙ্কা, অনটন সবকিছুর মধ্যেও কেমন সুন্দর একটা পরিবেশে রয়েছে এরা সবাই। মালা গাঁথতে গাঁথতে গানের সুরে মাথা দোলায় ফুলের দিদি, কখনো আবার গুণগুণ করে সুর ও ভাঁজে। দেখে বেশ ভালো লাগে।
একদিন ফুল নিতে গিয়ে দেখলাম বেলপাতা গুলো পরিস্কার নেই। কথা প্রসঙ্গে বললাম বেলপাতা গুলো ধুয়ে নিতে হবে। দিদি বলল হ্যা দিদি বেলপাতা ধুয়ে নিও, কিন্তু ফুল যেন ধুয়ো না। নিজের তথাকথিত জ্ঞানী মনটা বলল এ আবার কি অদ্ভুত কথা, ফুল ধোব কেন!। পরমুহুর্তে ফুলের দিদি যে কথা টা বলল তাতে আমি আর মাথা টা সোজা রাখতে পারলাম না। ওনার প্রতি শ্রদ্ধায়, সম্ভ্রমে আমার মাথা নীচু হয়ে গেল। বলল একটি ভজনের লাইন-
দুনিয়া উসকোঁ ভক্ত না মানে যো নিশদিন না রোয়ে
দেওতা উসকোঁ ফুল না মানে জিসে ভঁমর না ছোয়ে
ফেরার পথে বারবার আওড়াতে লাগলাম লাইন দুটো। কি গভীরতা। দুটি ছোট্ট লাইনের মধ্যে দিয়ে কত বড় মাপের বিষয় কে তুলে ধরা যায়। আমরা ঢাকঢোল পিটিয়ে, হইচই করে, আড়ম্বরের সঙ্গে পূজো বলে যা করি তাতে ভক্তির জায়গা কতটুকু? নিষ্ঠাহীন, আবেগহীন, লোকদেখানো কতগুলো আচার তাতে আর যাই থাকুক দেবতার সাথে কোন আত্মিক যোগ নেই। আমরা পূজোর নামে রাশি রাশি টাকা খরচ করি, পূণ্যার্জনের নেশায় কাঙালী ভোজন করাই, অন্ন দান, বস্ত্র দান কত কিছুই করি- শুধু কত কিছু করলাম এই প্রচারের লোভে। কিন্তু আরাধ্য দেবতার চরণে দু'ফোঁটা চোখের জল ফেলার মত ভক্তি বা আবেগ কোনওটাই আমাদের মধ্যে থাকে না। আর তাই আমরা আর যাই হই ভক্ত হতে পারি না।
উখীমঠের মন্দিরের সাধুদের গণনা আর পঞ্চাঙ্গ দিনপঞ্জীর হিসাব অনুযায়ী গতকাল কেদারনাথ মন্দিরের কপাটবিধি পালন হল অর্থাৎ কেদারনাথ মন্দিরের দরজা ভক্তদের জন্য খুলে গেল। লকডাউনের জন্য অনাড়ম্বর। কেদারনাথের এই ডোলিযাত্রা উত্তরাখন্ডের মানুষের কাছে যথেষ্ট মাহাত্ম্যপূর্ণ। অন্যান্যবার বহু মানুষ যোগ দেন এই ডোলিযাত্রায়, আর বেশ কয়েক ফুট বরফ ভেঙ্গে বাবা মহাদেব কে পৌঁছে দেওয়া হয় তাঁর দেবালয়ে। খবরে পড়লাম কেদারনাথের মন্দির সাজানোর জন্য ১০ ক্যুইন্টাল ফুল নিয়ে যাওয়া হয়েছে। খবরে এও প্রকাশ এবারের ডোলিযাত্রায় মাত্র জনা পঁচিশেক মানুষ অংশগ্রহণ করেছেন। এই কজন মানুষের পক্ষে মহাদেবের ডোলি আর সেই সঙ্গে ১০ ক্যুইন্টাল ফুল কি করে নিয়ে যাওয়া সম্ভব তা আমি বুঝে উঠতে পারলাম না। কি জানি মহাদেবের মহিমাবলে এই মানুষগুলো হয়তো কোন অসুরীয় শক্তি প্রাপ্ত হয়েছে। ছবিতে দেখলাম এক মানূষ সমান বরফ মন্দিরের চারিদিকে। অনন্ত শূণ্যতার মধ্যে কেদারনাথ এর মন্দির দাঁড়িয়ে আছে একা। ভক্তের সঙ্গে ভগবানের মেলবন্ধনের সেতু হয়ে। দেখা মিলবে কি সেই ভক্তের, যার হৃদয় দিবারাত্র তার ভগবানের জন্য আকুল হয়? সেই ভক্ত যে তার ভগবানের পায়ে লুটিয়ে দিতে পারে তার ইহকাল? এ মন্দির নিজেও তা জানে না। প্রাচীন মন্দিরের পাথরের দেওয়াল লাল হয়ে সেজেছে ১০ ক্যুইন্টাল ফুলে। মনে হচ্ছে আড়ম্বরের সূর্য্য টা যেন মাটিতে নেমে এসেছে। মন্দিরে ওঠার সিঁড়িটা পর্য্যন্ত ফুলে ঢাকা। সর্বব্যাপী মহাদেবের চরণে 'ভক্তের' নিবেদন। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ ফুল এর কতটুকু দেবতার কাছে গ্রহণযোগ্য। কতগুলো ফুলে আছে ভ্রমরের ছোঁয়া! সেকথার উত্তর শুধু দেবতা জানেন, এই দেবালয় জানে না। প্রকৃতির কোন সম্পদের মাত্র কতটুকু পেলেই তিনি সন্তুষ্ট হবেন তা নিতান্তই জগদীশ্বরের সিদ্ধান্ত।
মনে মনে আর একবার শ্রদ্ধা জানালাম ফুলের দিদি কে। কর্মই যার ধর্ম। কিন্তু সেই কর্মের জগত জুড়ে আছেন এই দিদির আরাধ্য দেবতা, যাকে তিনি ভজন গানের মধ্যে খুঁজে পান, তিনিই সত্যিকারের সেই ভক্ত যাঁর অন্তর ভক্তিতে পরিপূর্ণ। তার নিবেদিত ফুলেই দেবতা সন্তুষ্ট হন । তাতে যে ভ্রমরের ছোঁয়া আছে।

প্রনাম জানাই সেই অটল কে। ভাষা খুজে পাচ্ছিনা।🙏
ReplyDeleteখুব ভালো লাগলো
ReplyDeleteখুব ভাল লাগল। এই প্রসঙ্গে একটা প্যারা লিখেছিলাম একবার।
ReplyDelete*****
গনইতে দোষ গুনলেশ নাপাওবি, জব তুঁহু করবি বিচার,...... কর্ম বিপাকে গতায়াত পুন পুন,মতি রহু তব অনুসঙ্গ....
********
মা সংসারের কাজ করছেন নিখুঁতভাবে কিন্তু মন পড়ে আছে বাচ্ছাটার ওপর, পড়ে না যায়, চোট না পায়....
কাবলিওয়ালা সাইকেল চালিয়ে টাকার তাগাদায়,বা খদ্দেরের খোঁজে চলেছে, ঠিক রাস্তায় চলেছে, কাউকে ধাক্কা না মেরে কিন্তু মন পড়ে আছে টাকার হিসেবে....
পাইলট টেক অফ করলেন, প্লেন রুটে পড়ে গেল, তিনি অটো অন করে দিলেন, প্লেন চলল নিজের মত, পাইলট মনদিলেন ইশের দিকে.....এখন কেবল বিশেষ অবস্থা ছাড়া পাইলটের দরকার নেই।
প্লেনের মতই আমাদের ভেতরেও বোধহয়,অটো সিস্টেম আছে, সাইকেল অটোয় চলছে, মন ভাবছে অন্য কিছু।
কাজ অটোয় চলছে মার মন সন্তানের দিকে।
*********
কেন এরকম পারিনা, কাজ অটোয় দিয়ে... মতি রহু তব অনুসঙ্গ.....
++++++++
লেখার থেকে মন্তব্য বেশি ভাল লাগল
Deleteভক্তের ভক্তিতেই ভগবান । কিন্তু প্রকৃত অর্থে ভক্ত হতে পারে আর কয়জন! খুব ভালো লাগল ফুল দিদির সাথে পরিচয় হয়ে🙏🙏
ReplyDeleteমন ভরে গেলো !
ReplyDeleteসত্যিই ভাষায় ভাব প্রকাশ করতে পারছি না। অতুলনীয়��
ReplyDeleteধন্যবাদ
Delete